kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


এখন তো সহজাত উইকেটরক্ষক চোখেই পড়ে না

২৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



এখন তো সহজাত উইকেটরক্ষক চোখেই পড়ে না

প্রশ্ন : শুরুটা একটু অন্য রকম প্রশ্নেই করি। কামানো মাথা ও ইয়া বড় গোঁফে আপনার এই ট্রেডমার্ক স্টাইলের ভাবনা এলো কিভাবে?

সৈয়দ কিরমানি : (হাসি) শুরুতেই তো দেখি মজার প্রশ্ন। গোঁফ কিন্তু আমি কখনো কামাইনি। সে হিসাবে বলা যেতে পারে, আমার গোঁফ এখনো ভার্জিন। আর মাথার চুল এমনিতে পড়ে যাচ্ছিল। ১৯৮১ সালে ওমরাহ করতে গেলাম। সেখানে গিয়ে মাথা কামাতে হয়। ফেরার পর ওই অবস্থায় বেঙ্গালুরুতে এক স্কুলের অনুষ্ঠানে যাই। পরদিন দেখি পত্রিকায় লেখা, ‘ভারতীয় ক্রিকেটের কোজাক। ’ আমি ভাবলাম, বাহ্্, ভালো তো। হলিউডের এক সিনেমার নায়কের চরিত্রের সঙ্গে আমাকে মেলাচ্ছে। এই আমি শুরু করি মাথা কামিয়ে রাখা। ১৯৮২ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সিরিজের সময় সে দেশের মিডিয়া লেখে ‘ভারতীয় ক্রিকেটের ইয়ুল ব্রেনার’। আরেক হলিউড নায়ক। তা কোজাক হলাম, ইয়ুল ব্রেনার হলাম। এরপর আর কিভাবে অন্য স্টাইল করি!

প্রশ্ন : ছোটবেলায় তো সবাই ব্যাটসম্যান বা বোলার হতে যায়। আপনি কেন উইকেটরক্ষক হতে চাইলেন?

কিরমানি : আমরা বেঙ্গালুরুর রাস্তায় খেলতাম কর্ক বল দিয়ে। উইকেটের পেছনে দাঁড়িয়ে সেই বল ধরা ছিল কঠিন। বন্ধুদের কেউ তা করতে চাইত না। আমি করেছি। হয়তো আমার ভেতরে কিপিংটা ছিল।

প্রশ্ন : সুনীল গাভাস্কারের বইতে পড়েছি, আপনার প্রথম গ্লাভস ছিল নাকি ‘ইটের গ্লাভস’। এটি কিভাবে সম্ভব?

কিরমানি : ইটের গ্লাভস মানে তো আর সেটি দিয়ে বল ক্যাচ ধরতাম না; কিন্তু ঠেকাতাম। বাচ্চাদের খেলায় অনেক বল পেছনে আসত। হাতে ইট নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম। নইলে কর্কের বল খুব জোরে লাগত। স্কুলে গিয়ে প্রথম উইকেট কিপিং গ্লাভস পাই।

প্রশ্ন : আপনার ঘুমেরও একটি গল্প প্রচলিত আছে। ইংল্যান্ড সফরে গিয়ে নাকি অ্যালান নটের কিপিং না দেখে ঘুমাচ্ছিলেন?

কিরমানি : এটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। ম্যানেজার রাম প্রকাশ মেহরা ছড়িয়ে দিয়েছেন তা। আমি ছিলাম রিজার্ভ দলে। অ্যালান নটের সঙ্গে কিপিং নিয়ে অনেক কথা বলেছি। অনেকক্ষণ দেখেছিও। ক্লান্ত হয়ে একটু শুয়েছি কেবল। তখন ম্যানেজার এসে চিত্কার করে ওঠেন, ‘অ্যাই, কেন তুমি ঘুমাচ্ছ। ঘুমানোর জন্য কি ইংল্যান্ড এসেছ?’ সেই থেকে গল্প হয়ে গেল, কিরি সব সময় ঘুমায়। ডন ব্র্যাডম্যানও যে ব্যাটিং করতে যাওয়ার আগে ঘুমাতেন, সেটি কজন জানেন? রাম প্রকাশ মেহরা নিশ্চয়ই জানেন না।

প্রশ্ন : আপনার তো ক্যারি প্যাকার সিরিজ খেলার কথা ছিল। খেলেননি কেন?

কিরমানি : হ্যাঁ, আমাকে ও গাভাস্কারকে প্রস্তাব দিয়েছিল। বোর্ড তখন বলে, সেখানে গেলে সারা জীবনের জন্য বহিষ্কার করা হবে। তবে ওই হুমকি শুনে যে যাইনি, তা নয়। আসলে যাব কি যাব না, এ নিয়ে আমি ও সুনীল আলোচনা করছিলাম। পরের বছর তো প্যাকার সার্কাস বন্ধই হয়ে গেল।

প্রশ্ন : এবার শুনতে চাই ১৯৮৩ বিশ্বকাপের কথা। ভারত ছাড়ার সময় কি ভেবেছিলেন, চ্যাম্পিয়ন হতে পারবেন?

কিরমানি : কখনোই না। দলের কেউ এ কথা পর্যন্ত ভাবেনি যে আমরা নকআউটে খেলতে পারব। বিশ্বকাপে আমরা ছিলাম জিম্বাবুয়ে ও শ্রীলঙ্কার পর তৃতীয় দুর্বল দল। আমাদের টার্নিং পয়েন্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচের জয়টাই। ওই খেলায় জেতার পর মনে হলো, আরে, আমরা তো আগের দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হারিয়েছি। তাহলে সবাইকে হারাতে পারব। আমাদের দলে ছিল সাতজন অলরাউন্ডার। সেটি বিরাট সুবিধা। আর কপিল দেবের চেয়ে সিনিয়র খেলোয়াড় ছিল আরো সাতজন। কপিল সব সময় বলেছে, ‘আমি তোমাদের কাছ থেকে সাহায্য চাই। ’ এটিও বড় ভূমিকা রেখেছে।

প্রশ্ন : আর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে কপিল দেবের ইনিংসটি?

কিরমানি : সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত আমার তো ব্যাটিংয়ের সেভাবে প্রয়োজন পড়ে না। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দল আগে ব্যাটিং করতে যাওয়ায় আমি গোসল করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম; এরপর নাশতা করব। হঠাৎ কে যেন বলল, ‘কিরি, প্যাড আপ করো’। ভেবেছি, দুষ্টামি করছে। কিছুক্ষণ পর আরো মরিয়া চিত্কার, ‘কিরি, কী করছ! তাড়াতাড়ি প্যাড আপ করো। ’ জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি, আমাদের ১৭ রানে ৫ উইকেট নেই। তাড়াতাড়ি প্যাড পরে রেডি হলাম। ১৪০ রানে অষ্টম উইকেট পড়ার পর নামি। কপিলকে গিয়ে বলি, ‘তুমি আমাদের দলের সেরা হিটার। এখন আক্রমণ করা ছাড়া উপায় নেই। ’ ও শুরুতে একটু দ্বিধায় ছিল। আমি তৃতীয় বলে একটি চার মেরে গিয়ে ওকে আবার বললাম, ‘কপিল, আমিই এখন খেলছি। তুমি তো আমার চেয়ে কত ভালো ব্যাটসম্যান। মারো, সব বল মারো। ’ এভাবে আমি ওর ইগো জাগিয়ে তুললাম। এরপর কপিল অপরাজিত ১৭৫ রানের যে ইনিংস খেলল, কঠিন পরিস্থিতিতে এখন পর্যন্ত আমি কারো ব্যাটেই অমন ইনিংস দেখিনি। তবে এখানে দুটো কথা আছে। প্রথমত, সবাই এখন শুধু কপিলের ইনিংসের কথা বলে। আমি যে অপরাজিত ২৪ রান করলাম, ওর সঙ্গে অবিচ্ছিন্ন জুটিতে ১২৬ রান যোগ করলাম—সেটি কারো যেন মনে নেই। আরেকটি ব্যাপার হলো, আমি কপিল দেবের জন্য কখনো খেলিনি। খেলেছি দেশের জন্য।

প্রশ্ন : আপনাদের ওই দলটিকে যে বলা হয় ‘কপিলস ডেভিলস’— শুনতে কেমন লাগে?

কিরমানি : আমার কাছে এর আলাদা কোনো মূল্য নেই। আমরা ‘শয়তানের দল (ডেভিলস)’ না ‘ফেরেশতার দল (অ্যাঞ্জেলস)’—তাতে কিছু যায় আসে না।

প্রশ্ন : ফাইনালের প্রথম ইনিংস শেষে মনে হয়নি, ‘ইস্্, বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগটা নষ্ট হয়ে গেল?’

কিরমানি : একেবারেই না। কারণ ফাইনালে খেলাই ছিল আমাদের বড় অর্জন। ফিল্ডিংয়ে নামার আগে কপিল শুধু বলল, ‘আমাদের হারানোর কিছু নেই। চলো, দেখি কিছু করতে পারি কি না।

প্রশ্ন : কখন মনে হলো, ট্রফি জিততে চলেছেন?

কিরমানি : একেবারে শেষ উইকেট পড়ার পর। কারণ ডুজন, মার্শাল, হোল্ডিং, গার্নাররা শেষ উইকেট জুটিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে অনেক ম্যাচ জিতিয়েছে। অনেক টেস্ট ড্র করিয়েছে। প্রথম পাঁচ-ছয় উইকেট পড়ার পর আত্মবিশ্বাস থাকলেও শেষ উইকেট পড়ার আগে নিশ্চিন্ত হতে পারিনি।

প্রশ্ন : কপিল দেবের নেওয়া ভিভ রিচার্ডসের সেই ক্যাচটিকে অনেকে টার্নিং পয়েন্ট বলেন?

কিরমানি : বলে বলুক। আমার তাতে কিচ্ছু যায় আসে না। ফাইনালে আমরা কত রানে জিতলাম? ৪৩ রান। শেষ উইকেটে আমি ও সান্ধু যে ২২ রানের জুটি করলাম, সেটিকে তো কেউ টার্নিং পয়েন্ট বলে না। কপিলের ক্যাচ এত বাজার পেল; গাভাস্কারের দুটো ক্যাচের কথা কেউ বলে না। বাল্লু যে গর্ডন গ্রিনিজের প্রথম উইকেট নিল, কেউ বলে না।

প্রশ্ন : ওই বিশ্বকাপে সেরা উইকেটরক্ষক হয়েছিলেন, এটি কতটা গর্বের?

কিরমানি : অবশ্যই অনেক গর্বের। রুপালি এক গ্লাভসের মধ্যে বল দেওয়া স্মারক। তা আবার আমাকে দেন ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা উইকেটরক্ষক গডফ্রে ইভান্স। এটি আমার জন্য বিশাল সম্মানের। মিডিয়া কিন্তু এটি লেখেনি। কেন লেখেনি, আমি জানি না।

প্রশ্ন : কার বল কিপিং করা সবচেয়ে কঠিন?

কিরমানি : তিন জিনিয়াসের কথা বলব, যাদের কারণে আমার উইকেটকিপিং সবার চোখে লেগে আছে। আমার কর্নাটক রাজ্য দলের ভগবত চন্দ্রশেখর ও এরাপাল্লি প্রসন্ন। আর জাতীয় দলে গিয়ে পাই বিষেণ সিং বেদীকে। তাদের মতো আর কেউ নেই। তারা জিনিয়াস। স্পিন বোলিং শিল্পে এ তিনজনের চেয়ে বড় শিল্পী আমি আর কাউকে দেখি না। তাদের বল কিপিং করা সবচেয়ে কঠিন। আবার সবচেয়ে মজাও।

প্রশ্ন : ‘স্পিন চতুষ্টয়’-এর আর তিনজনের কথা বললেন। চতুর্থজন শ্রীনিবাস ভেঙ্কটরাঘবনের কথা বললেন না?

কিরমানি : আমি জাদুকরদের কথা বলছি। আমি স্পিন শিল্পীদের কথা বলছি। আমি জিনিয়াসদের কথা বলছি। সে কারণেই আমি অন্য কারো কথা বলতে চাই না। কিংবদন্তি ওই তিনজনই। ‘স্পিন চতুষ্টয়’ নাম মিডিয়ার দেওয়া।

প্রশ্ন : আপনার পরবর্তী উইকেটরক্ষকদের মধ্যে সেরা কে?

কিরমানি : এখন তো আর সহজাত উইকেটরক্ষক চোখেই পড়ে না। সবাই চায় কার্যকারিতা। আমাদের কর্নাটকের সদানন্দ বিশ্বনাথ, তিলক নাইডু ছিল সহজাত। পার্থিব প্যাটেলও কিছুটা। অন্য ভারতের বাইরে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট ও মার্ক বাউচার। একটি ম্যাচে এবি ডি ভিলিয়ার্সকে কিপিং করতে দেখেছি। ওকেও খুব সহজাত মনে হয়েছে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ নিয়ে প্রশ্নে কথোপকথন শেষ করি। বাংলাদেশ ক্রিকেটের গত বছর দুয়েকের উত্থানকে কিভাবে দেখছেন?

কিরমানি : হ্যাঁ, আমি তা খেয়াল রাখছি। ওরা খুব ডায়নামিক দল। খুব আবেগ দিয়ে খেলে। পারুক কি না পারুক, প্রতিপক্ষকে হারানোর একটা মরিয়া চেষ্টা বাংলাদেশের খেলায় দেখা যায়। শুধু একটা জায়গায় মনে হয় ওদের একটু ফাইন টিউনিং দরকার। সামর্থ্যকে পারফরম্যান্সে অনুবাদের বিষয়ে। এটি হয়ে গেলে বাংলাদেশ আরো দুর্দান্ত দল হয়ে উঠবে।


মন্তব্য