kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ১৯ জানুয়ারি ২০১৭ । ৬ মাঘ ১৪২৩। ২০ রবিউস সানি ১৪৩৮।


আবেগই নতুন স্বপ্ন দেখায়

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আবেগই নতুন স্বপ্ন দেখায়

আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেননি। তবে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের পরই যে এই ফরম্যাট থেকে অবসর নেবেন, মাশরাফি বিন মর্তুজার সে সিদ্ধান্ত অনেক আগের। কাল ইডেন গার্ডেন্সের ভিনদেশি এক সাংবাদিক কয়েক ধাপ বেড়ে গিয়ে প্রশ্ন করে বসেন, নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারেরই শেষ কি না। উত্তরে বিরক্তিটা একদমই লুকান না মাশরাফি, ‘এটা নিয়ে বাসায় গিয়ে ভাবব। ’

আজ বাদে কাল দেশে ফিরে অবশ্য ভাবার মতো আরো অনেক কিছু রয়েছে মাশরাফির। বাংলাদেশ দলেরও। বিশেষত ভারতের বিপক্ষে প্রায় মুঠোবন্দি জয় যেভাবে ফসকে যায়, সে আক্ষেপ পোড়াবে অনেক দিন। আবেগের কাছে আত্মসমর্পণেই কি শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের পরিণতি—এই প্রশ্নও ভাবনার করিডরে ঘুরপাক খাবে নিশ্চিতভাবে।

কিন্তু বাংলাদেশ যে ক্রিকেটটা খেলে হৃদয় দিয়ে! ব্যাট-বলের দক্ষতার সঙ্গে ওই হৃদয়ের যোগসূত্র মাশরাফি অন্তত তাঁর অধিনায়কত্বের সময় করতে চেয়েছেন। পেরেছেনও। গত দেড় বছরের জয়-জোয়ারের অন্যতম অনুঘটক তা। ভারতের বিপক্ষে একটি ম্যাচে একটি মাত্র ভাটার টানেই কি শুকিয়ে যাবে সেই সাফল্য-সাগর! আবেগ এক পাশে সরিয়ে রেখে যান্ত্রিক ক্রিকেট খেলার যে অস্ট্রেলিয়া-দক্ষিণ আফ্রিকার ঘরানা, সেটি অনুসরণে কি আর সাফল্য পাবে বাংলাদেশ!

আর একজন রয়েছেন মহেন্দ্র সিং ধোনি। একজনই! উপমহাদেশের প্রথাগত ছাঁচে তাঁকে ফেলা যাবে না। আবেগের উথাল-পাথাল ঢেউয়ের মাঝেও থাকতে পারেন নিষ্কম্প। ভারতীয় অধিনায়কের সেই চারিত্রিক উপাদানকে হয়তো সমীহ করা যায়। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে তা শেখা কঠিন। এটি যে একেবারেই ধোনির সহজাত! বাংলাদেশ আগের ম্যাচে হেরে গেলেও ধোনির কাছ থেকে আবেগ সংযত রাখা শেখার রয়েছে কি না, এ নিয়ে তাই নিশ্চিত নন স্বয়ং মাশরাফি, ‘আবেগ তো একেক জনের একেক রকম। এটি কখনো কখনো সাহায্যও করে; আমাদের ক্ষেত্রে যেটি করেছে। তবে ধোনির মতো আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা উচিত কি না, তা বলা মুশকিল। এটি একেক ব্যক্তির একেক রকম হয়। জানি না তাই কী উত্তর দেব। ’

বাংলাদেশ অধিনায়কের কথাটি আবার পড়ুন। আবেগ তাঁর দলকে সাহায্য করে—সেটি স্পষ্ট করে দেন তিনি। তাহলে কেন তা সরিয়ে রেখে পেশাদারিত্বের খোলসে ঢুকে পড়তে হবে! বনের বাঘকে চিড়িয়াখানায় রেখে দিলে সেটি বেঁচে থাকে বটে। কিন্তু বনের বাঘ আর তো থাকে না! আবেগহীন বাংলাদেশও তেমনি আর ‘বাংলাদেশ’ থাকবে না।

শুধু মাশরাফি কিংবা তাঁর দল না, বাংলাদেশের ১৬ কোটি সমর্থকের কাছেই ক্রিকেটটা আবেগের সমার্থক। ক্রিকেট তাঁদের হাসায়; ক্রিকেট কাঁদায়। মাশরাফির কি আর সেটি অজানা! তাদের সমব্যথী হয়েই সামনে ভালো করার প্রতিশ্রুতি যেন অধিনায়কের, ‘সব বাংলাদেশির ক্রিকেট নিয়ে প্রচণ্ড আবেগ রয়েছে। ভারতের কাছে হেরে যাওয়ায় তারা সবাই হতাশ। তার ওপর খেলাটি যেভাবে হারলাম, তা ব্যাখ্যাতীত। খেলোয়াড়দের কারো জন্য কোনো বার্তা নেই। এমনকি আমরা যদি দুঃখ প্রকাশও করি, সেটিও যথেষ্ট না। কিন্তু আমরা তো এখন ইতিবাচকভাবে চিন্তা করতে পারি। আমাদের একটি ম্যাচ বাকি রয়েছে এবং সেখানে আমাদের সেরাটি খেলতে হবে। যদি সুযোগ পাই, তাহলে অবশ্যই জয়ের চেষ্টা করব। ’

ভারতের কাছে হারের জন্য অনভিজ্ঞতার দায়কে বরং খানিকটা যৌক্তিক মনে হয় বাংলাদেশ অধিনায়কের কাছে। যদিও ওই মুহূর্তে ক্রিজে ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বহুদিন খেলার অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ দুই ব্যাটসম্যান মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদ উল্লাহ। কিন্তু অমন পরিস্থিতিতে তো আর খুব একটা পড়তে হয়নি বাংলাদেশকে। এবারের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতে কাজে লাগার আশাবাদটাই এখন মাশরাফির সম্বল, ‘শেষ ম্যাচ হারার কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। এক রানে হারলে যেকোনো জায়গাতেই ত্রুটি বের করা যায়। হ্যাঁ, এমন পরিস্থিতিতে না খেলার কিছুটা অনভিজ্ঞা রয়েছে। হয়তো-বা এই রকম পরিস্থিতিতে সব সময় আমরা অভ্যস্ত হতে পারিনি। তবে আমার বিশ্বাস এখান থেকে অবশ্যই ঘুরে দাঁড়াতে পারবে দল। গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যে ভুলগুলো করেছি সেগুলো কতটুকু শুধরাতে পারছি। এখান থেকে আমরা শিক্ষা নিতে পারলে সামনে এমন পরিস্থিতি এলে আমরা ম্যাচ বের করে নিতে পারব। ’

এমন পরিস্থিতিতে হেরে গেলে ভারতে ক্রিকেটারদের বাড়িতে ঢিল পড়ে। পাকিস্তানে পোড়ানো হয় খেলোয়াড়দের কুশপুতুল। কিন্তু বাংলাদেশের সমর্থকদের খ্যাপাটে সমর্থন থাকলেও ওই বাড়াবাড়ি তো কখনো করেন না তারা। আবেগের ইতিবাচক প্রবাহই বইতে থাকে শুধু। এই দুঃসময়েও সবার সেই সমর্থন খুব করে টের পায় পুরো বাংলাদেশ। কৃতজ্ঞ তাই মাশরাফি। আবেগে মোড়ানো এই আস্থার প্রতিদান দেওয়ার প্রত্যয়ও তাই তাঁর কণ্ঠে, ‘এই হতাশার মধ্যে সবাই যেভাবে আমাদের সমর্থন করেছেন, সেটি অবিশ্বাস্য। অবশ্যই বাংলাদেশের দর্শকরা আমাদের পাশে এখনো আছেন। ভবিষ্যতেও থাকবেন। আমরা সবাই আবেগটা বুঝতে পারছি, বাসার সবার সঙ্গে কথা হয়েছে। প্রত্যেকটা মানুষই ভেঙে পড়েছে। তবু চেষ্টা করব সামনের ম্যাচে আমাদের সেরা খেলাটা খেলার। যদি সুযোগ থাকে ম্যাচ জেতার। ’

ওই ভবিষ্যতের আশাতেই তো বিনিয়োগ এখন আবেগের স্রোতে ভেসে যাওয়া মাশরাফি বিন মর্তুজার! বাংলাদেশেরও!


মন্তব্য