kalerkantho


এবার যদি বোধোদয় হয় দাবার

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



এবার যদি বোধোদয় হয় দাবার

ক্রীড়া প্রতিবেদক : দাবার নতুন কমিটি শুরুতেই ধাক্কা খেয়েছে বিশ্ব দাবা অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ দলের ভরাডুবির নতুন রেকর্ডে। ৭৬তম হওয়ার পর সাধারণ সম্পাদক শাহাবুদ্দিন শামীম সস্ত্রীক ফিরেছেন আজারবাইজান থেকে।

তিনিও নিজের চোখে দেখতে গিয়েছিলেন। দুর্ভাগ্য, বারবার ফোন করেও তাঁকে ধরা যায়নি, নতুন সাধারণ সম্পাদকের কণ্ঠে অলিম্পিয়াডের ভালো-মন্দ অভিজ্ঞতা কিছুই শোনা হয়নি। তবে গ্র্যান্ডমাস্টার এনামুল হোসেন রাজীব এটাকে অত খারাপ পারফরম্যান্স মনে করছেন না!

এই গ্র্যান্ডমাস্টার বড় করে দেখছেন শক্তিশালী দলের সঙ্গে খেলার অভিজ্ঞতাকে, ‘আগে আমরা শক্তিশালী দলের সঙ্গে খেলে ৪-০ পয়েন্টে হারতাম। সেখানে নরওয়ের সঙ্গে খেলে ১.৫-২.৫ পয়েন্টে হেরেছি। আগের সঙ্গে তুলনা করলে আমরা অনেক ভালো খেলেছি। শুধু স্ট্যান্ডিংটা খারাপ হয়েছে। ’ বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন নরওয়ের ম্যাগনাস কার্লসেনের সঙ্গে খেলেছেন রাজীব, সেই নরওয়ে হয়েছে পঞ্চম। তাদের সঙ্গে লড়াই করে দেড় পয়েন্ট নেওয়াটা কৃতিত্বের। কিন্তু আরব আমিরাতের সঙ্গে ড্র ও কাতারের কাছে হারটা তো অপ্রত্যাশিতই।

এ জন্যই পিছিয়ে যাওয়ার নতুন রেকর্ড হয়েছে। এই বাংলাদেশি গ্র্যান্ডমাস্টারের ব্যাখ্যা, ‘আমি বারবার বলে আসছি সুইস লিগে শেষ রাউন্ডটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কাতার খারাপ দল নয়, আমাদের মানেরই দল। ওদের সঙ্গে জিতলে আমরা ৪৩তম হতাম। ’ জিততে পারেনি, তাই বাংলাদেশ চলে গেছে অনেক পেছনে।

এটার আরেকটা কারণ বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের কম রেটিং। দাবার আন্তর্জাতিক জাজ হারুনুর রশীদ বলেছেন, ‘আমরা চার গ্র্যান্ডমাস্টার নিয়ে খেললেও কারো রেটিং ২৬০০-র ওপরে নয়। তারা আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ পায় না। তাদের রেটিংও বাড়ে না, অভিজ্ঞতাও হয় না। তাই তাদের পক্ষে ২৬০০ রেটিংধারী দাবাড়ুদের হারানো কঠিন। ’ অলিম্পিয়াড দলে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রেটিংধারী দাবাড়ু জিয়াউর রহমান (২৫১২)। তারা বছরে অলিম্পিয়াড মানের কোনো টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ পায় না। এবার অলিম্পিয়াডের আগে গ্র্যান্ডমাস্টর নিয়াজ মোরশেদ দুটি টুর্নামেন্ট খেলেছেন আমেরিকায়। রাজীব-জিয়ারা ভারতে গিয়ে কয়েকটি টুর্নামেন্ট খেলেছেন। রাজীব তুলে ধরেছেন দাবার দুর্দশার কথা, ‘গত সাত বছর আমরা দেশে কোনো আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে পারিনি। আমাদের দাবা একরকম নিম্নগামী। এরকম অবস্থায় এর চেয়ে ভালো আর কী করা যাবে? আমাদের দলের ১০০ পয়েন্ট রেটিং কমে গেছে। ’ এর আগে এই শতকের শুরুতে সুজা উদ্দিনের সাধারণ সম্পাদক থাকাকালীন বেশ কয়েকজন গ্র্যান্ডমাস্টারের জন্ম দেখেছে বাংলাদেশ। ওই সময় দাবাড়ুরা আমেরিকা, রাশিয়া ও ইউরোপে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলতে যেতেন। বাংলাদেশ বিমানের ফ্রি টিকিটের সঙ্গে ফেডারেশনের উদ্যোগ এবং দাবাড়ুর আগ্রহে বিদেশে খেলতে যেতেন। সেই রেওয়াজটা একরকম বন্ধই হয়ে গেছে গত ছয়-সাত বছরে। দাবা ফেডারেশন হয়ে উঠেছিল জুয়ার আখড়া! অর্থ বাজি রেখে প্রতিনিয়ত দাবা খেলা হতো এবং খেলতেন ফেডারেশনের সাবেক সদস্যরাই!

বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সাইফুল তারেকের আমলেও দাবার সেরকম কোনো সংস্কার হয়নি। নির্বাচনের সময় অনেক কিছু বলে শেষমেশ ওই গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছিলেন। এরপর আড়াই মাস আগে নির্বাচিত হয়ে এসেছে সৈয়দ শাহাবুদ্দিন শামীমের কমিটি। এবার তাঁর পরীক্ষা। অলিম্পিয়াডে যাওয়ার আগে নানা প্রতিশ্রুতি দিলেও একজন কোচ জোগাড় করতে পারেননি দাবাড়ুদের জন্য। পারফরম্যান্সও হয়েছে খুব খারাপ, শুরুই হয়েছে ব্যর্থতা দিয়ে। রাজীবের কাছে সাফল্যের রাস্তাটা এরকম, ‘সত্যি বললে, শুধু দাবা অলিম্পিয়াড উপলক্ষে দু-তিন মাসের জন্য কোচ এনে কোনো লাভ হবে না। ভালো কোচের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই ফল পাওয়া যাবে। যেমন ভারত এক দিনে আজকের অবস্থায় আসেনি, তাদের দাবাড়ুরা বছরে বেশ কয়েকটি ভালো মানের টুর্নামেন্ট খেলে। তার ফল হলো, এখন তারা অলিম্পিয়াডে শিরোপার জন্য খেলে। ’

২০১২ সালে ইস্তাম্বুল দাবা অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশ ৩৩তম হয়েছিল ভারতকে পেছনে ফেলে। সেই ভারত এবার চতুর্থ হয়েছে আর বাংলাদেশ পিছিয়ে গিয়ে ৭৬তম।

হালের দাবার নিত্যসঙ্গী হারুনুর রশীদ। গত ১৫-২০ বছর খুব কাছ থেকে বাংলাদেশের দাবাকে পর্যবেক্ষণ করা এই আন্তর্জাতিক জাজ মনে করেন, ‘আমাদের দাবায় সেরকম কোনো প্রতিভা উঠে আসছে না। এই জিএমদের নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে চলছে। ওরকম নতুন দাবাড়ু উঠেও আসছে না। এখন ফেডারেশনের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দাবাটা কিভাবে চলবে। জিএমদের দিয়ে অলিম্পিয়াডের রেজাল্ট দরকার নাকি নতুন দাবাড়ু তুলে আনার কাজ করবে। সিদ্ধান্ত নিয়েই এগোতে হবে। ’ অলিম্পিয়াডে ভালো করতে গেলে এই দাবাড়ুদের ইউরোপে ভালো টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ করে দিতে হবে। সঙ্গে ভালো কোচও নিয়োগ দিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। আবার দাবার সংস্কারও করতে হবে নতুন দাবাড়ু তুলে আনার জন্য। অলিম্পিয়াড ধাক্কায় যদি নতুন কমিটির চোখ খোলে আর কি!


মন্তব্য