kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আনন্দলোকে দেশের মহিলা ফুটবল

সনৎ বাবলা   

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আনন্দলোকে দেশের মহিলা ফুটবল

ছবি : মীর ফরিদ

কী অবিশ্বাস্য কীর্তি! ফুটবল ফেডারেশন অনেক আয়োজন করে, বিদেশি কোচ-ট্রেনার দিয়ে ছেলেদের কাছ থেকে বিনিময়ে পেয়েছে শুধুই বিষাদ। কিন্তু মেয়েদের কিছু না দিয়েই পেয়েছে অনেক।

গতকাল শক্তিশালী চাইনিজ তাইপেকে ৪-২ গোলে হারিয়ে বাংলাদেশ এক ম্যাচ হাতে রেখেই উঠে গেছে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের চূড়ান্ত পর্বে।

চার-পাঁচ বছর আগেও মহিলা ফুটবলের এমন রূপান্তর কল্পনা করা যায়নি। তখনো খেলায় কোনো সৌন্দর্য নেই, একটি বলের পেছনে ২২ জন একসঙ্গে ছোটে। ‘মহিলা ফুটবলের এমন অবস্থা আমি দেখেছি, এখানে তো আমার আসার কথাই ছিল না। তা ছাড়া স্বভাবগতভাবে মহিলাদের থেকে দূরে থাকতাম...। আমি দায়িত্ব নিয়ে ঘোষণা দিলাম, ফুটবল খেলতে হবে দৌড়ে এবং পরিকল্পিতভাবে’—কোচ গোলাম রব্বানী ছোটনের হাতেই সূচিত হয়েছে মহিলা ফুটবল বিপ্লব। গতকাল এই বিপ্লবের চূড়ান্ত সাফল্য দেখে অভিনন্দন জানিয়েছে বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে উপস্থিত প্রায় সাত-আট হাজার দর্শক। চাইনিজ তাইপে নিয়ে উদ্ভূত ভয়-ডর উড়িয়ে দিয়ে বাংলার কিশোরীরা প্রথমবারের মতো এএফসির যেকোনো টুর্নামেন্টের চূড়ান্ত পর্বে নিয়ে গেছে দেশকে।

‘সি’ গ্রুপের খেলা শুরুর আগে এত বড় স্বপ্নের কথা কখনো তারা মুখ ফুটে বলেনি। বাংলাদেশ কোচ শুধু কথা দিয়েছিলেন ইরান-চাইনিজ তাইপের সঙ্গে তারা সাধ্যমতো লড়াই করবে। লড়াই শেষে কাল গোলাম রব্বানী ছোটন মাথা উঁচিয়ে সদম্ভে নিজেদেরই সেরা ঘোষণা করেছেন, ‘টুর্নামেন্ট শুরুর আগে আমরা ছিলাম ইরান-তাইপের পরে। কিন্তু খেলা শেষে আমরাই সবার ওপরে। এ জন্য আমার মেয়েদের স্যালুট জানাই আমি। তাদের পরিশ্রমই দেশের ফুটবলকে এ জায়গায় তুলে নিয়েছে। ’ গ্রুপের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে কাল শুরুতে পিছিয়ে পড়েও এক মুহূর্তের জন্য মনোযোগ হারায়নি খেলা থেকে। বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক কৃষ্ণার দাবি, ‘এ রকম কিছু ঘটতে পারে, এ জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম। নিজেরা একে অন্যকে উৎসাহ দিয়ে গেছি, ভালো খেলে ম্যাচ ঘোরাতে পারার সামর্থ্য আমাদের আছে। ’ হয়েছেও তা-ই, ম্যাচ ঘুরিয়ে দিয়ে দেশের মহিলা ফুটবলকে নিয়ে গেছে আনন্দলোকে।

১১ মিনিটে গোল হজম করে বাংলাদেশ এমনভাবে চেপে ধরেছে, সেই চাপে শেষ পর্যন্ত হাঁসফাঁস করেই পর পর দুটি পেনাল্টির বিপদ ডেকে আনে চাইনিজ তাইপে। তা নিয়ে চাইনিজ তাইপে কোচ রেফারির সমালোচনা করলেও ফুটবল আইনে দুটিই ছিল পরিষ্কার পেনাল্টি। ঠাণ্ডা মাথায় বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে নেওয়া শামসুন্নাহারের দুর্দান্ত দুটি পেনাল্টি কিকে বাংলাদেশ এগিয়ে যায় ২-১ গোলে। এর মধ্যে তাইপের একজন লাল কার্ড খেয়ে মাঠ ছাড়লেও লড়াইটা অসম হয়ে পড়ে। বেড়ে যায় স্বাগিতকদের আক্রমণের ধার এবং আরো দুটি গোল বের করে চাইনিজ তাইপেকে এলেবেলে দল বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে। সুবাদে আরব আমিরাতের সঙ্গে শেষ ম্যাচ হাতে রেখেই তারা পৌঁছে গেছে এএফসি অনূর্ধ্ব-১৬ মহিলা ফুটবলের মূল পর্বে। চীনে আগামী সেপ্টেম্বরে হবে মূল পর্বের খেলা।

বাছাই পর্বে ঢাকায় যেমন সব দলকে তুড়ি মেরে উড়িয়েছে, চূড়ান্ত পর্বে হয়তো বাংলাদেশের সে রকম পারফরম্যান্স হবে না। কিন্তু দেশের মহিলা ফুটবলের বিপ্লবের সুফল পাওয়া শুরু করেছে দেশ। এ জন্য কোচ বাফুফে মহিলা কমিটির কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে, ‘বিশেষ করে মহিলা কমিটির প্রধান কিরণ আপার (মাহফুজা আক্তার) ভাবনা এবং পরিশ্রম আছে উত্থানের পেছনে। সর্বোপরি আজকের এই সাফল্যকে মহিলা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম বাচ্চু ভাইকে উৎসর্গ করলাম আমরা। ’ কারণ অনেক প্রতিকূলতা মাড়িয়ে দেশের ফুটবল শুরু হয়েছিল তাঁর হাত ধরে। কিন্তু প্রয়াত এই সংগঠক দেখে যেতে পারেননি আজকের সুদিন।

এমন দিনে ম্যাচের সেরা পারফরমার কৃষ্ণা যেন ম্যাচ শেষেও স্বপ্নের ঘোরে আছে। কিভাবে এই সাফল্যের প্রতিক্রিয়া জানাবে সেটাও ভেবে পায় না এই কিশোরী, ‘এমন একটা পর্যায়ে চলে গেছে আমাদের ফুটবল, ভাবতে অবাক লাগে। আমরা প্রতিদিন শপথ নিয়ে খেলা শুরু করতাম, দেশের মহিলা ফুটবলকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব। ’ শেষ পর্যন্ত কৃষ্ণা-মার্জিয়ারা শপথ রক্ষা করেছে। আনন্দলোকে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণ করেছে।


মন্তব্য