kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চকোলেট বাক্সের বোকা জুনিয়র্স

১০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চকোলেট বাক্সের বোকা জুনিয়র্স

এমনিতেই রুম হিটার ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার দিন, তার ওপর আগের রাত থেকে বৃষ্টি। স্থানীয় আবহাওয়া দপ্তর জানাচ্ছে তাপমাত্রা ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

কম্বলের আরো গভীরে হারিয়ে যাওয়ার মতো খবর। কিন্তু থাকা হলো কই, ঠকঠকানির মধ্য দিয়ে ট্যাক্সিতে প্রায় ৪০ মিনিটের পথ পাড়ি দিয়ে দূরের বোকা জুনিয়র্স ক্লাবে যাওয়া। আর গিয়ে মনে হলো এ দেখার জন্য সব বাধা অতিক্রম করাও সার্থক, কনকনে শীত তো মামুলি!

লিওনেল মেসি যদি এ যুগের আর্জেন্টিনার শীর্ষ তারকা হন, তবে শ্রমিক অধ্যুষিত ব্রেন্ডসনের লা বোকায় তিনি বড়জোর দ্বাররক্ষী! হলুদ আর নীলে ঢাকা স্টেডিয়ামের সামনের কিউরিও শপের দরজায় তো তেমন ভঙ্গিতেই দাঁড়িয়ে লিওর মূর্তি। আর বাইরের একটা বেঞ্চিতে স্বয়ং ডিয়েগো ম্যারাডোনা, দুই পাশে হুয়ান রোমান রিকুয়েলমে, মার্টিন পালেরমো আর কার্লোস তেভেজ। চতুষ্টয়ের থমকে থাকা অভিব্যক্তি দেখলেই বোঝা যায় এ আড্ডার মধ্যমণি ম্যারাডোনা, বাকিরা তাঁর কোনো একটি কৌতুকে অনুরক্তের মতো হাসছেন। অবশ্য আরো গভীরে ঘোরার পর মনে হলো, বোকার প্রাণ আসলে রিকুয়েলমে; ‘রোমানকে ভালো লাগে বলতেই তাই মিলে গেল একটা স্যুভেনির, ফ্রি! স্প্যানিশে বোকা মানে মুখ। এ পাড়ায় ম্যারাডোনা যদি হন গুরু তবে রিকুয়েলমে বোকার মুখ। জুভেন্টাস ছেড়ে ক্লাবে ফেরার পর তেভেজের সমর্থকও বাড়ছে হু হু করে, যিনি এ ক্লাবের একাডেমিরই প্রোডাক্ট।

ওই যে ঠাণ্ডার কথা বলছিলাম, সে কিন্তু ছিলই। গ্রীষ্মপ্রধান দেশের মানুষ শুধু আমিই নই, ঠাণ্ডায় অভ্যস্ত ব্রাজিল-উরুগুয়ে-ভেনিজুয়েলা থেকে আসা পর্যটক থেকে শুরু করে স্থানীয় লোকজনও দেখি ঠকঠকিয়ে কাঁপছে। তো, গতকালের ট্যুরে সবচেয়ে বেশি দেখা গেল ব্রাজিলিয়ানদেরই। কেউ কোরিন্থিয়ান্সের সাপোর্টার তো কেউ বোতাফোগোর। একজন আবার বেলো হরিজন্তের। ফোর্তালেজা থেকে আসা চারজনের একটা গ্রুপ সঙ্গে করে নিয়ে এসেছে নিজ দলের পতাকা। বোকার মাঠে দাঁড়িয়ে সেই পতাকা মেলে ধরে সবাই ছবি তুললেন হাসিমুখে। ব্রাজিল এবং আর্জেন্টিনা—দুই দেশেই দেখেছি ফুটবল প্রেমটা এমন দিগন্তপ্রসারী। মাঠে প্রবল বৈরিতা তো বাইরে পরম বন্ধু। একজন আর্জেন্টাইন যেমন সাও পাওলোর ফুটবল জাদুঘর দেখে মুগ্ধ, তেমনি বোকার জাদুঘরে ম্যারাডোনার দিকে শ্রদ্ধাভরে তাকিয়ে থাকে ব্রাজিলিয়ানরা।

এ শ্রদ্ধাবোধের কারণও আছে। যে জায়গাটায় বোকা জুনিয়র্স ক্লাবের ঠিকানা, সেটি মূলত জাহাজি শ্রমিকদের আখড়া। উনিশ শতকের শুরুতে ইতালিয়ানদের অনুপ্রবেশ ঘটে এ পথেই। তো পাঁচ ইতালিয়ান মিলে ঠিক করেন একটা ফুটবল ক্লাব গঠনের। ১৯০৫ সালে তাঁদের উদ্যোগে গঠিতও হয় বোকা জুনিয়র্স। কিন্তু মাঠ কোথায়? এ-তল্লাটে ও-তল্লাটে ঘুরে শেষমেশ আবার বোকাতেই ক্লাবটি ফেরে ১৯৩৮ সালে। দুই বছরের নির্মাণশেষে ১৯৪০ সাল থেকে বোকার হোম গ্রাউন্ড এখনকার এস্তাদিও আলবার্তো জে আরমান্দো, বোকা জুনিয়র্স স্টেডিয়াম নামেই যদিও বেশি পরিচিত।

দর্শনার্থীদের জন্য প্রবেশপথেই বোকার অফিশিয়াল ফ্র্যাঞ্চাইজি স্টোর। সেখানেই মেলে প্রবেশপত্র। ১৮০ পেসোর (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮০০ টাকা) টিকিটটা সস্তাই। ঢোকার মুখেই মিউজিয়াম, হাতের বাঁ দিকে সাদা-কালো সব পোর্ট্রেটে দেয়ালে সাঁটা বিভিন্ন সময়ে বোকার পতাকাবাহীরা। ডানের দরজা ঠেলে ঢুকলেই ক্লাবটির কিংবদন্তিরা, সেখানেও ম্যারাডোনা বসে আর বাকিরা দাঁড়িয়ে। সে রুম থেকে বেরিয়ে বাঁয়ে মোড় নিলেই রাজ্যের যত ট্রফি। সেকাল-একালের ট্রফির যেন শেষ নেই। তবে সবগুলো এইটুকু জায়গায় কি আর রাখা যায়, ঘরোয়া আর আন্তর্জাতিক মিলিয়ে সংখ্যাটা ৬৫ যে! এর মধ্যে আন্তর্জাতিক ট্রফি ১৮টি, যা সাফল্যে রিয়াল মাদ্রিদ এবং এসি মিলানের পাশে রেখেছে বোকাকে। এ ক্যাটাগরিতে বিশ্বের সবচেয়ে সফল ক্লাবটি আল আহলি (২০), সেটি অবশ্য মিসরের।

ছড়ার মতো করে পর্যটকদের কখনো স্প্যানিশে কখনো ইংরেজিতে বলে যাচ্ছেন গাইড ক্যামেলি, ‘ওই যে দেখতে পাচ্ছেন ওপরের ব্যালকনিগুলো সেগুলো করপোরেট বক্স। এর একেবারে মাঝখানেরটা ম্যারাডোনার জন্য বরাদ্দ। ’ ১০ বছরের জন্য নির্ধারিত ফি-তে অন্যদের মতো ম্যারাডোনাও কিনেছিলেন ১০ আসনবিশিষ্ট বক্সটি। তবে অনন্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ওটা আজীবনের জন্য বরাদ্দ হয়ে গেছে তাঁর জন্য। ‘এখন তিনি দুবাইতেই বেশি থাকেন। তবে বক্স খালি থাকে না। এত্ত ডিমান্ড’, সেই ছড়ার তালেই বলে যান ক্যামিলা। গাইড জানালেন ম্যারাডোনা শেষবার বোকা জুনিয়র্সের মাঠে এসেছিলেন তেভেজের প্রত্যাবর্তন ম্যাচে।

ম্যারাডোনা অবধারিতভাবে বোকার ‘বস’ তো রিকুয়েলমে ক্লাবটির মুখ। যারা টানা তিনটি পেনাল্টি মিস করা পালেরমোকে নিয়ে এখনো হাসাহাসি করে, তাদের জানিয়ে রাখা ভালো যে বোকার অনারবোর্ডে ওপরের দুজনের পরই আসীন ‘এল লোকো’, মানে পালেরমো। সেই কবে খেলা ছেড়েছেন। তবু বোকা জুনিয়র্সের তীব্র সমর্থক ট্যাক্সি ড্রাইভার পাবলো কেসেরেস জানেন, ‘পালেরমো এখন চিলিতে কোচিং করাচ্ছে। ’ তবে অসংখ্য মূর্তি আর ছবিতে তিনি চিরস্থায়ী হয়ে আছেন বোকা জুনিয়র্সে।

গাইড আরো কী কী তথ্য দিয়ে যাচ্ছেন অনর্গল। সব লিখতে গেলে মহাভারত হয়ে যাবে। তবে কিছু তথ্য আবার না জানালেই নয়। যেমন—বোকা জুনিয়র্সের মাঠে টুয়েলভথ ম্যান নামে একটা স্ট্যান্ড আছে। প্রথমবার বিদেশ সফরে যাবে দল; কিন্তু টাকা নেই। তাই মাত্র ১১ জনের একটা দলকে ইউরোপে পাঠিয়েছিল বোকা জুনিয়র্স, সঙ্গে সমর্থক একজন। সেদিন থেকে তিনিই বোকার টুয়েলভথ ম্যান, তাঁর স্মরণে পুরো একটা স্ট্যান্ড। ৫৫ হাজার আসনের একটা অংশ বরাদ্দ অতিথি দলের জন্য। ক্যামিলা ফিসফিস করে জানালেন, ‘ওই গ্যালারিটা সবচেয়ে খারাপ। রোদে প্রচণ্ড গরম আর শীতে জমে যাওয়ার অবস্থা হয়!’ আরেকটা অংশে কোনো চেয়ার নেই। ‘এটা ওয়ার্কিং ক্লাসের জন্য। তারা ম্যাচ শুরুর ঘণ্টা দুয়েক আগেই এসে পড়েন। এক, দুই, তিন গুনে সবাই মিলে লাফায় আর চিত্কার করে গো-ও-ল! কেন জানেন? এর ঠিক নিচেই বোকার ড্রেসিংরুম। দর্শকদের চিত্কার তাদের উজ্জীবিত করে’, বলেই পথ দেখিয়ে নিচের ড্রেসিংরুমে নিয়ে গেলেন গাইড। ঢুকতেই বাঁয়ে শাওয়ার রুম, ডানে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য কিছু সোফা। একটু এগোলে সামনে ডানের রুমটা চেঞ্জিং রুম, যেখানে একসময় বসেছেন ম্যারাডোনা, রিকুয়েলমে; এখন বসেন তেভেজ এবং অন্যরা। ভেতরে উঁকি দেওয়ার সুযোগ মিলেছে শুধু। প্রত্যেকের আসন নির্দিষ্ট করা, যথারীতি মাঝখানেরটা তেভেজের। একালে তিনিই যে বোকার ম্যারাডোনা!

আরেকটা তথ্য। কারো কারো জানা হয়তো, বোকার অন্য একটা নামও আছে ‘লা বোম্বোনেরা’, মানে চকোলেট নির্মাতা। প্রথম নকশায় স্টেডিয়ামটা ছিল চকোলেট বাক্স আকৃতির। সে থেকেই প্রতিপক্ষ দলগুলো ‘লা বোম্বোনেরা’ নামে ডাকা শুরু করে। কবে এবং কী করে যেন সেই বিদ্রূপটাই ভালোবেসে গ্রহণ করে নিয়েছে বোকা জুনিয়র্স ফ্যানরা। এখন আর বিদ্রূপাত্মক মনেও হয় না। আসলেই তো বিনোদনের চকোলেট বিলিয়ে যাচ্ছে বোকা জুনিয়র্স।


মন্তব্য