kalerkantho


মেয়েরাই পথ দেখাচ্ছে

শাহজাহান কবির   

৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মেয়েরাই পথ দেখাচ্ছে

‘জাগো গো ভগিনী’ বলে বাংলার পিছিয়ে পড়া নারীদের জন্য তীব্র আর্তি প্রকাশ করেছিলেন বেগম রোকেয়া। এই সময়ের ক্রীড়াঙ্গনে কেমন আমূল বদলে গেছে চিত্রটা! এখন বরং মেয়েদের দেখে ছেলেরা জেগে ওঠার শপথ নিতে পারে। ঠিক এই মুহূর্তে অনূর্ধ্ব-১৬-র মেয়েদের সাফল্যের পিঠেই তো কথা হচ্ছে মালদ্বীপে ছেলেদের ভরাডুবি নিয়ে। দক্ষিণ এশীয় গেমস শেষ হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি, যেখানে ৪টি সোনার ৩টিই মেয়েদের, ৩৭টি পদকের ২৩টিই তাঁদের জেতা।

কৃষ্ণা, সানজিদা, মাবিয়া, মাহফুজারা এই সময়েরই প্রতিনিধি। ছেলেদের চেয়ে কোনো দিক দিয়েই বেশি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছে না তারা। উল্টো সংগ্রামমুখর এখনো অনেকের জীবন। এসএ গেমসে বাংলাদেশকে প্রথম সোনা এনে দেওয়া মাবিয়াকেই যেমন অনেক কথা শুনতে হয়েছে ভারোত্তোলনের মতো খেলায় নাম লেখানোর জন্য। কলসিন্দুরের যে মেয়েরা আজ দেশ-বিদেশের মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, শুধু মেয়ে হওয়ার কারণেই সমাজের অনেক রক্তচক্ষু তাদের উপেক্ষা করতে হয়েছে। বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনই তো সারা বছর ছেলেদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে যতটা ব্যতিব্যস্ত, তার সিকিভাগও মনোযোগ পান না মেয়েরা। বাফুফে ভবনের চতুর্থ তলার ডরমিটরিতে থেকেই তারা এএফসির আসর খেলে যাচ্ছে, যে ধরনের টুর্নামেন্টে ছেলেরা পাঁচ তারকা হোটেলের বিলাসিতায় গা ভাসায়। মেয়েদের কোচিং স্টাফ নিয়েও তো কখনো খুব তোড়জোড় হয়েছে বলে জানা যায়নি। কোচ গোলাম রব্বানী একাগ্র নিষ্ঠায় তাদের তৈরি করে গেছেন। তাতেই ধাপে ধাপে এখন এশিয়ার শীর্ষ পর্যায়ে বাংলাদেশ।

২০০৫ সালেও কেউ ঘুণাক্ষরে ভাবতে পারেননি এই সময়টার কথা। বাংলাদেশে মেয়েদের ফুটবল তখন কেবল শুরু। কমলাপুরে যখন খেলা চলছে বাইরে তখন রীতিমতো মিছিল এর বিরুদ্ধে। মেয়েরা ফুটবল খেলবে—এটাই তখন কেউ মানতে পারছিলেন না। স্টেডিয়ামে আসা-যাওয়ার পথে রীতিমতো আতঙ্কে থাকতে হতো তাদের। খেলা দিয়েই তারা সেই প্রতিবন্ধকতা দূর করেছে। এখন সারা দেশের মানুষের কাছে শুধু বাহবা নয়, সানজিদা-কৃষ্ণাদের অনুপ্রেরণাও মানছেন কেউ কেউ। ছেলেদের ফুটবলের বর্তমান ভরাডুবিতে মেয়েদের খেলা, মাঠে তাদের আচরণ, মনোভাব, সাহসিকতা তো অনুকরণীয়ও।

২০১০-এ ঢাকায় যখন এসএ গেমস হলো তখনো সবচেয়ে উজ্জ্বল পারফর্মার ছিলেন মেয়েরা। জঅপ্র, আর শারমিন রত্নার পারফরম্যান্স ছিল সবচেয়ে বেশি আলোচনায়। এই দুজনই দুটি করে সোনা জিতেছিলেন, গলফে, এক দুলাল হোসেন ছাড়া ছেলেদের মধ্যে আর কেউই সেই কীর্তি দেখাতে পারেননি। পুরো আসরে ১৮টি সোনার ৮টিই জিতেছিলেন মেয়েরা। সত্যিকার অর্থে ক্রীড়াঙ্গনে মেয়েদের জাগরণ সে আসর থেকেই। যেখানে ছেলেদের সঙ্গে সাফল্য পেতে সমান তালে লড়েছে তারা। এবারের আসরে ঠিক তারা এগিয়ে গেল। বলা যায়, গুয়াহাটি-শিলংয়ের আসরে মেয়েরা নিজেদের মেলে না ধরলে অনেক বড় লজ্জা নিয়ে ফিরতে হয় বাংলাদেশকে। ফুটবল মাঠেও সেই একই ছবি, ছেলেরা যখন নিজেদের হারিয়ে ফিরে পেতে লড়ছে, মেয়েদের পারফরম্যান্সই তখন নতুন পথের আশা দেখাচ্ছে। অনূর্ধ্ব-১৬ বাছাইয়ের গত আসরেই ইরান ও ভারতের কাছে লড়াই করে হেরেছিল মেয়েরা। এবারের আসরে ঠিক তাদেরই হারিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব এখন সানজিদা-কৃষ্ণাদের। ছেলেরা তাদের এমন ধারাবাহিক সাফল্যে অনুপ্রাণিত হোক বা না হোক, মেয়েদের দাবিটা কিন্তু বেড়ে গেছে। অনূর্ধ্ব-১৬ দলের অধিনায়ক কৃষ্ণা যেমন বলেই ফেলেছে, ‘এখন আমরা অন্তত চাই, আমাদের প্রতি যেন ছেলেদের সমান মনোযোগই দেয়া হয়। তাদের সমান সুযোগ-সুবিধা কখনোই আমরা পাই না। আমরা চাই এখন আমাদেরও যেন এক সমান চোখে দেখা হয়। ’ জেগে ওঠার আর্তি এখন তাই হয়তো মেয়েদের জন্য নয় বরং মেয়েদের সাফল্য, সম্ভাবনাকে দিনের পর দিন যারা উপেক্ষা করে যাচ্ছে, তাদের জন্যই হতে পারে। ক্রীড়াঙ্গনের এই সময়ের মেয়েরা নিজেদের যেভাবে প্রমাণ করেছে, যেভাবে তাদের নিয়ে উচ্ছ্বাস এখন দেশের সব জায়গায়, সব স্তরে—সেই সাফল্য অনুপ্রেরণা হতে পারে আসলে পিছিয়ে পড়া সবার জন্যই।


মন্তব্য