kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ফুটবল খেলে কাপুরুষেরা!

১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ফুটবল খেলে কাপুরুষেরা!

‘স্যরি মেট, একটু দেরি হয়ে গেল’, হন্তদন্ত হয়ে কফি শপে আসন নেওয়া লোকটাকে দেখে আর যা-ই হোক, খেলোয়াড় মনে হওয়ার কোনো কারণ নেই। এলোমেলো চুল, অবিন্যস্ত দাড়ি আর চোখ-মুখের এক্সপ্রেশনে বার্নান্দো ইরিগোয়েনের শিল্পীর ধাঁচ।

পেশায় অনেকটা তা-ই, গ্রাফিক্স ডিজাইনার। তবে নেশা ক্রিকেট। এতটাই যে এ আর্জেন্টাইনের কাছে ফুটবল হলো কাপুরুষ, ভিতু আর শঠদের খেলা!

‘আমি ফুটবল-টুটবল দেখি না। এটা কোনো খেলা নাকি? সব অভিনেতা। ম্যারাডোনা-মেসি’ কে না! একটু লাগলেই মাঠে এমন গড়াগড়ি খায়, যেন মারা যাচ্ছে। যত্তসব ছলচাতুরী’, বার্নান্দোর ফুটবলপ্রেম (!) শুনে কফি ছলকে পড়ার উপক্রম। কিন্তু বিশ্ব তো জানে ক্রিকেটে ফিটনেসের সঙ্গে নানা রকম আপস চলে। ২০০৭ বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হারের পর সমুদ্রসৈকতে স্নানরত ভারতীয় দলের উদোম গায়ের ছবি ছেপে দেশটির একটি পত্রিকা ক্যাপশন করেছিল, ‘এঁরা কি দাবাড়ু?’ সেখানে এই আর্জেন্টাইনের কাছে ক্রিকেট হলো বীরত্বের খেলা, ‘ক্রিকেটে দেখুন। ৯০ মাইল বেগের বল এসে পাঁজরে লাগল তো, ব্যাটসম্যান সে ব্যথা উপেক্ষা করে পরের বলটির জন্য তৈরি হচ্ছে। এই না হলো বাহাদুরি!’

বুঝতে পারছি এ দেশে ক্রিকেটের কোনো জায়গা নেই; দর্শক, মিডিয়া, সরকার—কেউ কদর করে না। ফুটবলের প্রতি তাই ৪৭ বছর বয়সী বার্নান্দোর বিরাগ থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। টি-টোয়েন্টিতে আর্জেন্টিনার সেরা স্ট্রাইকরেটের এ ব্যাটসম্যানের তাত্ক্ষণিক প্রতিবাদ, ‘মোটেও তেমন কিছু না। আমি তো রাগবি পছন্দ করি। দাঁত ভেঙে গেছে, নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে, তবু প্লেয়ার খেলে যাচ্ছে। এই যে আমার দুটি আঙুল ক্যাচ নিতে গিয়ে ভেঙে গেছে, তবু খেলা ছাড়িনি। একবার বিলির (ম্যাকডারমট, তিনি আবার ক্রিকেট আর্জেন্টিনার প্রধান নির্বাহীও) হাত ভেঙে গিয়েছিল। তবু চেষ্টা করেছিলাম ব্যাটিং করার। কিন্তু ব্যথায় হাত অবশ হয়ে যাওয়ায় আর পারিনি। ’

তাই বলে একেবারেই কি ফুটবল দেখেন না? ‘বিশ্বকাপ ম্যাচও দেখি না। রাগবি-হকি দেখি। হকিটা মেয়ের কারণে। আর্জেন্টিনা আন্ডার ফিফটিনের গোলকিপার ও’, তবে সুযোগ পেলেই তিনি ক্রিকেটের গ্যালারি বানিয়ে ফেলেন নিজের বাড়িটাকে, ‘আমাদের এখানে তো ক্রিকেট দেখায় না টিভিতে। তাই বাড়িতে একটা প্রজেক্টর বসিয়েছি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সময় আমার বাসায় সবাই আসে ক্রিকেট দেখতে। ’

বার্নান্দো ইরিগোয়েনকে খুঁজে বের করার আরেকটি কারণ অবশ্য আছে। বাংলাদেশের বিপক্ষে দুটি ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে যে। ১৯৯৪ এবং ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফির সেই দুটি ম্যাচের কথা জানতেই তাঁকে খুঁজে বের করা। যদিও বার্নান্দোর স্মৃতিতে তার সামান্যই অবশেষ আছে, ‘কেনিয়া আর কুয়ালালামপুরে ওই প্রথম যাওয়া। আমরা ক্রিকেটের ছোট্ট দেশ, তাই সব কিছুই নতুন মনে হয়েছে। বিশেষ কোনো খেলোয়াড়ের কথা মনে নেই। তোমাদের একজন খেলোয়াড়ের জার্সি চেয়ে নিয়েছিলাম। গোঁফ আছে আর মোটাসোটা ছিল। ’ মোবাইলে ছবি দেখানোর পর বললেন, ‘হ্যাঁ, ওর জার্সিই নিয়েছিলাম। ওটা পরে এখানে অনেক ম্যাচ খেলেছি। পরে সেটা নষ্ট হয়ে যাবে, এই ভয়ে তুলে রেখেছি। এখনো আছে। ’ বাংলাদেশি সেই ক্রিকেটারটি আকরাম খান, আইসিসি ট্রফি জয়ের নায়ক।

বার্নান্দোর আরো মনে আছে, ‘মালয়েশিয়ার সে ম্যাচে মাঠ দেখে মনে হচ্ছিল বুঝি বাংলাদেশে খেলছি। তবে দর্শক খুব উৎসাহ দিচ্ছিল। আমি বাউন্ডারি লাইনে ফিল্ডিং করছিলাম। তো, একটু পরপরই গ্যালারি থেকে কেউ না কেউ এসে পিঠ চাপড়ে দিচ্ছিল। ’ কেনিয়ার চেয়ে কুয়ালালামপুরেরটা অন্য কারণেই বেশি মনে আছে বার্নান্দোর, ‘ওই আসরে আর্জেন্টিনার সেরা স্কোরার ছিলাম আমিই। বাংলাদেশের বিপক্ষে ৩০ নট আউট ছিলাম। আসলে স্পিনটা আমি খুব ভালো খেলি। সে কারণেই দেখো না এই বয়সেও জাতীয় দলে খেলে যাচ্ছি। ’

অক্টোবরে মৌসুম-পূর্ব প্র্যাকটিস শুরু হবে। কিন্তু নিজের সংগ্রহে থাকা দুটি ব্যাটই তাঁর ভাঙা। কী করবেন? ‘আমার এক বন্ধু পাকিস্তানে যাচ্ছে। ওকে দিয়ে আনিয়ে নেব একটা’, ব্যয়ভার অবশ্যই বহন করতে হবে বার্নান্দোকে। ফেব্রুয়ারিতে কলম্বিয়ায় সে সফরে যাচ্ছে, সেটিরও যাবতীয় খরচ যার যার তার তার। এ অবস্থায় আর্জেন্টিনার ক্রিকেট ভবিষ্যৎ খুব উজ্জ্বল বলে মনে হচ্ছে না তাঁর, ‘ক্লাবের হয়ে খেলার জন্য আমাদের টাকা দিতে হয়। নইলে মাঠ-টাঠ ঠিক থাকবে কী করে? কিন্তু এভাবে তো আর সবাইকে ধরে রাখা যায় না। আমার মেয়েই যেমন ভালো ক্রিকেট খেলত; কিন্তু এখন হকিতে চলে গেছে। ’

তাহলে সময় থাকতে আপনিও চলে গেলেন না কেন? ‘ভালোবাসা। ছোটবেলায় এই খেলাটা শুরুর পর এখনো সেই একই রোমাঞ্চ অনুভব করি। আমার প্রিয় ক্রিকেটার ভিভ রিচার্ডস। সেটা তাঁর খেলার জন্যই নয়, অ্যাটিচুডের জন্য। দেখেই মনে হতো লোকটা উপভোগের জন্য ক্রিকেট খেলে। আমিও উপভোগ করি বলেই ক্রিকেট খেলি’, রোমান্টিসিজমের শিখরে তখন বার্নান্দো। এ ‘প্রেমের মৃত্যু’ এক উপায়েই ঘটতে পারে বলে বিশ্বাস তাঁর, ‘আমি এখনো খেলে যাচ্ছি দেখে হাসাহাসি করে বিলি। একসময় আমি ওর অধিনায়ক ছিলাম, এরপর কোচিংও করিয়েছি। একসময় ও আমার অধিনায়ক হলো, তবু খেলে যাচ্ছি। মনে হয় না কেউ মেরে ফেলার আগে আমি ক্রিকেট ছাড়ব!’

তাঁর এই ক্রিকেটপ্রেম দেখার জন্য অবশ্য খুব বেশি মানুষ মাঠে যায় না। ‘বন্ধুদের বলে-কয়ে রাজি করাই। আমার স্ত্রীও যায় না। অবশ্য আমার খেলা থাকলে ও মনে হয় একটু খুশিই হয়, উইকএন্ডটা নিজের মতো করে কাটাতে পারে যে’, শান্ত কফি শপকে কাঁপিয়ে হো হো করে হেসে ওঠেন বার্নান্দো ইরিগোয়েন।

কোনো আর্জেন্টাইন এমন ক্রিকেট-উন্মাদ হতে পারে, কল্পনাতেও ছিল না।


মন্তব্য