kalerkantho


ইংলিশ ফুটবলের বলি হয়েছি আমি

শাহজাহান কবির   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



ইংলিশ ফুটবলের বলি হয়েছি আমি

স্বাধীনতা কাপের প্রস্তুতি চলছে আবাহনীর। নতুন মৌসুমের জন্য আসা বিদেশি ফুটবলারদের ট্রায়াল হচ্ছে একই সঙ্গে। ধানমণ্ডির মাঠটিতে আকাশি-নীল জার্সির ভিড়ে রোহান রিকেটসকে আলাদা করা যাবে না। স্থানীয় ফুটবলারদের মতোই গড়পড়তা উচ্চতা। আফ্রিকানদের গায়ের রং, সেরকমই চুল। বল পায়ে এলেই শুধু অন্যদের চেয়ে একটু ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করছেন, এই যা। রোহানকে এভাবেও চেনা যাবে না। এটা যদি একটা সিনেমা হতো, ফ্ল্যাশব্যাকের এক শটে ১২ বছর পিছিয়ে পরিচালক এমন কিছু দেখাতে পারতেন, যা দেখে দর্শকদের তাক লেগে যেত।

সেই দৃশ্যেও রোহান বল পায়ে ছুটছেন, তবে আবাহনীর এবড়োথেবড়ো মাঠ নয়, সবুজ কার্পেট বিছানো সুবিশাল স্টেডিয়ামে। যেনতেন কোনো স্টেডিয়ামও নয়, ওল্ড ট্র্যাফোর্ড। একসঙ্গে ৬৮ হাজার দর্শকের গর্জন হচ্ছে। তা উপেক্ষা করেই রোহান ছুটছেন, টটেনহাম হটস্পারের জার্সি গায়ে। একই দলে তখন রবি কিন, ফেডরিক কানুটের মতো তারকারা। প্রতিপক্ষে পল স্কোলস, রায়ান গিগস, রিও ফার্ডিনান্ড, ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো। তখনকার দিনে রোহানকে দূর থেকে রবিনহো বলেও ভ্রম হতো। শরীরের একই গড়ন, তেমনই গতি আর খেলার ধরন। যে ধরনের কারণে ইংলিশ ফুটবলে ঠিক মানিয়ে উঠতে পারেননি ব্রাজিলীয় তারকা। রোহান নিজে ইংলিশ হয়েও সেই ইংলিশ ফুটবলের বলি। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের বিপক্ষে ২০০৫ সালের জানুয়ারিতে সেটিই তাঁর শেষ ম্যাচ। এরপর টটেনহাম তাঁকে ধারে পাঠিয়ে দেয় উলভারহ্যাম্পটনে।

আবাহনীর মাঠে অনুশীলন শেষে সেই দিনগুলোর কথা মনে করতে গিয়ে রোহান এখনো বেশ স্বাভাবিক। এরপর তো কম দেখা হয়নি তাঁর ফুটবল-দুনিয়া, ‘অতীত নিয়ে আর ভাবি না। এই যে দেশে দেশে খেলে বেড়াচ্ছি, এটাই এখন বেশ অ্যাডভেঞ্চারের মতো লাগে। ’ তাই বলে কোথায় প্রিমিয়ার লিগের সেই ঝাঁ-চকচকে জীবন আর কোথায় বাংলাদেশ! রোহান নিজেও হাসেন, ‘তখন টাইম মেশিনে চড়ে কেউ যদি এসে আমাকে বলত, আগামী দশ বছরে আমার জীবনে এই এই হবে,—হাঙ্গেরি, জার্মানি, মলডোভা, কানাডা, ইকুয়েডর হয়ে এই থাইল্যান্ড, ভারত আর বাংলাদেশেও খেলতে হবে...তাহলে তো ওকে স্রেফ পাগল মনে করতাম। কিন্তু এখন এটাই জীবন। ’ জীবনটা যে অন্য রকম হতে পারত, এটা এখন ভাবেনই না, ‘মেসিও যদি ইংল্যান্ডে জন্মাত আর ওই ছোট বয়সে কোনো ক্লাবে ট্রায়ালে আসত, ওকে কেউ নিতই না। বলত, এত ছোট ওকে দিয়ে হবে না। এটাই ইংলিশদের মানসিকতা। সেই মেসিকে আর কিন্তু পাওয়াই যেত না। ইংলিশ ফুটবলে স্কিল, সৃষ্টিশীলতা—এসব খুব পরের ব্যাপার। আপনাকে আগে শক্তিশালী হতে হবে, স্পিডি হতে হবে—এটাই ওরা বোঝে। আমার মতো অনেকেই তাই ঝরে যায়। ’ লন্ডনের ক্ল্যাপহামে জন্মালেও রোহানের মা-বাবা জ্যামাইকান, লাতিন ঘরানাটা তাঁর পায়ে তাই ভালোভাবেই আছে। টটেনহামে শুরুর দিকে গ্লেন হডলের মতো একজন কোচ ছিলেন, যিনি সেই কাজকে মূল্য দিতেন। হডল যত দিন ছিলেন শুরুর একাদশে রোহানের খেলা নিয়ে সমস্যা হয়নি। হডল চলে যেতেই বিপত্তি। চ্যাম্পিয়নশিপের দল কভেন্ট্রি সিটিতে চলে যেতে হয় তাঁকে, সেখান থেকে উলভারহ্যাম্পটনে, হডলও তখন উলভসে। কিন্তু উলভস থেকেও বরখাস্ত হন হডল, রোহান এরপর কিউপিআর আর বার্নসলিতে দুই বছর দেখে-টেখে একেবারে পাড়ি জমান কানাডায়। প্রিমিয়ার লিগের খেলোয়াড় হিসেবে টরেন্টো এফসিতে তারকাখ্যাতিই পেয়েছিলেন রোহান। কিন্তু দুই বছর পর ক্লাবের মালিকানা বদলে গেলে রোহানও দল ছাড়েন। ইংল্যান্ডে ফিরতে তখন মুখিয়ে ছিলেন। হাঙ্গেরি, মলডোভা, জার্মানিতে কয়েক বছর খেলে প্রিমিয়ার লিগে চেষ্টা করেও পারেননি। একপর্যায়ে আয়ারল্যান্ড চলে যান, খেলেন শামরক রোভার্সে, সেখান থেকে লিগ ওয়ানের দল এক্সেটার সিটি। ২০১৩ সালে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছুর স্বাদ নিতে ভারতে তাঁর পাড়ি জমানো, গোয়ার ড্যাম্পো এফসিতে। কিন্তু যাযাবর জীবন আর থিতু হয়নি, থাইল্যান্ড হংকং হয়ে এখন তিনি আবাহনীর জার্সিতে।

ইংলিশ ফুটবলে আর্সেনাল ছন্দময় ফুটবলের কারণে আর সবার থেকে আলাদা। রোহানের বেড়ে ওঠা সেই আর্সেনালের যুব দলে। টাচ ফুটবল আর সৃষ্টিশীলতা নিয়ে আর্সেন ওয়েঙ্গারের দলে ঠাঁই না হওয়াটা তাঁর দুর্ভাগ্যই। কিন্তু রোহান বলেন এমনটা হওয়ারই ছিল, ‘আর্সেনাল তখন প্রায় সর্বজয়ী দল। লিগে একটাও ম্যাচ হারেনি, ভাবা যায়! আর তখন কারা খেলেন— প্যাটট্রিক ভিয়েরা, থিয়েরি অঁরি, বার্গক্যাম্প। নতুন কারো সুযোগ পাওয়াটা তখন খুবই কঠিন। লিগ কাপে দুটি ম্যাচে শুধু খেলেছিলাম। ’ রোহান মাত্র চতুর্থ ফুটবলার যে গানারদের হয়ে খেলেও উত্তর লন্ডনের আরেক ক্লাব টটেনহামে যখন যোগ দেন তখন তাঁর ১৯ বছর। তারকা হওয়ার সুবর্ণ সময়টাই পড়ে ছিল, খেলতে পারতেন ইংল্যান্ড জাতীয় দলেও কিন্তু কোচ বদলে সবই ভেস্তে গেছে, ‘অনূর্ধ্ব-২০ দলে যখন খেলি তখনো গোরান এরিকসনের প্রশংসা পেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি দায়িত্ব ছাড়ার পর নতুন কোচ এসে আর আমাকে ডাকলেন না। ’ শেষ পর্যন্ত নিজের ভাগ্যটা নিজেই গড়ে নিয়েছেন। গত কয়েক বছরে তো প্রায় বিশ্ব পরিভ্রমণ করছেন তিনি। এখন পুরো ব্যাপারটাই দেখেন অভিজ্ঞতা হিসেবে। ফেরার ইচ্ছা তাঁর কোচ হয়ে।


মন্তব্য