kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এই শত্রুই পরম বন্ধু

১২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



এই শত্রুই পরম বন্ধু

দেড় লাখ জনবসতির শহর। সঙ্গে বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টও হয়।

এর মানে বুয়েনস এইরেস থেকে ৩০০ কিলোমিটার দূরের হুনিনে প্রায় প্রতি ঘরেই অন্তত একজন ফুটবলার কিংবা ফুটবল স্বপ্নবাজ আছে। স্বপ্নবাজ অবশ্য সবাই। শিশু-কিশোর, নারী-পুরুষ, যুবা-বৃদ্ধ কোনো ভেদাভেদ নেই। আর এদের কাছে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল কিংবা মেসি-নেইমার শেষ কথা নয়। পাড়ার একটা ম্যাচও সমান গুরুত্বপূর্ণ, যুদ্ধংদেহীও!

হুনিন শহরে একটাই স্টেডিয়াম, আর্জেন্টিনা লিগ ম্যাচের জন্য বরাদ্দ। তবে এর চারপাশে যা আছে, তা ঢাকাতেও নেই। দুটো আর্টিফিশিয়াল টার্ফ এবং একটি প্র্যাকটিস মাঠ, যা আয়তনে ফুটবল স্টেডিয়ামের সমানই। এর পাশেই আমাদের আউটার স্টেডিয়ামের মতো একটা মাঠ। যেখানে গত সপ্তাহে স্থানীয় প্রথম বিভাগের দুটি ক্লাবের ম্যাচ দেখার সুযোগ হয়েছিল।

আর্জেন্টিনার সবচেয়ে ক্ষুদ্রকায় শহরগুলোর একটি সম্ভবত এই হুনিন। মূল আকর্ষণ বলতে একটা লেক আর শান্ত পরিবেশ। সবাই সবাইকে চেনে-জানে, হাসিকান্নার সঙ্গী একে-অন্যের। আর্জেন্টিনার এ পর্বে আমার গাইড আরিয়েল কোলম্যানকে যেমন মিনিটপাঁচেকের ড্রাইভেই কুশল বিনিময়ের জন্য গাড়ি থামাতে হলো বারচারেক। বুঝতে পারলাম আগের রাতটা যে তিনি এক বাংলাদেশিকে আপ্যায়ন করতে অন্য শহরে ছিলেন, সেটি হুনিনের সবারই জানা। সে সূত্রে ১৫ হাজার কিলোমিটার দূরের বাসিন্দা এই বাংলাদেশি মর্যাদায় রীতিমতো ভিআইপি!

ছোট শহরের ছোট ম্যাচ, তবু দর্শনীতে ছাড় নেই। ম্যাচের একটি দলের ট্রেনার আরিয়েল স্বয়ং। কিন্তু সঙ্গে আসা দুই ছেলের জন্য টিকিট কিনতে হলো তাঁকেও। তবে বুকের উষ্ণতার বিনিময়েই ছাড় মিলল বাংলাদেশি অতিথির। গেটেই দুই ভদ্রলোকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন আরিয়েল। মনে হলো তাঁরা পরম বন্ধু, একই শহরের বাসিন্দা তো বটেই। তবে তখনো আঁচ করা যায়নি এ বন্ধুত্ব কিছুক্ষণ পর এমন রুদ্ররূপ নেবে!

দর্শক সংখ্যায় বেশি নয়, দুই পক্ষের মিলিয়ে শ দুয়েক হবে। তবে গলায় জোর থাকলে এ-ও কম নয়। আর শান্ত পরিবেশে ইকোও হয় অনেক বেশি। তারা চেঁচিয়ে চলেছে শুরু থেকে। এর মধ্যে খেলার পঞ্চম মিনিটে গোল খেয়ে বসে আরিয়েলের দল। যদিও ক্লাবটির কোচ থেকে শুরু করে বলবয়ের দাবি ওটা অফসাইড ছিল। সেই থেকে শুরু নির্বিচারে রেফারি আর লাইন্সম্যানকে গালাগাল। সব স্প্যানিশে, কিন্তু বোঝা গেল এর ভাবার্থ আমাদের নিকৃষ্টতম গালাগালের চেয়ে মোটেও সৌজন্যমূলক নয়। ম্যাচের পর আরিয়েল সেটা নিশ্চিতও করেছেন।

তো, গালাগাল ব্যাপার নয়। তবে যিনি দিচ্ছিলেন যাকে উদ্দেশ করে, সেটা অবাক করার মতো। গেটে দেখা সেই দুই ভদ্রলোকের একজন রেফারি, অন্যজন লাইন্সম্যান। ষাটোর্ধ্ব ছোটখাটো যে ভদ্রলোক প্রথম গোলটির পর থেকে ক্রমাগত গালাগাল করে গেলেন, তিনিও ছিলেন ওই আড্ডায়। এমনকি ‘মাতে’র নলেও চুমুক দিচ্ছিলেন পালা করে। মাতে হলো একধরনের চা। ছেলে-বুড়ো প্রায় সবাই সঙ্গে একটা ফ্লাস্ক বহন করে হুনিন কিংবা রোজারিওতে। একগুচ্ছ গ্রিন টির পাতার কাপে গরম পানি ঢেলে চলে টানাটানি। একটাই নল, তবে নির্দ্বিধায় একে-অন্যেরটা থেকে চুমুকে মাতে খাচ্ছেন। কোনো নবাগতের আবদারও রক্ষা করা হয় অবলীলায়।

এমন বন্ধুদের হাত বাড়ানো দূরত্বে দাঁড়িয়ে গালাগাল করতে দেখা বিস্ময়করই বটে। এর ওপর এত ছোট্ট শহর, সবাই সবাইকে চেনে, সেখানে কি না এমনটা হয়! শুধু ওই ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধই নন, তাঁর অনুসরণে ছেলে-যুবক সবাই মিলে কোরাস ধরছে। বারকয়েক লাইন্সম্যান ভদ্রলোকও ঘুরে পাল্টা জবাব দিয়েছেন। কাঁটাতারের বেড়ার ভেতরে ম্যাচ। তাই রেফারি কিংবা লাইন্সম্যানের সঙ্গে মৌমাছির মতো জায়গাবদল করছে উন্মত্ত গালাগালের স্রোত, দেখার মতো দৃশ্য বটে!

বিরতির সময় পুরো দলটা ড্রেসিংরুমের সামনে দাঁড়িয়ে সে কী গালাগাল! পাড়ার সাইজের ম্যাচ, তবু রেফারি-লাইন্সম্যান ফিরছেন দুই কনস্টেবলের প্রহরায়। বৃদ্ধ তখন ভিড় থেকে ছিটকে গিয়ে ড্রেসিংরুমের দিকে ধাবমান, যদি অফিশিয়ালদের আরো কাছ থেকে নাজেহাল করা যায়! পুলিশ অবশ্য দ্রুতই সেখান থেকে বের করে দেয় বৃদ্ধকে। বারকয়েক খেলোয়াড়ে-খেলোয়াড়েও লাগালাগির উপক্রম হয়েছে।

কিন্তু ম্যাচ শেষেই অদ্ভুত দৃশ্য। এতক্ষণ যা দেখছিলাম তার সবটাই যেন কোনো চিত্রনাট্য, মুহূর্তেই ফিরে এলো ম্যাচ শুরুর আগের আবহ। সবাই সবার পরম বন্ধু। গেটেই পরিচয় হওয়া লাইন্সম্যানকে মাতে বাড়িয়ে দিচ্ছেন আরিয়েলের দলের এক সমর্থক। এক দলের খেলোয়াড় একটু আগে তৈরি হয়েও অপেক্ষায় আছে কখন বাকিরা আসবে, পাবে একটু গলা ভিজিয়ে তবেই না বাড়ি ফেরা। আরিয়েল হাসেন, ‘ম্যাচ অন্য জিনিস, মাত্র ৯০ মিনিটের ব্যাপার। আমরা একসঙ্গে কাটাচ্ছি বছরের পর বছর। এই বন্ধুত্ব তো আর নষ্ট হবে না। ’

তবে আরো বিস্ময়কর ওই বৃদ্ধ। উচ্চতায় আর কতটুকু হবেন, বড়জোর ৫ ফুট ২, ক্ষীণকায় শরীরটার ওজনও ৫০ কেজির বেশি হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কিন্তু কী তেজ! লোকটা কে? ‘আমাদের ক্লাবের প্রেসিডেন্ট’, উত্তর শুনে নির্বাক বাংলাদেশিকে দেখে আরিয়েল বোঝাতে চেষ্টা করেন, ‘লোকটার ছোট্ট একটা স্টোর আছে। প্রচণ্ড ভালোবাসেন বলেই এ ক্লাবে ইনভেস্ট করেছেন। তাঁর ইমোশন তো একটু বেশি থাকবেই। ’

ততক্ষণে গাড়ি ছেড়ে দিয়েছেন আরিয়েল কোলম্যান। নইলে আরেকবার শ্রদ্ধাভরে দেখার ইচ্ছা ছিল লোকটাকে। এ যেন আমাদের আশির দশকের আগেকার সেই শ্রেণির সংগঠক, যাঁদের অনুপস্থিতি এখন বাংলাদেশের দীর্ঘশ্বাস!


মন্তব্য