kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আর্জেন্টিনার ক্রিকেট...

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ঢেঁকি নাকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে। এ তথ্যের পক্ষে কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ অবশ্য নেই।

তবে ক্রিকেট রিপোর্টারের মন যে বিদেশে গেলে ক্রিকেট খোঁজে, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর্জেন্টিনায় যেমন খোঁজও মিলে গেল ক্রিকেটের! ৩৪ বছরের তরুণ এস্তেবান আলফ্রেদো ম্যাকডারমটের, ফেসবুক পেজ আর বিজনেস কার্ডে তিনি বিলি ম্যাকডারমট। এখনো মৌসুম এলে ক্রিকেট খেলেন, এমনিতে ক্রিকেট আর্জেন্টিনার সার্বক্ষণিক প্রধান নির্বাহী। জেএম গুতিরেজ ৩৮২৯ বিল্ডিংটার সামনে দাঁড়ালে ঘুণাক্ষরেও টের পাওয়া যাবে না এখানে একটা দেশের ক্রিকেট প্রশাসন চলমান। তার পরও ইন্টারকমে পরিচয় নিশ্চিত করার পর দোতলায় যে এ দৃশ্যের দেখা মিলবে, তা ভাবিনি। একটাই রুম ১২ বাই ১২ ফুটের, করপোরেট টেবিলে ল্যাপটপ খুলে বসে প্রধান নির্বাহী বিলি ম্যাকডারমট। সামনে একটাই চেয়ার আর চারপাশে কিছু ট্রফি, গিয়ার্স আর ফাইলপত্র ছড়িয়ে। এ যেন আচমকা টাইম মেশিনে চড়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের অফিসে ঢুঁ মারা! শুনেছি বিদ্যুৎ চলে গেলে মোমবাতি জ্বালিয়ে অফিস করতেন একসময়কার সংগঠকরা। আর্জেন্টিনায় এখনো বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সঙ্গে পরিচয় হয়নি। তাই ধরে নেওয়া যায়, মোমবাতি জ্বালাতে হয় না বিলিকে। তবে মাঠপর্যায়ে তাঁর অবস্থা সে যুগের বাংলাদেশি ক্রিকেট সংগঠকদের চেয়েও করুণ!

 

‘সরকার আমাদের দিকে ফিরেও তাকায় না। বলার মতো স্পনসরও নেই। আইসিসি যে অনুদান দেয়, তা দিয়েই কোনো রকমে চালিয়ে নিই’, বিলি ম্যাকডারমটের ইংরেজি শুনে রীতিমতো মুগ্ধ। বাবা ইংরেজির শিক্ষক, তাই ওটা ঘরেই শেখা হয়ে গেছে তাঁর, ‘স্কুলে ফ্রেঞ্চ শিখেছিলাম। কিন্তু ওটা আর চর্চা করি না, ভুলে গেছি মনে হয়। ’ তা না হয় বোঝা গেল; কিন্তু ফুটবল-রাগবি-বাস্কেটবল ফেলে ক্রিকেটে এলেন কেন? ‘ফুটবল-রাগবি আমিও খেলতাম। সব খেলাই খেলতাম। কিন্তু স্কুলে আমার গেমস টিচার এক-আধটু ক্রিকেট জানতেন। তো অফ সিজনে একদিন তিনি বললেন ক্রিকেট খেলবে? সেই শুরু, এরপর খেলাটা ভালো লেগে যায়’, জাতীয় দলেও খেলেছেন এ অফস্পিনার অলরাউন্ডার।

এখনো খেলছেন ক্লাব পর্যায়ে। আর ক্রিকেটের প্রতি ভালোবাসা এতটাই বেশি যে অন্য পেশায় যোগ দেওয়ার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও বেছে নিয়েছেন ক্রিকেট প্রশাসকের চাকরিটা, তা পদে পদে যত বিপত্তিই থাকুক না কেন। ফুটবলের দেশে বাস্কেটবল জনপ্রিয় আগে থেকেই। গত বিশ্বকাপে তৃতীয় হওয়ায় সম্প্রতি ‘অভ্যুদয়’ ঘটেছে রাগবিরও। এ ডামাডোলে ক্রিকেটের কল্কে নেই আর্জেন্টিনায়। সরকার, স্পনসর, দর্শক কিংবা মিডিয়া—কোথাও কদর নেই ক্রিকেটের। অথচ সেই ১৮০৬ সালে ইংরেজদের ‘জাহাজে’ চড়ে আর্জেন্টিনায় ক্রিকেটের প্রবেশ। ২০০৬ সালে দ্বিশতবার্ষিকী উদ্যাপনও করেছে দেশটি। তবু সেই তিমিরেই ক্রিকেট। কারণটা জানালেন বিলিই, ‘শুরুর দিকে ক্রিকেট খেলত শুধু ইংরেজরা। নেটিভদের (স্থানীয়দের) অনুমতি ছিল না। এরপর দরজা খুলেছিল; কিন্তু পঞ্চাশ-ষাটের দশকে প্রায় হারিয়েই গিয়েছিল ক্রিকেট। এখন আবার খেলাটার প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বেশ ভালো সাড়া পাচ্ছি। ট্যালেন্ট আছে, তবে পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নেই।

বেশ ভালো সাড়া বলতে মিডিয়ায় কিছু নেই। আর্জেন্টিনায় ক্রিকেট জার্নালিজমের কোনো শাখা নেই। প্রচার বলতে, ‘ফেসবুকে আমাদের ফলোয়ারের সংখ্যা এখন তিন হাজার ছাড়িয়েছে। ’ তাঁকে বলি কী করে বাংলাদেশের একজন সাকিব আল হাসানের ফেসবুক পেজ অনুসারী ৯২ লাখ!

বিলি ম্যাকডারমটের পেছনের র‌্যাকে একজোড়া প্যাড, ইম্পোর্টেড। ‘আমাদের এখানে কোনো স্পোর্টস গুডসের দোকানে ক্রিকেট গিয়ার্স পাওয়া যায় না। তাই সব কিছু বাইরে থেকে আনতে হয়। কেউ ইংল্যান্ড থেকে ফিরছে শুনলেই ক্রিকেট গিয়ার্স নিয়ে আসতে বলি’, ক্রিকেট আর্জেন্টিনার প্রধান নির্বাহীর দুঃখের সাতকাহন শুনি আর বিস্মিত হই। রাগবি যখন হয় না, সে সময়টায় ফ্লিক্স বিছিয়ে শুরু হয় ক্রিকেট। ‘এই তো অক্টোবরে আমাদের মৌসুম শুরু হবে। সিনিয়র ডিভিশনে মোট ছয়টি ক্লাব। ২০, ৪০ ওভারের ম্যাচ। তবে সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী টুর্নামেন্টটা একেবারে শেষে। সেরাদের নিয়ে গড়া দুটি দলকে নিয়ে হয় তিন দিনের সেই ম্যাচটি। মৌসুমের সবচেয়ে বড় ম্যাচ’ বলতে বলতে অনেকগুলো ফাইনালের নিচ থেকে গৌরবমাখা ওই আসরের শিল্ডটি বের করলেন বিলি ম্যাকডারমট। জুলে রিমের মতো এটা আর হস্তান্তরিত হয়নি, প্রতি মৌসুমে একটা করে নতুন বছরের নাম খোদাই হয় শুধু। অযত্নে পড়ে থাকা জীর্ণপ্রায় ট্রফিতেও পুরনো বাংলাদেশের ছবি।

ভরসা দেওয়ার জন্যই জানানো যে একসময় বাংলাদেশ ক্রিকেটের অবস্থাও এমন হতদরিদ্র ছিল। আর্জেন্টিনারও তেমন সুদিন আসবে বলে খুব আশান্বিত করা গেল না বিলি ম্যাকডারমটকে, ‘আসলে হয়েছে কি আমরা আইসিসির যে টুর্নামেন্টে খেলি, সেখানে অভিবাসীদের ছড়াছড়ি। গত মৌসুমেই যেমন ইতালির সঙ্গে ম্যাচে দেখলাম ওদের দলে মাত্র একজন ইতালিয়ান। অথচ আমাদের দলে শতভাগ আর্জেন্টাইন। তাই ওদের সঙ্গে আর পেরে উঠি না। ’

বাংলাদেশের ক্রিকেট সম্পর্কে টুকটাক খবরও জানা আছে বিলির, ‘বিশ্বকাপে ভারত ওই ম্যাচটায় তোমাদের কেমন হারিয়ে দিল। ’ বাংলাদেশের এক ক্রিকেটারের ফ্যানও তিনি, ‘দ্য গাই নেমড তামিম ইকবাল। কি প্লেয়ার! তামিমকে এবং বাংলাদেশ ক্রিকেটকে আমার পক্ষ থেকে ক্রিকেট আর্জেন্টিনার শুভ কামনা জানিও। ’

আরো বেশি শুভ কামনা দরকার তাঁর নিজের দেশের ক্রিকেটের জন্যই। ভাবা যায়, একটা দেশে ক্রিকেট চর্চা শুরু ২০০ বছরেরও আগে, ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়েছে সেই ১৯১৩ সালে। গায়ানা বাদ দিলে দক্ষিণ আমেরিকার সবচেয়ে শক্তিশালী ক্রিকেট দলটি থমকে আছে আইসিসির ডিভিশন থ্রিতে!

তথ্যসংযুক্তি, বিলিসহ ক্রিকেট আর্জেন্টিনার কর্মচারী মোট পাঁচজন। এর মধ্যে কোচিং স্টাফ বাদ দিলে প্রধান নির্বাহীর সহকারী-কাম-হিসবারক্ষক হিসেবে একজন রয়েছেন দপ্তরে।


মন্তব্য