kalerkantho


জীবনযুদ্ধেই আনন্দ সদানন্দের

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জীবনযুদ্ধেই আনন্দ সদানন্দের

ভরদুপুরে ভরা কফি হাউস। সেখানে ভিনদেশি এক সাংবাদিকের সঙ্গে প্রথম পরিচয়ে অঝোরে কাঁদছেন ভারতের সাবেক এক টেস্ট ক্রিকেটার! দৃশ্যটা এত পরাবাস্তব যে, দৃশ্যপটে উপস্থিত থেকেও বিশ্বাস হতে চায় না। মনে হয়, অন্য কোনো ভুবন থেকে জাদুবাস্তবতায় তা চলে এসেছে বেঙ্গালুরুর সেন্ট মার্কস রোডের কোশি’স কফি হাউসে।

নইলে সদানন্দ বিশ্বনাথের আবেগের অর্গল ওভাবে কেন ভেঙে পড়বে আমার সামনে!

অমন আহামরি কোনো ক্যারিয়ার না সদানন্দ বিশ্বনাথের। ছিলেন উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান। তিন টেস্টে ১১ ডিসমিসালের সঙ্গে মোটে ৩১ রান এবং ২২ ওয়ানডেতে ২৪ ডিসমিসালের পাশাপাশি মাত্র ৭২ রান। ভারতের জার্সিতে এই পরিসংখ্যান দিয়ে অবশ্য তাঁকে বিবেচনা করা যাবে না। উচিতও নয়। সুনীল গাভাস্কারের কথাটি বরং এ ক্ষেত্রে বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। ১৯৮৫ সালে অস্ট্রেলিয়ায় আয়োজিত ‘ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপ অব ক্রিকেট’ নামের যে ছায়া-বিশ্বকাপ, তাতে চ্যাম্পিয়ন ভারত। ওই টুর্নামেন্টের স্মৃতিচারণে ভারত-অধিনায়ক বলেছিলেন, ‘সেবার আমাদের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কারণ হিসেবে অনেকে অনেক কিছু বলতে পারে। কিন্তু আমার কাছে মনে হয়, এর অন্যতম কারণ উইকেটের পেছনে সদানন্দ বিশ্বনাথের উপস্থিতি। ’ অস্ট্রেলিয়ার মিডিয়াও লেখে তখন, ‘সুদর্শন এই তরুণটি হয়তো ভারতের সর্বকালের সেরা উইকেটকিপার হওয়ার পথে রয়েছে। ’

কিন্তু বিধাতা যে তাঁর গন্তব্য লিখে রেখেছেন অন্য পথে!

কথা হয়েছিল আগেই। দেখা হয় বেঙ্গালুরুর চিন্নাসোয়ামী স্টেডিয়ামে। পোলো শার্ট, থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট ও কেডস পরা পঞ্চাশ পেরোনো সদানন্দ। মাথার দু’পাশে চুল কমে গেছে। কাঁচাপাকা দাড়ি, ফোলা ফোলা একজোড়া চোখ। স্টেডিয়াম থেকে মিনিট দশেক হাঁটিয়ে নিয়ে যান কোশি’স-এ। বলে চলেন তাঁর ক্রিকেটার হওয়ার কথা। মোহাম্মদ আজহারউদ্দিনের সঙ্গে এই বেঙ্গালুরুতেই অভিষেক হওয়ার গল্প। ওয়ার্ল্ড চ্যাম্পিয়নশিপের পর শারজাহর রথম্যানস কাপের শিরোপা জয়ের সরণিতে ঘুরে আসতে আসতে চকচক করে ওঠে সদানন্দের চোখ। সেখানেই আবার চিকচিকে জল পথ হারানোর কাহিনীতে, ‘আমি ছিলাম ভারতীয় ক্রিকেট সাম্রাজ্যের নীল চোখের যুবরাজ। মাত্র ২১-২২ বছর বয়সে তো নাম-খ্যাতি সব পেয়ে যাই। সেটি আর সামলাতে পারিনি। ’

তাই বলে পুরোটা দায় আবার নিজের কাঁধে নেন না সদানন্দ। তাঁকে ভুল বোঝা হয়েছে, বোঝানো হয়েছে—এই দাবি থেকে এত বছর পরও সরেন না তিনি, ‘আমার একটা ইমেজ দাঁড়িয়ে যায় অ্যাংগ্রি ইয়াং ম্যান-এর। সিনেমায় অমিতাভ বচ্চনকে যেভাবে দেখানো হতো আর কি! সিনেমায় অমিতাভ সব কিছুর পরও টিকে থাকেন। আমি পারিনি। ’ একটু থামেন তিনি। ওই সময়টায় মদ্যপ হিসেবে যে বদনাম জুটে যায়, তা নিয়ে কী বলবেন সনানন্দ? বেশ উত্তেজিত শোনায় এবার তাঁর কণ্ঠ, ‘মদ কে খায় না, বলুন তো? আমারটাকে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে অনেক বড় করা হয়েছে। চিত্রিত করা হয়েছে মদ্যপ হিসেবে। এসব করে শেষ করে দেওয়া হয় ক্যারিয়ার। ’

তাঁর ক্যারিয়ার হয়তো ভারতীয় ক্রিকেটের ট্র্যাজেডি-উপাখ্যান। কিন্তু তাঁর জীবন? ওই যে আগেই বলা, গ্রিক ট্র্যাজেডির চেয়ে কম নয় কোনো অংশে। এই জায়গায় এসেই একটু একটু করে ভেঙে পড়েন সদানন্দ, ‘আমার বাবা-মার তো ডিভোর্স হয়ে যায়। আমরা ছয় ভাইবোন থাকি মায়ের সঙ্গে। শুধু আমার সঙ্গে বাবার যোগাযোগ ছিল নিয়মিত। এই কোশি’স-এ আমরা দেখা করতাম নিয়মিত। দেখা করার কথা ছিল সেদিনও। ’ সেদিন বলতে কোন দিন? আর কথা বলেন না সদানন্দ। নিচের ঠোঁট কামড়ে থাকেন কিছুক্ষণ। এরপর আবেগের কাছে আত্মসমর্পণে কেঁদে ফেলেন ঝরঝর করে, ‘‘বাপুজি ছিলেন মহান এক মানুষ। তাঁর কষ্টগুলোও অনেক বড়। কেউ তা দেখেনি। কোশি’সে দেখা করার সময় তাঁর হাতের মুঠোয় সব সময় থাকত পটাসিয়াম সায়ানাইড। বলতেন, ‘আমি আত্মহত্যা করব। ’ আমার এক বন্ধু শুনে বলে, ‘তুই চিন্তা করিস না। যারা আত্মহত্যা করে, তারা কখনো বলে করে না। ’ কিন্তু বাপুজি ঠিক তা-ই করেছিলেন। ’’ আর সেই সময়টা যেন এখনো স্পষ্ট করে দেখতে পান সদানন্দ, ‘‘রাতে মায়ের সঙ্গে গিয়ে কী সব কথা যেন বলে আসেন বাপুজি। ভোর ৪টার দিকে মা আমাকে ঘুম থেকে তুলে বলেন, ‘তোমার বাবা আত্মহত্যা করেছে। সকালে দেখি, বাপুজির লাশটা পড়ে আছে আমাদের বাসার সামনের ফুটপাতে। ’’

শুনতে শুনতে স্তব্ধ হয়ে বসে থাকি। আর সামনে রাখা কাপে কফি ঠাণ্ডা হয়ে যায় মৃত্যুর শীতলতা নিয়ে।

সদানন্দর বাবা মারা যান, বছরখানেক পর চলে যান মাও। শার্লি নামের যে বান্ধবীর সঙ্গে লিভ টুগেদার করেন অনেক দিন, সে-ও একদিন না জানিয়ে পরিবারের সঙ্গে উড়াল দেয় অস্ট্রেলিয়া। আর ভারতীয় দলে কয়েকবার যাওয়া-আসা করতে করতে ১৯৮৮ সালে সদানন্দ খেলে ফেলেন শেষ ম্যাচ। এত সব ধাক্কায় মদের সঙ্গে সখ্য যায় বেড়ে। তাই বলে নিয়তির কাছে আত্মসমর্পণ করেন না তিনি, ‘আমার দাদা ছিলেন মালুরের জমিদার। সেই জমিদারির রক্ত আমার শরীরে। আর আমার নানি ছিলেন স্কটল্যান্ডের। স্কটিশদের মতো লড়াকু মনোভাবটাও রয়েছে সে কারণে। হাল তাই ছেড়ে দেব কেন!’ হয়তো শার্লির বিরহে বিয়ে থা আর করেননি। তবে ক্রিকেটের সঙ্গে আছেন ঠিকই। বাচ্চাদের কোচিং ক্যাম্প চালান। প্রথম শ্রেণির ম্যাচের আম্পায়ার হন। আর এই ৫৩ বছর বয়সেও ছাড়েন না টেস্ট আম্পায়ার হওয়ার স্বপ্ন।

কোশি’স থেকে বেরোনোর সময় চারপাশে তাকান সদানন্দ। বাপুজিকে খোঁজেন হয়তো। এরপর খোঁজার চেষ্টা করেন জীবনের বৃহত্তর অর্থ, ‘আমি ভারতের হয়ে ১০০ টেস্ট খেলতে পারিনি, তো কী? জীবন হচ্ছে সবচেয়ে বড় টেস্ট ম্যাচ। সেখানে আমাকে কেউ হারাতে পারবে না। বাপুজির মতো আত্মহত্যা আমি করব না। লড়ে যাব। লড়েই যাব। ’ কান্না গিলে ফেলা সদানন্দের এই শেষ কথার দৃঢ়তায় দেখতে পাই একজন জমিদারের অহংকারী উত্তরাধিকারীকে। একজন স্কটিশ যোদ্ধাকে।

ক্রিকেটার সদানন্দ বিশ্বনাথের সঙ্গে আলাপ করতে এসে যে ‘মানুষ’ সদানন্দ বিশ্বনাথকে এভাবে পেয়ে যাব, সত্যি ভাবিনি!


মন্তব্য