kalerkantho

রবিবার । ১১ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১০ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মাশরাফিদের অপেক্ষায় সবুজ নিসর্গ

সামীউর রহমান, সিলেট থেকে   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মাশরাফিদের অপেক্ষায় সবুজ নিসর্গ

এই স্টেডিয়ামকে ঘিরে সিলেটবাসীর সবচেয়ে বড় যে প্রত্যাশা, দুই বছরের বেশি সময় ধরেও সেটা পূরণ হচ্ছে না। সিলেট স্টেডিয়ামে যে পা পড়ছে না জাতীয় দলের, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেখা যাচ্ছে না সাকিব-তামিম-মাশরাফিদের। দিন, মাস, বছর গড়িয়ে যায় তবু সেই আক্ষেপ আর ফুরোয় না!

 

মাথার ওপরে শরতের নীল আকাশে পেঁজা তুলার মতো মেঘের ওড়াউড়ি। পায়ের নিচে মখমলের মতো সবুজ ঘাস।

চোখের সামনে আদিগন্ত বিস্তৃত সবুজ সমুদ্র, শৃঙ্খলাবদ্ধ সৈন্যদলের মতো ছেঁটে রাখা চা গাছগুলোর মাঝে শান্ত্রীর মতো দাঁড়ানো ছায়াতরু। না, ছুটি কাটানোর কোনো গন্তব্য নয়; এটা সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামের চারপাশ। সিলেট শহর থেকে বিমানবন্দরের দিকে যেতে যেতে ঠিক যখনই শহুরে চমকটা কমে গিয়ে উঁকি দিতে শুরু করবে সবুজ, বাতাসে চা বাগানের কারখানা থেকে ভেসে আসা গুঁড়া চায়ের সৌরভ, ঠিক তখনই বাঁ দিকে তাকালে দেখা যাবে সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামের প্রবেশ পথ। অসমতল পথে দুটি বাঁক ঘুরতেই চোখের সামনে দেখা দেবে ভিক্টোরিয়ান নকশায় বানানো চমৎকার স্টেডিয়াম ভবন। ঝাঁ চকচকে অন্দরমহল, খেলোয়াড় ও আয়োজকদের চাহিদামাফিক সব সুবিধা। বছর দুয়েক হয়, আন্তর্জাতিক ভেন্যুর খাতায় নাম উঠেছে সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামের। বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ও অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের বেশ কিছু ম্যাচের সফল আয়োজনও করেছে স্থানীয় আয়োজকরা। কিন্তু এই স্টেডিয়ামকে ঘিরে সিলেটবাসীর সবচেয়ে বড় যে প্রত্যাশা, দুই বছরের বেশি সময় ধরেও সেটা পূরণ হচ্ছে না। সিলেট স্টেডিয়ামে যে পা পড়ছে না জাতীয় দলের, জাতীয় দলের জার্সি গায়ে দেখা যাচ্ছে না সাকিব-তামিম-মাশরাফিদের। দিন, মাস, বছর গড়িয়ে যায় তবু সেই আক্ষেপ আর ফুরোয় না!

রবিবার এই ভেন্যুতেই মাঠে গড়িয়েছে জাতীয় ক্রিকেট লিগে (এনসিএল) চট্টগ্রাম-রংপুরের ম্যাচ। এই ম্যাচ দিয়েই প্রথমবারের মতো প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট ম্যাচ আয়োজনের খাতায় যোগ হলো সিলেটের এ ভেন্যুর নাম। তার আগে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি, মেয়েদের টি-টোয়েন্টি ও অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের ম্যাচসহ স্থানীয় বিজয় দিবস টি-টোয়েন্টি এবং বয়সভিত্তিক ও একাডেমি দলের ম্যাচ হয়েছে এখানে। কিন্তু জাতীয় দলের ম্যাচ কিংবা বিপিএলের মতো জনপ্রিয় প্রতিযোগিতার ম্যাচ পুরোদমে চালু হওয়ার দুই বছরেরও বেশি সময় গড়ানোর পরও এখানো দেখা হয়নি সিলেটবাসীর। অথচ সেই প্রতীক্ষা ঘুচে যাওয়ার কথা অনেক আগেই। ২০১৩ সালের অক্টোবরে নিউজিল্যান্ডের বাংলাদেশ সফরের একটি ওয়ানডে ও একটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হওয়ার কথা ছিল সিলেটে। নিউজিল্যান্ডের চার সদস্যের প্রতিনিধিদল সেসময় সিলেট স্টেডিয়াম দেখে সন্তুষ্ট হয়ে ফিরে গেলেও নির্ধারিত সময়ে বাকি কাজ না হওয়াতে সিলেটে আর হয়নি জাতীয় দলের ম্যাচ। বিশ্ব টি-টোয়েন্টির আগেও কাজ শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল, তবে সেবার আর ভুলের পুনরাবৃত্তি হয়নি বরং খেলা আয়োজন করা হয়েছিল ভালোভাবেই। পাহাড়ে ধাপ কেটে কেটে বানানো গ্রিন গ্যালারি চোখের প্রশান্তি দিলেও বিশ্ব টি-টোয়েন্টির প্রথম পর্বে জিম্বাবুয়ে, নেদারল্যান্ডস ও আয়ারল্যান্ডের ম্যাচ ঠিক মন ভরাতে পারেনি সিলেটবাসীর।   মহিলাদের বিশ্ব টি-টোয়েন্টির সবগুলো ম্যাচই হয় সিলেটে। তারপর মাঠের ড্রেনেজ সিস্টেম সংস্কারের জন্য আবারও খেলা বন্ধ থাকে এই স্টেডিয়ামে।

চলতি বছরের শুরুতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টি- টোয়েন্টির সিরিজটিও হওয়ার কথা ছিল সিলেটে। কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপের জন্য আইসিসি মাঠের দায়িত্ব নিয়ে নেওয়ার কারণে শেষ মুহূর্তে ম্যাচগুলোর ভেন্যু বদলে নিয়ে যাওয়া হয় খুলনায়। শুধু জাতীয় দলই নয়, বয়সভিত্তিক দলের পারফরম্যান্সও মাঠে বসে দেখার সৌভাগ্য হয়নি সিলেটবাসীর। অনূর্ধ্ব- ১৯ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের ম্যাচগুলো পড়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে। তাই মেহেদী হাসান মিরাজ-পিনাক ঘোষদের পা পড়েনি ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’র শহরে। আসছে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগেরও (বিপিএল) কোনো ম্যাচ হবে না সিলেটে। কারণ হিসেবে সিলেট বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সদস্য ও বিভাগীয় ক্রিকেট সম্পাদক ফরহাদ কোরেশি বললেন, ‘মাঠের দর্শক ধারণক্ষমতা বাড়ানোর কাজ চলছে। এই সময় এখানে বিপিএল আয়োজন করলে দর্শকদের অসুবিধা হতো। এ ছাড়া নির্মাণকাজের বরাদ্দ অর্থও সময়মতো শেষ না করলে ফেরত চলে যেত। তাই এখানে এ বছর বিপিএলের ম্যাচ আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। ’ সিলেট  বিভাগীয়  স্টেডিয়ামের ভেন্যু ম্যানেজার জয়দীপ দাসও জানালেন, ‘মাঠের ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নত না করলে বৃষ্টিবহুল সিলেটে মাঠ দ্রুত খেলার অনুপযুক্ত হয়ে যাবে। তাই বিশ্ব টি-টোয়েন্টির পরই আমরা নিষ্কাশন ব্যবস্থা সংস্কারের কাজে হাত দেই। এখন বৃষ্টি হলেও বৃষ্টির পর মাঠ দ্রুত খেলার উপযোগী করে তোলা সম্ভব। ’ জয়দীপের কথার সত্যতা অবশ্য মিলেছে হাতেনাতেই। রবিবার রাতভর বৃষ্টি হলেও সিলেট বিভাগীয় স্টেডিয়ামে পরদিন সকাল থেকেই জাতীয় লিগের ম্যাচ গড়িয়েছে সময়মতোই এবং নির্বিঘ্নে, আউটফিল্ডও ছিল মসৃণ।

সাধারণত কোনো ভেন্যুতে আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনের সময় আয়োজক কর্তৃপক্ষ মাথায় রাখেন ভেন্যু, আবাসন, যোগাযোগ ও নিরাপত্তাসহ সংশ্লিষ্ট অনেক কিছু। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্টেডিয়াম মিনিট দশেকের দূরত্বে। পর্যটন নগরী বলে মানসম্পন্ন হোটেলও আছে। বিমানবন্দরের কাছেই গড়ে উঠছে আরো একটি চার তারকা হোটেল। জয়দীপের কাছেই জানা গেল, বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ও অনূর্ধ্ব বিশ্বকাপের সময় প্রশাসনের কাছ থেকেও আন্তরিক সহায়তা পেয়েছেন, নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল পর্যাপ্ত। মার্চেই স্টেডিয়ামের নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পর সিলেটে বাংলাদেশ দলের খেলা আয়োজনের প্রত্যাশা স্থানীয় ক্রিকেট সংশ্লিষ্টদের। কিন্তু আগামী বছরের মার্চই শুধু নয়, ঢাকায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় টেস্টের পর আগামী বছরের জুলাই-আগস্টের আগ পর্যন্ত দেশের মাটিতে আর কোনো খেলারই যে সূচি নেই সাকিব-তামিমদের! তাই বলা যায় প্রতীক্ষার প্রহরটা আরো লম্বাই হবে। তবে সুযোগের একটা ছোট্ট জানালা অবশ্য আছে। এপ্রিলে পাকিস্তানের বিপক্ষে দেশে একটা সিরিজ খেলার কথা বাংলাদেশের, যেটা আইসিসির ফিউচার ট্যুরস প্রোগ্রাম বা বার্ষিক সূচিতে থাকলেও এ নিয়ে দুই বোর্ডের ভেতর এখনো সম্মতিচুক্তি হয়নি। সেটা যদি হয়ে যায়, তাহলে পাকিস্তানের সঙ্গে সিরিজে একটি ম্যাচ তো সিলেটবাসী প্রত্যাশা করতেই পারে!


মন্তব্য