kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রোজারিওতে মেসি আছেন আবার নেইও

৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



রোজারিওতে মেসি আছেন আবার নেইও

ফুটবলে সামান্যতম আগ্রহ থাকলে লিওনেল মেসির খেলা ভালো লাগতে হবে, সে আপনি যতই ব্রাজিল সমর্থক হোন না কেন। এ যুগের ফুটবল আড্ডার এটা অনিবার্য শর্ত।

ব্রাজিলে অলিম্পিক শেষে এত কিছু ‘বিসর্জন’ দিয়ে আর্জেন্টিনার বুয়েনস এইরেস হয়ে বাসে রোজারিও যাওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য তো মেসিই। কিন্তু তিনি কোথায়? জন্মস্থানের কোথাও যে মেসি নেই!

এর আগেও বিশ্বের জনাকয়েক সাংবাদিক রোজারিও ঘুরে গেছেন। তাঁদের প্রতিবেদনের কোথাও রোজারিও ‘মেসিময়’ এমন তথ্য নেই। বরং সব প্রতিবেদনেই মেসিহীন রোজারিওর ছবিই ফুটে উঠেছে। সে কারণেই কিনা ব্রাজিল থেকে যোগাযোগের সময় বাংলাদেশ ফুটবল দলের সাবেক কোচ ডিয়েগো ক্রুসিয়ানি মাছি তাড়ানোর মতো করে বলেছিলেন, ‘রোজারিও যাবে? ওখানে তো কিচ্ছু নেই!’ সে তো জানি, তবু মেসির জন্মভূমি যখন, যাবই। গেলামও। মাঝে একটা রাত মিলিয়ে ১৯ ঘণ্টার অবস্থানকালে মেসিকে তন্ন তন্ন করে যে খুঁজে পাওয়া যাবে না, এ ‘নির্মমতা’ পূর্ব ধারণাকেও হার মানিয়েছে।

হাতে চাঁদ পাওয়ার মতো একজন সার্বক্ষণিক গাইড মিলেছিল, বাংলাদেশ দলের সাবেক ট্রেনার আরিয়েল কোলম্যানকে। বেচারা প্রায় ২০০ কিলোমিটার ড্রাইভ করে রোজারিওতে এসেছেন এই বঙ্গসন্তানকে মেসির খোঁজ নিয়ে দিতে। হোটেলে ব্যাগটা কোনো রকমে রেখেই তাঁর সঙ্গে বেরিয়ে পড়া। এ রাস্তা-ও রাস্তা, এ পার্ক-ও পার্ক, সুপার মল, ফুড কোর্ট; সবখানেই একের পর এক লোককে জেরা করছেন কোলম্যান, ‘মেসির বাড়িটা কোথায়?’ কেউ জানে না! একজনের উত্তর শুনে প্রৌঢ় ট্রেনার হেসে খুন, ‘ও বলছে মেসির বাড়ি তো স্পেনে!’

আসলেই তো। সেই ১২ বছর বয়সে স্পেনে পাড়ি দেওয়ার পর রোজারিওতে অনুপস্থিত লিওনেল মেসি। তাই বিশ্বসেরা ফুটবলারকে নিয়ে গর্ব আছে রোজারিওবাসীর, কিন্তু তাঁর জন্ম যে বাড়িতে, তা নিয়ে আহ্লাদ নেই কারোর। হলিডে ইন হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কের দুই রিসেপশনিস্ট মেসির তুমুল ভক্ত, ডিয়েগো ম্যারাডোনার চেয়েও লিওকে বড় ফুটবলার মনে করেন মধ্য বিশের দুই স্থানীয় যুবক। কিন্তু মাত্র সাড়ে তিন লাখের জনপদে মেসির বাড়িটা কোথায়, প্রশ্ন করতেই কাঁচুমাচু ভাব, ‘ইয়ে, মানে আমাদের কাছে একটা ট্যুর ম্যাপ আছে। ’ সেটা মেলে ধরে একের পর এক শহরের ল্যান্ডমার্ক দেখিয়ে যাচ্ছে দুজন, কিন্তু কোথাও মেসির বাড়ি নেই।

তাই আমরা শহরময় ঘুরতে থাকি। সুবিধা হলো, ছোট্ট করে হর্ন বাজিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলেই পথচারী এগিয়ে আসেন এখানে। কিন্তু মেসির বাড়ির দিশা আর দিতে পারেন না কেউ। পুরনো একটি প্রতিবেদন ঘেঁটে ঠিকানা বলার পরও যে সেটি কেউ বাতলে দিতে পারবেন না, এমন অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার জন্য তৈরি ছিলাম না মোটেও।

এদিক-ওদিক তল্লাশি চালাতে চালাতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসায় সোজা নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ ক্লাবে যাওয়া। এ ক্লাবেই অঙ্কুরোদ্গম মেসির, নিশ্চয় কিছু পাওয়া যাবে। কিসের কি? ইংরেজ এবং জার্মান বংশলতিকার নিউয়েল সাহেবের সৃষ্টি শতবর্ষী এ ক্লাবটি ব্যস্ত নানান খেলায়। আর্জেন্টিনা বনাম ভিয়েতনাম ফুটসাল দেখে রাতে টিভিতে দেখি ওয়াটার পোলো নিয়ে মহা হৈচৈ হচ্ছে টিভিতে। স্প্যানিশ থেকে অনুবাদ করে কোলম্যান জানালেন বিশ্ব ক্লাব চ্যাম্পিয়নশিপে কোয়ালিফাই করেছে নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের দল। মাঝেমধ্যে ফুটবলের হাইলাইটসেও ক্লাবটির সাফল্যের ছবি। বোঝা গেল স্পেনে পাড়ি দেওয়া মেসিকে তোষণের ফুরসত সেই ক্লাবটির। বরং পরদিন (গতকাল) একটি টুর্নামেন্টের শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচের পূর্বাভাস নিয়ে তুমুল শোরগোল শনিবারের রাতের পাবে-রেস্তোরাঁয়। সাফল্যের প্রভাবটাই বুঝি এমন। হাতের কাছে হাজার সাফল্যের হাতিয়ার আছে বলেই সম্ভবত মেসি মৌতাতে অতটা আচ্ছন্ন নয় রোজারিও।

কিন্তু বাংলাদেশ থেকে অতটা পথ গিয়ে মেসির বাড়ি না দেখলে চলে! অবশ্য প্রাথমিক একটা চমক বিকেলেই উপহার দিয়েছেন আরিয়েল কোলম্যান। বিখ্যাত পারানা নদীর তীরে ‘পার্কো ন্যাসিওনাল আ লা বান্দেরা’ ঘুরে বেরোনোর পথেই একটু দূরের ধবধবে সাদা সুউচ্চ একটি অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং দেখিয়ে জানালেন, ‘এটা কিন্তু মেসির বাড়ি। ’ আগে কোথাও পড়িনি। তাই সন্দেহ হলো, ২০০ কিলোমিটার দূরের জুনিন (স্প্যানিশে হুনিন) নিবাসী ভুলভাল বলছেন না তো! তিনি অবশ্য আশ্বস্ত করলেন, ‘আমি না জেনে বলতে যাব কেন?’ অবশ্য এ বাড়িতে মেসি কখনো থেকেছেন বলে জানেন না তিনি। ফ্ল্যাটগুলো ভাড়া দেওয়া হয়েছে বলেই স্থানীয় এক বন্ধুর কাছে শুনেছেন কোলম্যান।

রাতের পাট এভাবেই চুকল। কিন্তু মেসির আসল বাড়িটা যে দেখতেই হবে। তাই সাতসকালে আবারও গাড়িতে বেরিয়ে পড়া। শনিবারের রাতের মচ্ছবের পর যথারীতি শুনশান রোজারিওর পথঘাট। এর মধ্যেও কয়েকজন নিয়ম করে হাঁটতে কিংবা জগিং করতে বেরিয়েছেন। নিয়ম করেই তাঁদের প্রত্যেকের সামনে গিয়ে ব্রেক চাপছেন কোলম্যান। একজনের পরামর্শে শহরের আবাসিক এলাকা ছেড়ে বাণিজ্যিক এলাকায় যাওয়া। কিন্তু সেখানেও একই দশা, কেউ জানে না মেসি কোথায় থাকেন। একজন হকারকে ঘুস দিয়ে মিলল শুধুই বিভ্রান্তি। বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে যে নির্দেশনা দিল, সে মতে গিয়ে পাওয়া গেল রোজারিও সেন্ট্রাল ক্লাবের স্টেডিয়ামটি। এ ক্লাবটি আবার শহরে নিউয়েলসের প্রধানতম প্রতিদ্বন্দ্বী, চিরশত্রুও। প্রাপ্তি একটাই—এ ক্লাবের প্রচণ্ড অনুরক্ত ছিলেন চে গুয়েভারা, জীবদ্দশায় কোনো ম্যাচ মিস করেননি বলেই জনশ্রুতি আছে।

কিন্তু মেসির বাড়িটা তো খুঁজতে হবে। এদিকে বাসের সময় ঘনিয়ে এসেছে। তাই হাতের ওপর রাখা মেসির জন্মস্থানের ছবির প্রিন্ট আউটকে ভরসা করেই নতুন করে ছোটা শুরু। এরকম সাধারণ বাড়ির অভাব নেই রোজারিওতে। তাই কাজটা প্রায় অসাধ্য জেনেও একদফা ছোটাছুটির পর্বে দেখা মিলল একজনের, যিনি প্রায় নিশ্চিত করে দিলেন। তবে দুটি এবং দুটি নির্দেশনা বিপরীতগামী পথের! হাতে সময় নেই, তাই আমরা বেছে নিলাম একটা পথ। সে পথ রোজারিও ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার।

পেছনে কিছু ফেলে গেলাম কি? ফেলে তো গেলামই। কায়ে এস্তাদো দো ইসরায়েলের ৫২৫ নম্বর বাড়িটা। সঙ্গে নিয়ে গেলাম একরাশ বিস্ময়। পুরো শহরের প্রতিটা মানুষ (যাদের সঙ্গেই কথা হয়েছে। সঙ্গী স্প্যানিশভাষী হওয়ায় সংখ্যাটা কমও নয়) মেসিভক্ত, কিন্তু জানেন না ছোট্ট এ শহরটার কোন বাসায় তাঁর জন্ম। আরো বিস্ময় মন ভালো করে দেওয়া এ শহরে না এলে জানতামই না যে মেসি ছাড়াও গর্ব করার জন্য বিষয়বস্তুর মস্ত একটা জাদুঘর রয়েছে রোজারিওর।

সে জাদুঘর নিয়ে কথা হবে পরে কোনো একদিন।


মন্তব্য