kalerkantho


ফাইনালের পথে

দুর্দান্ত ইংল্যান্ড

সামীউর রহমান   

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দুর্দান্ত ইংল্যান্ড

আজ জিতলেই শিরোপার আরো কাছে। কাল সে লড়াইয়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত ইংল্যান্ড দলের ক্রিকেটাররা। ইংল্যান্ডের একমাত্র বৈশ্বিক আসর জয়ের নায়ক পল কলিংউডের কাছ থেকে কি সাফল্যের মন্ত্রই নিচ্ছেন এউইন মরগ্যান? ছবি : এএফপি

ক্রিকেটের জনক তারা; কিন্তু শুদ্ধতার প্রতীক টেস্ট কিংবা বৈশ্বিক ক্রিকেট শ্রেষ্ঠত্বের মঞ্চ ওয়ানডে বিশ্বকাপে কখনোই ওড়েনি তাদের পতাকা। শুদ্ধতার পতাকাধারী সেই ইংল্যান্ড আবার দারুণ সফল টি-টোয়েন্টিতেই। ২০১০ আসরের চ্যাম্পিয়নদের তাই এবারের আসরের সেমিফাইনালে ওঠা কোনো চমক নয়। ফাইনালে ওঠার পথে বাধা যখন নিউজিল্যান্ড, তখন ইংলিশদেরও বাদ দেওয়া যাচ্ছে না সম্ভাবনার খাতা থেকে।

একবার চ্যাম্পিয়ন এবং বছর ছয়েকের মাথায় আরো একবার সেমিফাইনালে। ক্রিকেটের উদ্ভাবন, বিকাশ, উন্নত পেশাদারি কাঠামো, ঐতিহ্য এমন অনেক উপাদান নিয়েও শুরুর দিকের সময়টা বাদ দিলে টেস্ট ক্রিকেটেও ইংল্যান্ড ঠিক পরাশক্তি হয়ে ওঠেনি। সাধের অ্যাশেজেও গোড়ার দিকের সময়টা বাদে ইংরেজদের একচ্ছত্র আধিপত্য ছিল না কখনোই। সব শেষ পাঁচটি অ্যাশেজের চারটিতেই ইংরেজরা জয়ী হলেও সার্বিক সাফল্যের মানদণ্ডে অস্ট্রেলিয়াই টেস্ট র্যাংকিংয়ের ১ নম্বর দল, যেখানে ইংল্যান্ডের অবস্থান চতুর্থ। ওয়ানডে ক্রিকেটেও বিশ্বকাপ বা চ্যাম্পিয়নস ট্রফি, কোনোটারই শিরোপা লর্ডসে ইসিবির কার্যালয়ে আসেনি। প্রথম পাঁচ আসরে তিনবার রানার্সআপ ও দুইবার সেমিফাইনাল খেলার পরের ইতিহাস ব্যর্থতার। পরবর্তী আসরগুলোয় কখনো কোয়ার্টার ফাইনালের গণ্ডিই পেরোতে পারেনি ‘থ্রি লায়নস’, সঙ্গে জুটেছে বারদুয়েক বাংলাদেশের কাছে হারের সঙ্গে বিশ্বকাপে আইরিশদের কাছে হারের লজ্জাও। ওয়ানডের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ আসর বলা যেতে পারে আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিকে, বিশ্বকাপের বাইরে এ আসরেই তো খেলে শীর্ষ সবগুলো দল। কখনোই বিশ্বকাপ না জেতা নিউজিল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকা তবু ‘মিনি বিশ্বকাপ’ জিতে দুধের স্বাদ ঘোলে মিটিয়েছে, ইংল্যান্ডের সেই ভাগ্যও যে হয়নি! ২০০৪ সালে নিজের দেশে ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছে হেরে রানার্সআপ, বছর তিনেক আগেও স্বাগতিক হয়ে একই ভাগ্য। অন্য দুই ফরম্যাটের তুলনায় টি-টোয়েন্টিতেই ভাগ্য সুপ্রসন্ন ইংল্যান্ডের। নিজেদেরই এক বিপণন ব্যবস্থাপকের উদ্ভাবন করা সংক্ষিপ্ত ক্রিকেটই যে ঘুচিয়েছে বিশ্বমঞ্চে তাদের সাফল্য-খরা।

সিক্স-এ-সাইড, ডাবল উইকেট, ম্যাক্স ক্রিকেট—এমন অনেক সংক্ষিপ্ত সংস্করণের ক্রিকেটের প্রচলনের চেষ্টা হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। কোনোটাই ঠিক ‘আন্তর্জাতিক’ হয়ে ওঠেনি, অথচ পরে এসেও জনপ্রিয় হয়ে গেল ২০ ওভারের ক্রিকেট। সেই টি-টোয়েন্টিরই তৃতীয় বিশ্ব আসরে ইংল্যান্ডের শিরোপা জয়। এবারের আসরে কিছুদিন আগেই দক্ষিণ আফ্রিকার ২২৯ রান তাড়া করে রেকর্ড গড়ে জিতেছে ইংল্যান্ড। ওয়েস্ট ইন্ডিজের সঙ্গে তার আগের ম্যাচটায়ও আগে ব্যাট করে ১৮২ রান তুলেছিল এউইন মরগানের দল, যদিও তারা ম্যাচটা হেরে যায় সেঞ্চুরিয়ান ক্রিস গেইলের ব্যাটিং তাণ্ডবে। সুপার টেনে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন শ্রীলঙ্কার সঙ্গে ম্যাচটা জিতেছে তারা, আফগানদের চোখ রাঙানিকেও অঘটনে রূপ নিতে দেয়নি। চার ম্যাচের তিনটিতে জিতেই তারা, পা রেখেছে শেষ চারে।

গত বছর বিশ্বকাপে বাংলাদেশের কাছে হার এবং কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে না পারার পর ব্যাপক রদবদল আসে ইসিবির সীমিত ওভারের ক্রিকেট ভাবনায়, যার প্রভাব পড়ে দল নির্বাচন ও সাপোর্ট স্টাফ নিয়োগেও। বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে ইংল্যান্ড খেলতে এসেছে অ্যালেক্স হেলস, জেসন রয়, স্যাম বিলিংসদের মতো তরুণ ক্রিকেটাদের নিয়ে। সিডনি সিক্সারস ও কলকাতা নাইট রাইডার্সকে কোচিং করানো ট্রেভল বেলিসকে মে মাসে নিয়োগ দেয় ইংল্যান্ড, সঙ্গে সীমিত ওভারের ক্রিকেটের পরামর্শক হিসেবে যোগ দেন পল কলিংউড। এ অলরাউন্ডারের নেতৃত্বেই ২০১০ সালের বিশ্ব টি-টোয়েন্টির ফাইনালে অস্ট্রেলিয়াকে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল ইংল্যান্ড। দুজনের সমন্বয়েই টি-টোয়েন্টিতে গতানুগতিক ভাবনার বাইরের রাস্তায় হাঁটা শুরু ইংল্যান্ডের, সাফল্য সেই সূত্রেই। অধিনায়ক মরগানের কথাতেই স্পষ্ট, আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলার মন্ত্রেই তাঁদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে, ‘আমরা চেষ্টা করছি যতটা সম্ভব আক্রমণাত্মক একটা দল হয়ে উঠতে। আমরা বিশ্বকাপের ফল দেখেছি এবং সেখান থেকে পাওয়া শিক্ষাটা হচ্ছে আমরা পেছনে পড়ে ছিলাম। এখন বড় বৈশ্বিক আসর জিততে হলে যে ঘরানার ক্রিকেটটা খেলতে হয়, আমরা সেটাই করার চেষ্টা করছি। ’ কথাগুলো মরগান শুনিয়েছিলেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলার ফাঁকে। সেই সিরিজটা ইংল্যান্ড জিতেছিল ৩-০ ব্যবধানে। গত বছর অস্ট্রেলিয়াকেও তারা হারায় ৫ রানে, সব মিলিয়ে ২০১৫ সালে চারটি টি-টোয়েন্টি খেলে সবগুলোতে জয়ে শতভাগ সাফল্য। তাই বিশ্ব টি-টোয়েন্টির আগে কেউ কেউ ডার্ক হর্স হিসেবে ইংলিশদের নামও বলছিলেন, তবে খেলাটা উপমহাদেশের মাটিতে বলেই তত্ত্বটা কলকে পায়নি।

ভারতের মাটিতে খেলা, পিচে স্পিনের জুজু আর উষ্ণ আবহাওয়াও তাই প্রতিপক্ষ। সব কিছু বিপক্ষে থাকার পরও টি-টোয়েন্টির মতো অনিশ্চিয়তায় ভরা ক্রিকেটেও ইংল্যান্ডের প্রায় হেসেখেলেই সেমিফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার সাফল্যের পর ব্রিটিশ মিডিয়ার প্রশংসাকেও তাই অত্যুক্তি মনে হয় না!


মন্তব্য