kalerkantho

শুক্রবার । ২ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ১ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ম্যারাডোনাকে ছাপিয়ে মেসি

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ম্যারাডোনাকে ছাপিয়ে মেসি

লিওনেল মেসি বার্সেলোনার। আর্জেন্টিনার হয়ে কিচ্ছু জিততে পারেননি যে! মিডিয়ায় এমন সমালোচনার পর মনে হয়েছিল সত্যি বুঝি চিত্রটা এমন সর্বজনীন।

কিন্তু কোথায় কি? বুয়েনস এইরেস থেকে রোসারিও হয়ে হুনিন, আর্জেন্টিনার রাজধানী থেকে মফস্বলে—সবখানেই ১৯৮৬ বিশ্বকাপজয়ী মহানায়কের চেয়ে জনপ্রিয়তায় এগিয়ে মেসি। এক বোকা জুনিয়র্সেই যা প্রতিপত্তি ম্যারাডোনার।

আরিয়েল কোলম্যান মাঝবয়সী, তাই ডিয়েগো ম্যারাডোনার স্বর্ণসময়টা দেখেছেন। দেখেছেন বলেই খাবারের টেবিলে দুই ছেলেকে অবলীলায় ম্যারাডোনাকে পেছনে ফেলে মেসিকে এগিয়ে রাখা দেখে আত্মসংশোধনের চেষ্টা করেন, ‘বুঝেছি, তোমাদের ম্যারাডোনার ভিডিও দেখাতে হবে। ’ কোলম্যানের দুই ছেলের বয়স ১৪ আর ১০। বড়জন টমি ফুটবল খেলে। বাড়ির উঠানে বল নিয়ে কারিকুরি দেখে বোঝা গেল ছোট ছেলে লুকাও ঢাকার পাড়ার ফুটবল কাঁপিয়ে দেওয়ার সামর্থ্য রাখে। তো, বাবার ধারণা ম্যারাডোনার খেলা দেখেনি বলেই মেসিতে মগ্ন ছেলেরা।

অবশ্য এই দুই কিশোর কেন, জুনিন থেকে গতকাল বাসে বুয়েনস এইরেস ফেরার পথে সহযাত্রী বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র কাম্বিয়ানির নিজেরও হিরো মেসি, ‘অসাধারণ, বিশ্বসেরা। ম্যারাডোনাও ভালো। তবে মেসি অন্য রকম। ’ ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে আরো যা বলল চটপটে ছেলেটি, তাতে মনে হতে পারে তার পছন্দের তালিকায় ম্যারাডোনা আরো পরে আছেন, ‘আমার রোনালদিনহোর খেলা খুব ভালো লাগত। ক্রিস্তিয়ানোও (রোনালদো) দুর্দান্ত। রোমানেরও (রিকুয়েলমে) ফ্যান আমি। ’ নিজের মোবাইল স্ক্রিনে কলেজ ফুটবল টিমের ছবি দেখিয়ে বুঝিয়ে দিল সে নিজেও কম কেউকেটা নয়, ‘আমি ফলস নাইন পজিশনে খেলি। ’

কিন্তু ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না। রোসারিওতে হোটেল রিসেপশনের দুই যুবক কেমন অবলীলায় বলে গেল, ‘ম্যারাডোনা তো ভালোই। ’ বুকে একটা চাপড় বরাদ্দ প্রায় একা হাতে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপ জেতানো ম্যারাডোনা। আর মেসির নাম উচ্চারণের সময় দুইবার চাপড় বুকে, ‘ওহ, মে-স-সি!’ জনমত জরিপের সূত্র যদি অব্যর্থ হয়, তাহলে নিশ্চিত করেই বলে দিচ্ছি আর্জেন্টিনার এ প্রজন্মের কাছে ম্যারাডোনা একদা ভালো খেলতেন, দেশকে বিশ্বকাপও জিতিয়েছেন। কিন্তু মেসির সঙ্গে ভোটাভুটি হলে নির্ঘাত ভরাডুবি হবে তাঁর।

তবে কোলম্যান কিংবা তাঁর সমবয়সীদের কাছে এই মেসিপ্রেম আসলে ‘বখে’ যাওয়ার সমতুল্য। সে তিনি একা নন, তাঁর একান্নবর্তী পরিবারে ম্যারাডোনা বনাম মেসি তর্ক তুলে দিয়েও একই ফল মিলেছে। কোলম্যান তাঁর কিশোরবয়সী ভাইয়ের ছেলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, ‘এইটা আমাদের মেসি’। শুনে ভবিষ্যতের মেসি দারুণ গর্বিত। কিন্তু মেসি তো কোনো কাপটাপ জেতেনি। যা জিতেছে সবই বার্সেলোনার হয়ে, মনে করিয়ে দিতেই কিশোরের ম্লানমুখ। অবশ্য এর কারণ মোটেও মেসির অপ্রাপ্তির বেদনা নয়, মেসির অকারণ নিন্দা করার জন্য! একটু বুঝিয়ে হাসি ফিরিয়ে আনার পর নিজের পছন্দের তালিকা জানালো ক্লারো, “ক্রিস্তিয়ানোকেও ভালো লাগে। নেইমারও ‘সি বোঁ’!” ভাবার্থ, নেইমারও ভালোই খেলেন। পছন্দের ব্যাপ্তিতে কেমন যেন যুগের হাওয়া লেগে। নইলে ক্লারোর বাবা, দাদি কেন ম্যারাডোনার পক্ষে সাফাই গাইবেন একতরফা। তাঁরা তাঁদের সময়ে দেখছেন ম্যারাডোনার স্বর্ণসময়। ক্লারোরা মেসি যুগের ফুটবল অনুরাগী।

তাই বলে এমন একতরফা? আরেকটা ড্রাইভে যাওয়ার সময় স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে আরিয়েল কোলম্যান ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করেছেন, ‘এখন তো সব খেলা সরাসরি দেখা কত রকমের অ্যাঙ্গেল থেকে। ইউটিউবে বারবার দেখা যায়। তা ছাড়া আরেকটা কারণও আছে। কোপা আমেরিকার পর মেসির অবসর এবং ফিরেই বিশ্বকাপ বাছাই ম্যাচে গোল করার প্রভাবও রয়েছে। মেসি অবসর নেওয়ার পর সবাই তাকে দুঃখী রাজকুমার ভাবতে শুরু করে। এত বড় প্লেয়ার এভাবে চলে যাবে! আর ফিরে চোট নিয়েও উরুগুয়ের বিপক্ষে গোল করে জিতিয়েছে মেসি। এটা ওর জনপ্রিয়তা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। ’

সব যুক্তিতর্কের পরও বিস্ময়ের ঘোর কাটছে না। ব্রাজিলে পেলে এখনো পেলেই আছেন। একজন রোনালদো কিংবা রোমারিও তাঁর পদমর্যাদাহানি ঘটাতে পারেননি। আর্জেন্টিনার গোটা তিনেক শহর ঘুরে মনে হলো, মর্যাদার ম্যাচে ম্যারাডোনাকে ৫-১ গোলে হারিয়ে চলেছেন মেসি। ম্যারাডোনার একমাত্র গোলটা বোকা জুনিয়র্সে, যে ক্লাবে খেলেছেন তিনি সেখানে মেসি স্রেফ সৌজন্য কপি! তবু আর্জেন্টিনার সব কিশোরেরই স্বপ্ন মেসি হওয়ার। কেউ ভালো খেললে তার নাম হয়ে যাচ্ছে অমুক দলের মেসি। কিন্তু ম্যারাডোনা নয় কেন, ব্রাজিলে যেমন ভবিষ্যতের পেলে বলা হয়।

কোথাও যথার্থ উত্তর নেই। কে জানে, কোলম্যানের ব্যাখ্যাটাই সর্বৈব সত্য কি না, ‘আসলে ম্যারাডোনা তো এখন আর খেলেন না। টিভিতে তাঁকে এ প্রজন্ম দেখে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সমালোচনা করে। বেশির ভাগ সময়ই থাকেন দুবাইয়ে। মেসিও আর্জেন্টিনায় থাকে না, তবে টিভিতে ওর খেলাটাতো ঠিকই দেখছে তরুণরা। তাই ওকেই কপি করার চেষ্টা করছে সবাই। ’ ‘বেনিফিট অব ডাউট’ পেতেই পারে কোলম্যানের ব্যাখ্যা, এর চেয়ে গ্রহণযোগ্য আর কোনো কারণ যে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

এ নিয়ে আর্জেন্টিনার বয়োজ্যেষ্ঠদের কি কোনো মর্মবেদনা হয়? আলবৎ হয়। ‘ওয়েল, মেসিকে আমিও বড় ফুটবলার মনে করি। ফুটবলকে ঈশ্বরের উপহার। কিন্তু এই মেসি-মেসি করতে গিয়ে আমরা ম্যারাডোনাকে ভুলে যাচ্ছি—এটা ভেবেই একটু কষ্ট পাই’, বলে গাড়ির গতি কমিয়ে হাত দুটো ঢিলে করে দিলেন কোলম্যান।

আর্জেন্টিনার দুর্দান্ত হাইওয়েতে চালকের স্নায়ু শিথিল করার জন্য মাঝেমধ্যে গতি কমানোর নির্দেশনা রয়েছে। কাকতালীয়ভাবে ঠিক ওই সময়টাতেই নির্দেশনাটা সামনে পড়েছে, যা খুব দরকার ছিল!


মন্তব্য