kalerkantho


অপ্রতিরোধ্য নিউজিল্যান্ড

খালিদ রাজ   

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অপ্রতিরোধ্য নিউজিল্যান্ড

আজ জিতলেই শিরোপার আরো কাছে। কাল সে লড়াইয়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত নিউজিল্যান্ড দলের ক্রিকেটাররা। মার্টিন গাপটিল দুর্দান্ত ফর্মে রয়েছেন তো গ্রান্ট এলিয়টও আগের ম্যাচে নিয়েছেন ৩ উইকেট। : এএফপি

হঠাৎই যেন বাজ পড়ল। আকাশে মেঘের কোনো চিহ্নমাত্র নেই, মিষ্টি রোদে উপভোগ্য সময়। বয়স ৩৪ তো কী, অনেকেই এ বয়সে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ২২ গজ। তবু ঠিক ছিল যদি শুধু টেস্টকে বিদায় জানাতেন, তা নয় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকেই ‘বাই বাই’ বলে দিলেন ব্রেন্ডন ম্যাককালাম! ক্রিকেট বিশ্ব একটা বিষয় কিছুতেই বুঝতে পারছিল না, বিশ্ব টি-টোয়েন্টির ঠিক আগ মুহূর্তে এমন সিদ্ধান্ত কেন! অন্তত ২০ ওভারের বিশ্ব আসর খেলে অবসরে যেতে পারতেন ম্যাককালাম।

নিউজিল্যান্ডের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের প্রতীক ধরা হয় যাঁকে, সেই ম্যাককালামই যখন নেই, তখন আর কিউইরা কত দূরই বা যেতে পারবে! ভাবনাটা মোটেও অযৌক্তিক নয়। এর পরও ২০১৫ বিশ্বকাপে ঘরের মাঠে যেভাবে পারফর্ম করেছে নিউজিল্যান্ড, তাতে ক্রিকেট দুনিয়ায় এক রকম পুনর্জন্মই হয়েছে তাদের। বিশেষ করে পেস আর সুইংয়ের জাদুতে বাঘা বাঘা সব ব্যাটসম্যানকে বোকা বানিয়ে আউট করার দৃশ্যগুলো তাদের পক্ষে বাজি ধরাচ্ছিল অনেকে। টিম সাউদি আর ট্রেন্ট বোল্ট আছেন না!

কিন্তু এ কী, ভারতের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে দুজনের কেউই নেই একাদশে! তাহলে কি চোট সমস্যা? না, ফিট আছেন দুজনই। তাহলে? প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে সময় লাগল না। স্পিন বিষে ভারতকে তাদেরই মাটিতে মিশিয়ে দিয়ে মাত্র ৭৯ রানে অলআউট করে নিউজিল্যান্ড বুঝিয়ে দিল, পেস নয়, স্পিন শক্তি নিয়েই এসেছে তারা বিশ্ব টি-টোয়েন্টিতে।

ভারতের বিপক্ষে ৪৭ রানের জয় পাওয়ার পর অনেকের কাছে ‘অঘটন’ ছিল বিষয়টি। যে গ্রুপে ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়ার মতো দল আছে, তাদের টপকে কী আর নিউজিল্যান্ড যেতে পারবে সেমিফাইনালে। এখানেও যুক্তি ছিল। নিউজিল্যান্ড যদি স্পিন দিয়ে কাবু করতে পারে ভারতকে, তাহলে স্পিননির্ভর ভারত-পাকিস্তান পরের ম্যাচগুলোতে কী করবে। ছেড়ে কথা বলবে না তো অস্ট্রেলিয়াও। তা ছাড়া বাংলাদেশকেও বাদ দেওয়া যাচ্ছিল না এশিয়া কাপ টি-টোয়েন্টির ফাইনাল খেলে এসেছে বলে। উপমহাদেশের কন্ডিশনের বিষয়টি সামনে আনলে এশিয়ার যেহেতু তিনটি দল আছে এই পুলে, তার মানে লড়াইটা হবে তাদের মধ্যে। নিউজিল্যান্ডের সেখানে সুযোগ কোথায়!

সেই নিউজিল্যান্ডই পুল পর্বের সব ম্যাচ জিতে সবার আগে নিশ্চিত করে সেমিফাইনাল। এখন ইংল্যান্ডকে হারিয়ে বিশ্ব টি-টোয়েন্টির প্রথম ফাইনাল স্বাদ নেওয়ার অপেক্ষায়। কঠিন কাজ সম্ভব হয়েছে স্পিনারদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সে। নাগপুরে ভারতের জয়ের পথে নিউজিল্যান্ডের স্পিনাররা নিয়েছিলেন ৯ উইকেট। অধিনায়ক কেন উইলিয়ামসন শুরুতে বল তুলে দিয়েছিলেন নাথান ম্যাকাকালামের হাতে। এ স্পিনার ৩ ওভারে ১৫ রান দিয়ে নিয়েছিলেন ২ উইকেট। তবু সেরা বোলার তিনি নন, বাঁ হাতের স্পিন জাদুতে ৪ ওভারে ১১ রান দিয়ে ৪ উইকেট শিকার করে মিচেল স্যান্টনার প্রমাণ করেছিলেন একেবারে তৈরি হয়েই তিনি এসেছেন ভারতে। সেই সঙ্গে লেগস্পিনার ইশ সোধি ঘূর্ণি বলে নিয়েছিলেন ৩ উইকেট। নিজেদেরই তৈরি করা স্পিন ফাঁদে ভারত ফেঁসে যাওয়ার সঙ্গে কিউই স্পিনাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাসের বীজটা বাড়তে থাকে তরতরিয়ে।

নিউজিল্যান্ডের স্পিন শক্তি এমন আহামরি নয়। হ্যাঁ, ড্যানিয়েল ভেট্টরির মতো স্পিনার পেয়েছে কিউইরা; কিন্তু স্পিন তাদের প্রধান শক্তি ছিল না কোনো কালেই। দিন কয়েক আগে অন্য পারে চলে যাওয়া মার্টিন ক্রো ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে দীপক প্যাটেলের স্পিন দিয়ে ইনিংস শুরু করেছেন ঠিকই, তবে সেটা ছিল তাঁর ট্যাকটিকসের অংশ। কিন্তু এখনকার নিউজিল্যান্ডের বোলিং শক্তিই দাঁড়িয়ে স্পিনের ওপর। মূল পর্ব মানে ‘সুপার টেন’-এ উইকেট শিকারের তালিকায় বাংলাদেশের মুস্তাফিজুর রহমানের (৩ ম্যাচে ৯ উইকেট) সঙ্গে যৌথভাবে শীর্ষে আছেন মিচেল স্যান্টনার, ৪ ম্যাচে তাঁর উইকেট ৯টি। ১ উইকেট কম নিয়ে সোধি রয়েছেন তৃতীয় স্থানে।

স্পিন শক্তি কাজে লাগিয়ে কিউইরা এগিয়ে যাচ্ছে ঠিক আছে, তাই বলে তো এমন নয় যে কোনো পেসার নিয়ে খেলবে না তারা। অ্যাডাম মিলনে কিংবা মিশেল ম্যাকক্লেনাগনের মতো পেসারদের খেলাচ্ছে নিউজিল্যান্ড। সেখানে কিনা সাউদি-বোল্টের সুযোগ নেই! কিউইদের প্রথমবার বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার পথে যাঁদের অবদান ছিল সবচেয়ে বেশি, রিচার্ড হ্যাডলি পর্যন্ত যাঁদের নিউজিল্যান্ডের সর্বকালের সেরা ‘উদ্বোধনী বোলিং জুটি’র খেতাব দিয়েছেন, তাঁরাই কিনা দিনের পর দিন গরম করছেন বেঞ্চ! তবু ড্রেসিংরুমে নেই কোনো অন্তর্দ্বন্দ্ব। কারণ ওই একটাই, ২০১৫ বিশ্বকাপ চলার সময় ম্যাককালাম যেটা বলেছিলেন, ‘এখানে ব্যক্তির চেয়ে, দলটাই সবার আগে। ’ দলের স্বার্থের কথা ভেবে সেরা বোলিং জুটি হয়েও বেঞ্চে বসে থাকতে আপত্তি নেই ‘টিএনটি’র।

বাইরে থেকেও তাঁরা নাকি দলকে ঠিকই সাহায্য করে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। দাবিটা খোদ নিউজিল্যান্ড অধিনায়ক উইলিয়ামসনেরই, ‘ওরা বিশ্বমানের বোলার। ওরা কিন্তু সাইড লাইনে দারুণ অবদান রাখছে দলের জন্য। ’

ব্যক্তিস্বার্থ বিসর্জন দেওয়ার প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তিতেই গড়া এ নিউজিল্যান্ড। যাদের ভাঙাটা খুব কঠিন। ভারত, পাকিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, বাংলাদেশ—কেউই পারেনি। দেখা যাক ইংল্যান্ড কী করে!


মন্তব্য