kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


মেসির শহরে ফুটসাল উৎসবে

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মেসির শহরে ফুটসাল উৎসবে

পরাশক্তি মার্কিন সেনা কেন পিছুটান দিয়েছিল ভিয়েতনাম থেকে, হাত বাড়ানো দূরত্বে বসে সেটার একটা নমুনা দেখা হলো। সঙ্গে দেখা হলো ছোট মাঠে জানবাজি রেখে দৌড়াদৌড়ির চেয়ে স্কিলটাই যে বেশি কার্যকর, সেটার প্রমাণও।

এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাকে বলে। অবশ্য মেসির শহরে ভাগ্যক্রমে ছোট মাঠের মেগা ইভেন্টে মিশে যেতে পারা এক ঢিলে সব পাখি মেরে ফেলার মতোই অবিশ্বাস্য, শ্বাসরুদ্ধকরও।

রোজারিও মানেই লিওনেল মেসির শহর। বিপ্লব আজন্ম মনে ধারণ করে রাখা মানুষের কাছে রোজারিও চে গুয়েভারার শহর। রিও পারানা নদীতীরের ‘পার্কো ন্যাসিওনাল আ লা বান্দেরা’র দিকে দৃষ্টি মেলে মনে হবে সৃষ্টি আর ইতিহাসের আরো বড় সাক্ষী বুয়েনস এইরেস থেকে তিন শ মাইল দূরের রোজারিও। বিশাল ছিমছাম পার্ক আর সামনের সড়ক পেরোলেই চোখ ধাঁধানো ‘মনুমেন্তো’, মনুমেন্ট আর কি। ম্যানুয়েল বেলগ্রানোর মৃত্যুবার্ষিকী উদ্্যাপনের দিনে, ১৯৫৭ সালের ২০ জুন উদ্বোধন করা হয় অনন্য এ স্থাপত্য।

ম্যানুয়েল বেলগ্রানোটা কে? পারানা নদীর ওপারে ছোট্ট একটি দ্বীপ আছে। সেখানে বসে একদিন আকাশের রং দেখে আর্জেন্টিনার পতাকা এঁকেছিলেন তিনি। ১৮১০ সালের মে মাসে ছোট্ট দ্বীপে নিজের বানানো আকাশি-নীল পতাকা উড়িয়েছিলেন বেলগ্রানো নিজেই। আর্জেন্টিনার রাজনীতিতে উত্থানপতনেও পতাকার রং কিংবা ডিজাইন আর বদলায়নি। তো, কীর্তিমানকে স্মরণেও রেখেছে রোজারিও। ৭০ মিটার উঁচু স্মারক স্তম্ভ আর বিপ্লবের নিদর্শন এমন স্থাপত্যে সাজানো যে মনে হবে যেন আস্ত একটা জাহাজ মাস্তুল উঁচিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে। গায়ে লেখা আতলান্তিকো; সঙ্গী আর্জেন্টাইন আরিয়েল কোলম্যান ব্যাখ্যা দিলেন, ‘সমুদ্র-জাহাজ-আকাশ খুব পছন্দ ছিল বেলগ্রানোর। দেখছেন না পতাকা ডিজাইন করেছিলেন আকাশের রং থেকে। ’ রোজারিওর বিপ্লবীরা তাহলে জন্মগতভাবেই শিল্পী! চে গুয়েভারা তো রীতিমতো শিল্পজগতের রকস্টার! তাঁর প্রসঙ্গে পরে বলা যাবে, বিশ্বের কাছে রোজারিওতে চে’র এক নম্বর চ্যালেঞ্জার লিওর প্রসঙ্গও তোলা থাক এ পর্বে।

চলুন রোজারিওর আরেক কিংবদন্তির কাছে, আইজ্যাক ক্লদিও নিউয়েল তিনি। ১৯০৩ সালে তাঁর উদ্যোগেই যাত্রা শুরু নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ অ্যাথলেটিক ক্লাবের। পিয়েরে দ্য কুবার্তিন যদি অলিম্পিকের জন্য চিরস্মরণীয় হয়ে থাকেন, তাহলে ইংলিশ ও জার্মান ব্যাকগ্রাউন্ডের এ আর্জেন্টাইন রোজারিওর ক্রীড়াঙ্গনের প্রবাদপুরুষ, সবচেয়ে প্রভাবশালী তো বটেই। তিনি বিগত হয়েছে বহুদিন, তবে রোজারিও পাথরের তাঁকে ধারণ করে রেখেছে চিরকালের জন্য। নিউয়েলস ওল্ড বয়েজ অ্যাথলেটিক ক্লাব সদর্পে হয়ে আছে ছোট্ট এ শহরটির ‘বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম’। না, আরো বড় কিছুই মনে হয়েছে। এ তো আর শুধু ফুটবল কিংবা ফুটসাল নয়, জিমনেসিয়াম, ফ্র্যাঞ্চাইজি স্টোর, চায়ের আড্ডাখানা এবং সর্বোপরি ক্লাব সংস্কৃতির আধার হয়ে এমনভাবে পাপড়ি মেলে আছে যে ভালো লাগার পাশাপাশি আচমকা বিষণ্নতাও আছড়ে পড়ে মনে; আহা, আমাদের পরিবার-বাচ্চারা যদি এমন এক টুকরো পরিবেশ পেত!

মেসি আর চে গুয়েভারার সূত্র ধরেই এত দূর আসা। নিউয়েলসের মাঠে পড়ন্ত বিকেলে যাওয়াও মেসির কারণে। মহারথীর এ মাঠেই প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলের শুরু যে। তো, ভেতরে ঢোকার পথেই পাশ দিয়ে পিলপিল করে ঢুকছে রোজারিওর কিশোররা। কত বয়স হবে, ছয় থেকে আট। মেসি তো এই বয়সেই চমকে দিয়েছিলেন পাড়া-প্রতিবেশীদের। নিউয়েল সাহেবের ডিজাইন করা লাল-কালো ডোরা জার্সি গায়ের শিশুদের মাঝেও কি ভবিষ্যতের কোনো মেসি আছে? ভাষাগত সমস্যা আর বাবা-মায়েদের গ্যালারিতে ঢোকার ব্যস্ততার কারণে সেটি আর জানতে চাওয়া হয়নি।

সে ব্যস্ততার কারণও অবশ্য আছে। এরিয়েল কোলম্যান কাকে জিজ্ঞাসা করে এসে তাড়া দিলেন, ‘চলো, তোমার ভাগ্য খুব ভালো। একটু পরই আর্জেন্টিনা ন্যাশনাল টিমের ফুটসাল ম্যাচ আছে। ফুটসাল দেখ তো?’ অত দেখিটেখি না। তবে আর্জেন্টিনায় বসে আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের কুত-কুত খেলা দেখতেও আপত্তি নেই। আর এ তো ফুটসাল, ছোট্ট একটি জায়গায় বলের কারিকুরি দেখার অফুরান আনন্দ কেন মিস করব!

লাতিন আমেরিকায় প্রায় মাসখানেক কাটিয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতায় একটা ব্যাপার বুঝে গেছি, নবাগতের জন্য অপ্রত্যাশিত সব কাণ্ডকারখানা ওত পেতে আছে সর্বত্র। নিউয়েলস ওল্ড বয়েজের মূল মাঠের গা ঘেঁষে ছোট্ট ইনডোর। দর্শক আসন হবে বড়জোর হাজার দুয়েক। অবশ্য রোজারিওর জনসংখ্যার তুলনায় একেবারে কমও নয়। টিকিট কেটে ঢোকার পর এরিয়েল কার সঙ্গে কী আলাপ করে এসে নিয়ে গেল একেবারে প্রেসবক্সে। মানে, উডেন ফ্লোর থেকে দুই সিঁড়ি ওপরে। এরিয়েলের ডাকেই নামতে হলো উডেন ফ্লোরে, স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য। আর্জেন্টিনার জনপ্রিয়তম ‘ওলে’র অনলাইন ভার্সনের সাংবাদিক লুকাসের সঙ্গে যখন দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছি, তখন পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন আর্জেন্টিনা আর ভিয়েতনামের খেলোয়াড়রা। দুই দলের জাতীয় সংগীত হচ্ছে আর সামনে দাঁড়িয়ে সেটি মোবাইলে রেকর্ড করছি, নিরাপত্তার স্ট্যান্ডার্ড প্রটোকলে যা অকল্পনীয়! ‘আমার ল্যাপটপটা ওপরে’, বলে লুকাস হাঁটা না দিলে হয়তো উডেন ফ্লোরের এক চিলতে ফাঁকা জমিতে দাঁড়িয়ে খেলা দেখলেও কেউ বাধা দিত না!

খেলা শুরু হলো ঝড়ের গতিতে, যেন বাস্কেটবল খেলা হচ্ছে; এমন প্রচণ্ড গতি! পার্থক্য একটাই—বাস্কেটবলে ফাউল আইনে অনেক কড়াকড়ি। ফুটবল বলেই হয়তো ফুটসালে কিছুটা স্বাধীনতা মেলে ট্যাকলিংয়ে। এর-ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়া দেখে মাঝেমধ্যে আইস হকির ছবি চোখে ভাসছিল। তো, গতি যখন একটা অস্ত্র তখন ‘গেরিলা জাতি’ ভিয়েতনামীরা দুর্ধর্ষ। আরো চমকে দিয়ে প্রথমার্ধ তারা শেষও করেছে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে। ফুটসালের র্যাংকিংয়ে ভিয়েতনাম ৪২তম আর আর্জেন্টিনা পঞ্চম।

কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে সব ওলটপালট। তিনটি চেষ্টা পোস্টে প্রতিহত না হলে এ অর্ধে ৮ গোল হয় আর্জেন্টিনার। তবে ৫-২ গোলে জেতাটাও তো কম নয়, বিশেষ করে শুরুতে পিছিয়ে পড়া দলের জন্য। ৬ নম্বর জার্সি গায়ে অধিনায়ক উইলহেম ফের্নানদো নিঃসন্দেহে ম্যাচের সেরা খেলোয়াড়। ম্যাচের পর গ্যালারি মূল মাঠে মিশে যাওয়ার পর বোঝা গেল লুকাসের মতো ফুটসাল বিশেষজ্ঞ না হলেও বিবেচনাবোধ একেবারে শূন্য নয়! সবাই সেলফি তুলছেন উইলহেমের সঙ্গে। এরিয়েলের চাপাচাপিতে দাঁড়িয়ে পড়া। হাসিমুখে ছবি তোলার পর পরিচয় জেনে উইলহেমের উচ্ছ্বাস, ‘আমি তো ভেবেছিলাম তুমি ব্রাজিলিয়ান!’ এরপর বুক চাপড়ে ‘বাংলাদেশ’ ‘বাংলাদেশ’ বলে ঠিক কি বোঝাতে চাইলেন, বুঝিনি। এরিয়েল, বাংলাদেশের ফুটবলে ট্রেনার হিসেবে পরিচিত আর্জেন্টাইন বুঝিয়ে বললেন, ‘হি লাইকস বাংলাদেশ। ’ হেতু অবশ্য জানা হয়নি।


মন্তব্য