kalerkantho

শনিবার । ২১ জানুয়ারি ২০১৭ । ৮ মাঘ ১৪২৩। ২২ রবিউস সানি ১৪৩৮।


সবার ওপরে মুস্তাফিজ

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সবার ওপরে মুস্তাফিজ

তাঁর গতিতে হয়তো তুফান ওঠে না চৌকো ২২ গজে। বাউন্সারে থাকে না সাপের ছোবল। সুইংয়ের ফোঁড়ে সেভাবে চিত্রিত হয় না ব্যাটসম্যানদের মরণছবি। কিন্তু ভয়ংকর এক মারণাস্ত্র তো ঠিকই রয়েছে তাঁর! কাটার। আর মুস্তাফিজুর রহমানের সেই ‘কাটার’-এ কচুকাটা কত রথী-মহারথী! কাল নিউজিল্যান্ডের ব্যাটসম্যানরা সেই তালিকায় সংযোজিত হন নতুন করে, এই যা!

এই মারণাস্ত্রের মারাত্মক প্রদর্শনীতে চলতি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের সেরা বোলিংয়ের রেকর্ডটি নিজের করে নেন মুস্তাফিজ। আর স্মৃতির অতল থেকে টেনে বের করে আনেন ইলিয়াস সানিকে। কুড়ি-বিশের এই ফরম্যাটে বাংলাদেশের সেরা বোলিংয়ের দখলটা যে ওই স্পিনারের কাছ থেকে একটুর জন্য নিজের করে নিতে পারেন না কাটার-বিস্ময়!

ইলিয়াসের সেই কীর্তি ২০১২ সালের জুলাইতে, আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বেলফাস্টে। নিজের অভিষেক টি-টোয়েন্টিতে তাঁর বোলিং ফিগার ৪-১-১৩-৫। তবে সেই মঞ্চে নিশ্চিতভাবে আলো ছিল না এতটা। ক্রিকেটকুলের কুলীন টেস্টভুবনের প্রবেশাধিকার না থাকা একটি দেশের বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় সিরিজের দ্বৈরথ আর অমন কী! বিশেষত তুলনা যদি হয় এবারের বিশ্বকাপ মঞ্চের সঙ্গে; প্রতিপক্ষ নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে। এই কিউইরা আবার আগের তিন খেলায় হারায় ভারত-অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তানকে। অমন প্রতিপক্ষের বিপক্ষে পাঁচ শিকার তো কম কথা নয়! উইকেটে দুজনই এক সমতায়, তবে ইলিয়াসের চেয়ে মুস্তাফিজ খানিক পিছিয়ে রান খানিকটা বেশি দেওয়ায়। কাল এই পেসারের উইকেট-পঞ্চক আসে ২২ রানের বিনিময়ে।

জাতীয় দলের পূর্বসুরিকে টপকাতে না পারলেও জেমস ফকনারকে ঠিকই দ্বিতীয়তে ঠেলে দেন মুস্তাফিজ। আগের দিন মোহালিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ২৭ রান দিয়ে ৫ উইকেট নিয়ে সবার ওপরে ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার এই বাঁহাতি পেসার। একই ঘরানার আরেক বোলারের কাছে ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে সিংহাসনটা হাতছাড়া করতে হয় তাঁকে।

এই ইডেন গার্ডেন্সেই দিন দশেক আগে মুস্তাফিজের খেলা-না খেলা নিয়ে কত দোলাচল! পাকিস্তানের বিপক্ষে সেই খেলায় তাঁকে খুব করে চায় টিম ম্যানেজমেন্টের একটি অংশ। বিশ্বকাপে ভালো শুরুর জন্য ব্রহ্মাস্ত্রকে খেলাতে মরিয়া তারা। কিন্তু কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহে সেই ঝুঁকি নিতে নারাজ। মুস্তাফিজ খেলেন না তাই। পাকিস্তানের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণে মূল পর্বের শুরুটা খুব বাজে হয় বাংলাদেশের। কিউইদের বিপক্ষে কালকের শেষটা তার চেয়েও ঢের বাজে। তবে সেজন্য তো আর মুস্তাফিজকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর উপায় নেই।

তাঁর তৈরি করে দেওয়া সাজানো বাগান যদি সতীর্থ ব্যাটসম্যানরা ওভাবে মাড়িয়ে আসেন—তাহলে আর কী করা!

বিশ্বকাপে প্রথম মাঠে নামেন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। এরপর ভারত। তারপর কালকের নিউজিল্যান্ড। প্রতি ম্যাচেই একই পারিপার্শ্বিকতার পুনরাবৃত্তি। মুস্তাফিজের বল হাতে নেওয়া মানেই সবার নড়েচড়ে বসা। যেন কিছু হতে চলেছে। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা কাল চতুর্থ ওভারে মুস্তাফিজকে বোলিংয়ে আনলে সেই একই প্রত্যাশার অস্ফুট অনুরণন ক্রিকেটের নন্দনকাননে। আর এর প্রতিদান কী দারুণভাবেই না দেন সাতক্ষীরার এই তরুণ!

কিউই ওপেনার হেনরি নিকলসকে খাবি খাওয়ান বার দুয়েক। সেই গতির হেরফের দিয়েই। এরপর শেষ বলে করেন বোল্ড। তাঁর কাটার অফস্টাম্পের বাইরে থেকে ঢুকে ফেলে দেয় বেলস। এক ওভারে ২ রান দিয়ে ১ উইকেট; তবু মুস্তাফিজের স্পেল বাড়াননি মাশরাফি। ফিরিয়ে আনেন নবম ওভারে। প্রথম বলে কলিন মুনরো আউট হতে হতে যান বেঁচে। ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগেও স্টাম্পে যায়নি তা। তৃতীয় বলে বেরিয়ে এসে কেন উইলিয়ামসন মারেন চার। মুস্তাফিজকে তাতিয়ে যেন অলক্ষ্যে ‘মৃত্যু’কেই ডাক দেন কিউই অধিনায়ক। এক বল পরই লেগ সাইডে জায়গা করে নিয়ে খেলতে চান। কিন্তু দ্রুতগতির কাটারে বিভ্রান্ত হয়ে উইলিয়ামসন দেখেন তাঁর বেলস মাটিতে লুটোপুটি খাচ্ছে উদ্ভ্রান্তের মতো।

মুস্তাফিজের দ্বিতীয় স্পেলও এক ওভারের। ১৮তম ওভারে আবার ডাক পড়ে তাঁর। এবার গ্রান্ট এলিয়ট ও রস টেলরকে বোকা বানানোর পালা। তাঁরা বুঝতে পারছেন, স্লোয়ার আসছে সর্পিল ভঙ্গিতে। কাটার আসছে মায়াবী ছলনা নিয়ে। কিন্তু তাতেও কি আর রক্ষে আছে! টেলর কোনোমতে টিকে গেলেও পারেন না এলিয়ট। তাঁর ব্যাটের কানায় লেগে উঠে যাওয়া বল মিড অফ থেকে দৌড়ে গিয়ে দুর্দান্ত ক্যাচে পরিণত করেন শুভাগত হোম। মুস্তাফিজের তিন ওভারে তিন উইকেট।

সেটি চতুর্থ ওভারে পাঁচ হয়ে যায় দ্রুতই। আরেক কাটারে বোল্ড মিচেল স্যান্টনার। পরের বলে নাথান ম্যাককালামও। হ্যাটট্রিকের মাহেন্দ্রক্ষণের সামনে এসে দাঁড়ান মুস্তাফিজ। কিন্তু তা আর হয় না। তাতেও কি এই পেসারের কীর্তির মহিমা কমে!

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক তাঁর পাকিস্তানের বিপক্ষে। তবে ওয়ানডে অভিষেকে প্রতিপক্ষ ভারত। গত বছরের সেই সিরিজের তিন ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে ক্রিকেটবিশ্বকে প্রবল ঝাঁকুনি দেন এই বোলিং-বিস্ময়। মুস্তাফিজ যে ভালো বোলার, তা তাই ভালো করেই জানত ভারত। কিন্তু কতটা ভালো, কাল তা চাক্ষুষ করল।

মুস্তাফিজের আইপিএল-পর্ব নিয়ে রোমাঞ্চটা যে তাতে বেড়ে গেল বহুগুণ—তা বলা যায় নির্দ্বিধায়!


মন্তব্য