kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


লজ্জা, লজ্জা আর লজ্জা

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



লজ্জা, লজ্জা আর লজ্জা

ক্রীড়া প্রতিবেদক : ভুটান ফুটবল দল ঢাকায় পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে ফুটবলাঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন শঙ্কা। এবার না ভুটানের কাছেও নাস্তানাবুদ হয় বাংলাদেশ।

পরশু রাতে মালদ্বীপের কাছে ৫-০ গোলে হেরে মহা বিপর্যয় ঘটিয়ে রায়হান-নাসির উদ্দিনরা জন্ম দিয়েছেন নতুন ফুটবল-কলঙ্ক। গত তিন বছরে দেশের ফুটবলের অবনমনের ধারায় পরশু জাত-পাত সব খুইয়েছে মালদ্বীপের সামনে। এই দেখার পর তাদের নিয়ে কেউ আর সাহস করছে না। যেন সব মনের সন্দেহ ঘুচে গেছে, এই দল আরো নিচে নামতে পারে, ভুটানের বিপক্ষেও প্রথম হারের অপকর্ম ঘটাতে পারে!

ফুটবলের সব শঙ্কাই যেকোনো দিন যেন কঠিন বাস্তব হয়ে সামনে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। চীনে বসে মালদ্বীপের কাছে ৫-০ গোলে হারের খবরটা শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন ইমতিয়াজ সুলতান জনি। আশির দশকে ফুটবলের ভরা যৌবনের অন্যতম নায়কের কাছে এ বড় লজ্জার দিন, ‘এমন খবর শোনার জন্য আসলে প্রস্তুত ছিলাম না। এটা কতটা যন্ত্রণার বলে বোঝাতে পারব না। একসময় যাদের গুনে গুনে গোল দিতাম আমরা, এখন তাদেরই কাছে হারছে ৫-০ গোলে। লজ্জা লজ্জা আর লজ্জা। ’ ’৮৫ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সাফ গেমসে মালদ্বীপকে সর্বোচ্চ ৮-০ গোলে হারিয়েছিল বাংলাদেশ। এখন মেয়েরা যেমন কিরগিজস্তান-সিঙ্গাপুরকে নিয়ে মাঠে চোর-পুলিশ খেলে, গোল উৎসব করে সেরকমই এক প্রতিপক্ষ ছিল মালদ্বীপ। সেই দিন যাদের স্মৃতিপটে তরতাজা তাঁদের জন্য ৫-০ গোলে হারের খবর হাতুড়ি-পেটার মতোই প্রত্যাঘাত।

ঝাঁকুনি খেয়েছেন জর্জ কোটানও। ২০০৩ সালে ঢাকায় সাফ জেতানো বাংলাদেশ দলের সাবেক এই অস্ট্রিয়ান কোচ দেশের ফুটবলের অগ্রগতির কোনো চিহ্ন দেখছেন না, ‘১২ বছর আগে দলটিকে যেখানে রেখে গিয়েছিলাম তার চেয়ে এক বিন্দুও এগোয়নি। অন্যরা এগিয়েছে, তাদের ফুটবলের সংস্কার হয়েছে। বাংলাদেশের কিছুই হয়নি, পার্থক্যটা তাই বড় হয়ে ধরা পড়ছে এখন। ’ এই কোচের অধীনে বাংলাদেশ ঢাকায় দু-দুবার মালদ্বীপকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো জেতে সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপ শিরোপা। ’৯০-এর দশক থেকে গুটি গুটি পায়ে মালদ্বীপ এগোতে শুরু করে এবং ’৯৯-তে কাঠমাণ্ডু সাফে তাদের কাছে প্রথম হারে বাংলাদেশ। অর্থাৎ ক্রমোন্নয়নের ধারায় মাত্র এক দশকের ব্যবধানে তারা উন্নীত হয়েছে স্থাণু হয়ে থাকা বাংলাদেশের ফুটবল মানে। ২০০৩ সালের সাফে হারের আগ পর্যন্ত তারা লড়াই করেছে। সেই সাফজয়ী দলের সদস্য আলফাজ আহমেদ খুব গর্ব করেই বলেছেন, ‘এই মালদ্বীপকে দুবার হারিয়ে আমরা টুর্নামেন্ট জিতেছিলাম। আর আমাদের এখনকার দল শুধুই হারে তাদের কাছে। এত বড় হারের পর আমাদের দলের খেলোয়াড়দের লজ্জা হবে কি না কে জানে, তবে বাইরে চলতে-ফিরতে আমরা লজ্জায় পড়ব। ’ সত্যি বললে, নির্লজ্জ এক ফুটবল প্রজন্মের হাতে পড়ে দেশের ফুটবলের দফারফা হয়ে যাচ্ছে। দু-একটা ব্যতিক্রম বাদ দিলে গত তিন বছর ধরে কেবল হারছে আর হারছে। কিন্তু লাজ-শরমের বালাই নেই, মালদ্বীপ রওনার দিনে একেকজন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘সেলফি-কুলফি’ দিয়ে বিশাল ম্যাচ খেলতে যাওয়ার খবর দিয়ে গেছেন জাতিকে। তারপর গোলের বন্যায় দিশেহারা হয়ে জাতিও এই যোগাযোগ মাধ্যমে তুলাধোনো করেছে ফুটবলারদের। আলফাজ আহমেদও এই খেলোয়াড়দের নিয়ে কোনো আশা দেখেন না, ‘এটা পরিষ্কার হয়ে গেছে এই ফুটবলারদের মান এতটুকু। এর চেয়ে বেশি চাইতে গেলে এরা দিতে পারবে না। শুধু এই ম্যাচের কারণে গত কয়েক বছরের ফলাফল সামনে আনলেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যায়। নতুন ফুটবলার তৈরিতে মনোযোগ দিতে হবে বাফুফেকে, নইলে আরো দুঃসময় অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। ’

এই দলের দায়িত্ব নিয়ে টম সেইন্টফিটও খেয়েছেন বড় এক ধাক্কা। বাংলাদেশের কোচ হয়ে অভিষেক এত বাজে হবে কল্পনাও করেননি, ‘২০ বছরের কোচিং ক্যারিয়ারে আমি কখনো ৫-০ গোলে হারিনি কোনো দলের কাছে। আমার ক্যারিয়ারের খুব বাজে দিন গেছে। ’ ম্যাচ শেষের সংবাদ সম্মেলনে এই বেলজিয়ান কোচ ম্যাচের বর্ণনায় গিয়ে বলেছেন, ‘প্রথমার্ধ ভালোই ছিল। ৫৫ মিনিটে প্রথম গোল খাওয়ার পর আমার তরুণ ফুটবলাররা ঘাবড়ে গেছে, এর পরই...। ’ গোল খাওয়ার পর কোচ অ্যাটাকিং ফুটবল খেলাতে গিয়ে আলী আশফাকের ফাঁদে পা দিয়েছেন। ৩২ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ডের পাসেই ছত্রখান হয়ে গেছে বাংলাদেশ ডিফেন্স। আসাদুল্লাহ আবদুল্লাহ হ্যাটট্রিক করলেও গোলের কারিগর ওই আশফাক। নাসির উদ্দিন চৌধুরী-রায়হান-ওয়ালী ফয়সালরা আসলে বুঝতে পারেননি মালদ্বীপ ফরোয়ার্ড লাইনের খেলা। অনূর্ধ্ব-১৬ টুর্নামেন্টে প্রতিপক্ষ যেমন বাংলাদেশের মেয়েদের পেছনে বলের জন্য ঘুরছে, তেমনি এই ম্যাচে আশফাকদের পেছন পেছন ঘুরেছেন রায়হান-ওয়ালীরা। তাঁরা সেই আশির দশকের মালদ্বীপ বানিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশকে! এই দেখে ভুটানি কোচ পেমাও ভীষণ উৎসাহিত, ‘বাংলাদেশের বড় হারে আমার দল উজ্জীবিত হবে। তাদের মাঠেই আমরা আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামব আশা করি। ’ ফুটবল রেকর্ডে এ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিপক্ষে কোনো ম্যাচ জিততে না পারলেও ভুটান এখন সত্যি সত্যি ‘বাংলা জয়ের’ স্বপ্ন দেখছে।


মন্তব্য