kalerkantho


মায়ের ম্যুরালে দ্রাবিড়

২৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মায়ের ম্যুরালে দ্রাবিড়

রোদমাখা নামটা একপাশে গা এলিয়ে পড়ে আছে বলে চট করে চোখে পড়ে না। তবু এই অর্ঘ্য যে রাহুল দ্রাবিড়ের জন্য, বুঝতে অসুবিধা হয় না এতটুকুন। তাঁর আদুরে নাম ‘দ্য ওয়াল’-এর প্রতিফলনে তৈরি বিশাল এক দেয়াল। তার ওপর রুপালি পাতে জ্বলজ্বল করে কাভার ড্রাইভ করা ওই কিংবদন্তির অবয়ব। পর পর তিন লাইনে বড় করে লেখা তিনটি শব্দ, ‘কমিটমেন্ট, কনসিসটেন্সি, ক্লাস’। দ্রাবিড়কে বোঝানোর জন্য আর কী চাই!

চিন্নাসোয়ামী স্টেডিয়ামের মূল গেট গিয়ে ঢুকেই হাতের বাঁয়ে এই স্থাপনা। আর একটু তফাতে স্টেডিয়ামের দেয়ালের গায়ে টেরাকোটায় খোদাই করা কর্ণাটকের কিংবদন্তি সব ক্রিকেটারদের ম্যুরাল। ৪৫ ফুট দৈর্ঘ্য ও ২০ ফুট প্রস্থের ক্যানভাসে অমন বিশাল ম্যুরাল তিনটি। সঙ্গে বাবুইয়ের বাসার মতো ছোট্ট আরো অনেকগুলো। এর সঙ্গেও কিন্তু যোগ রয়েছে দ্রাবিড়ের। টেরাকোটার এই ম্যুরালগুলো যে তাঁর মা পুষ্পা দ্রাবিড়ের করা!

কীর্তিমান মায়ের কীর্তিমান ছেলেই বটে রাহুল দ্রাবিড়!

ঘরের ছেলেকে সম্মান জানিয়ে দেয়ালটি তৈরি করে কর্ণাটক রাজ্য ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন। টেস্ট ও ওয়ানডে দুই ফরম্যাটে দ্রাবিড়ের ১০ হাজার রান পূর্ণ হওয়ার পর স্থাপন করা হয় তা। বিশেষত্ব হলো, দেয়ালটি তৈরি ঠিক ওই ১০ হাজার ইট দিয়ে। ২০০৮ সালের অক্টোবরে এটি উন্মোচন করেন সতীর্থ শচীন টেন্ডুলকার। উপস্থিত ছিলেন তখনকার টেস্ট অধিনায়ক অনিল কুম্বলে, সাবেক ক্রিকেটার সৈয়দ কিরমানি, জাভাগাল শ্রীনাথ এবং দ্রাবিড়ের বাবা শরদ দ্রাবিড় ও মা পুষ্পা দ্রাবিড়। দিনটির কথা মনে করতে পারেন কর্ণাটক রাজ্য ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার এডওয়ার্ড দাওয়াকর, ‘খুব যে হইচই করে এর উদ্বোধন হয়, তা কিন্তু না। রাহুল সব সময় কম কথার ছেলে। ও যেন একটু বিব্রতই হচ্ছিল সেদিন। ’

দ্রাবিড়ের ক্যারিয়ার তখনো শেষ গন্তব্যে পৌঁছেনি। ২৭ ফুট বাই ১৫ ফুট দেয়ালের বাঁদিকে পরিসংখ্যানের ঘরটি ছিল তাই ইলেকট্রিক স্কোরবোর্ডের মতো। আন্তর্জাতিক ম্যাচে রান বাড়লে বাড়ত সেখানেও। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর খুলে ফেলা হয় ইলেকট্রনিক স্কোরবোর্ড। স্থায়ীভাবে বসে যায় ক্যারিয়ার পরিসংখ্যান। ওদিকে মাঝ বরাবর রয়েছে দ্রাবিড়ের টেস্ট ও ওয়ানডেতে সেঞ্চুরির তালিকা। স্কোর, প্রতিপক্ষ, ভেন্যুসহ। বছর ধরে তৈরি সে তালিকায় ওপরে টেস্ট সেঞ্চুরি; নিচে ওয়ানডে। ওই ৪৮টি শতরানের মধ্যে ২০০৪, ২০০৭ ও ২০১১ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে তিন সেঞ্চুরিরও রয়েছে উল্লেখ।

দ্রাবিড়ের ক্রিকেটখ্যাতি বিশ্বজোড়া। তাঁর জননীও যে শিল্প-কীর্তিতে উজ্জ্বল একজন— সেটি কর্ণাটকের বাইরে জানেন কজন! বেঙ্গালুরু বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যকলা বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন পুষ্পা দ্রাবিড়। তাঁর ম্যুরাল ডিজাইন ও পেইন্টিংয়ের প্রদর্শনী হয়েছে ৬০টির ওপর। চিন্নাসোয়ামীতে এই ম্যুরাল করার আগে ছেলের সঙ্গে কথা বলেন। মাকে কাজটি করতে উৎসাহিত করেন দ্রাবিড়।

তাতে কী আশ্চর্য সুন্দর শিল্প খোদাই হয়ে যায় স্টেডিয়ামের দেয়ালের গায়ে!

লাল রঙের টেরাকোটায় তৈরি হয়েছে তিনটি বিশাল ক্যানভাস। পর্যায়ক্রমে ২০০৬, ২০০৮ ও ২০১১ সালে উন্মোচন করা হয় তা। কর্ণাটকের ক্রিকেটারদের মাঠের ছবি ফুটে আছে সেখানে। ভগবত চন্দ্রশেখর গুগলি মারছেন; গুন্ডাপ্পা বিশ্বনাথ করছেন স্কয়ার কাট। আবার সৈয়দ কিরমানির উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে ক্যাচ ধরা, ভেঙ্কটেশ প্রসাদের উইকেট শিকারের আনন্দ উদ্যাপনও সেখানে মূর্ত। ৪৫ ফুট দৈর্ঘ্যের এক ক্যানভাসের ভেতর রয়েছেন চন্দ্রশেখর, বিশ্বনাথ, কিরমানি, ব্রিজেশ প্যাটেল, এরাপল্লি প্রসন্ন, জাভাগাল শ্রীনাথ, অনিল কুম্বলে ও রাহুল দ্রাবিড়ের ম্যুরাল। আরেকটিতে কর্ণাটকের ছয় ক্রিকেটার— রজার বিনি, সদানন্দ বিশ্বনাথ, প্রসাদ, সুনীল যোশী, ডোডা গণেশ ও সুজিত সোমসুন্দর। পুষ্পা দ্রাবিড়ের তৈরি করা এসব ম্যুরাল চিন্নাসোয়ামী স্টেডিয়ামের সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুণ। ঠিক যেমনভাবে কর্ণাটক ক্রিকেটের মর্যাদা বাড়িয়েছেন রাহুল দ্রাবিড়।

‘দ্য ওয়াল’-এর ১০ হাজার ইটের দেয়ালের সামনে সরু একফালি বাগান। সেখানে ফুটে আছে লালরঙা ফুল। কতজনকে জিজ্ঞেস করি সে ফুলের নাম! কেউ বলতে পারেন না। কিন্তু মনে হয় যেন ফুটে থাকা সতেজ ওই ফুলে রাহুল দ্রাবিড়কে প্রতিনিয়ত অর্ঘ্য দিচ্ছে কর্ণাটক। পাশের ম্যুরালে ওই কিংবদন্তির মা পুষ্পা দ্রাবিড় তাঁর শিল্পকীর্তিতে যেমন শ্রদ্ধা জানান রাজ্যের ক্রিকেট-দিকপালদের। আর দেয়ালের সঙ্গে ম্যুরালের মিশেলে ‘দ্রাবিড় পরিবার’ যেন একাকার চিন্নাসোয়ামী স্টেডিয়ামের নিঃশ্বাসে-প্রশ্বাসে।


মন্তব্য