kalerkantho

শনিবার । ২১ জানুয়ারি ২০১৭ । ৮ মাঘ ১৪২৩। ২২ রবিউস সানি ১৪৩৮।


অধিনায়ক যখন কাঁদেন, কাঁদান

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



অধিনায়ক যখন কাঁদেন, কাঁদান

তিনি মাঠে ঢোকেন ধীরে, সতীর্থদের অনেক পরে। অনুশীলন করেন না। কেবল শূন্য দৃষ্টি অসীম শূন্যতায় মেলে বসে থাকেন ঠায়। এরপর সংবাদ সম্মেলনে আসেন নিয়মের বাধ্যবাধকতায়। সেখানে তাঁর কথায় আগ্নেয়গিরির কাঁপন। তাঁর চোখে এক সমুদ্র জল। ১৬ কোটি ক্রিকেটপাগলের আবেগ এসে ভর করে ওই বুজে যাওয়া কণ্ঠস্বরে। ওই আটকে রাখা নয়নজলে। কিন্তু সংবাদ সম্মেলন কক্ষ থেকে বেরিয়ে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেন না বাঙালির বীরত্বের প্রতীক মাশরাফি বিন মর্তুজা। অঝোর কান্নায় অবিচারের বিচার যেন চান মহাকালের কাছে।

চিন্নাসোয়ামী স্টেডিয়ামে কাল মধ্যাহ্নের ঠিক ওই সময়টায় ক্ষণকালের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় মহাকাল!

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ সামনে। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে বাংলাদেশের স্বপ্নের মশাল জ্বালিয়ে রাখার দায় সেখানে। কিন্তু এক লহমায় এসব কেমন খেলোই না হয়ে উঠল! আরাফাত সানির বোলিং অ্যাকশনে লাল কালির দাগ তবু মানা যায়। কিন্তু তাসকিন আহমেদ? তাঁর অ্যাকশনকেও অবৈধ ঘোষণা করাটা তো বাংলাদেশ ক্রিকেটের ওপর অবিচারের বজ্রপাত! পরশু সন্ধ্যার সেই ঘটনার পর থেকেই বজ্রাহত পুরো দল। কাল ম্যাচপূর্ব সংবাদ সম্মেলনের মাশরাফি তাই থই খুঁজে পান না। এই অবিচারের উত্তর খোঁজেন, উদ্ধার খোঁজেন। চোখ ভরে ওঠে তাঁর অশ্রুজলে। গলার কাছটায় দলা পাকিয়ে যায় বারবার। আবেগের ওই ডুবন্ত ভেলায় বাংলাদেশ অধিনায়ককে দেখে ভারতের এক সাংবাদিক পর্যন্ত কেঁদে ওঠেন ডুকরে। তাঁর অধিনায়কত্বের দর্শনে বাংলাদেশ দল সব সময়ই একটি পরিবার। সেই পরিবারের দুই সদস্যের বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত মাশরাফি, ‘ঘরের দুজন ছেলের যদি সমস্যা হয়, আপনি কোনো কাজই ভালোভাবে করতে পারবেন না। সেই উদ্যম পাবেন না আর। আমাদের কাছে ব্যাপারটা এখন ওই রকম। আমাদের মানসিক অবস্থা কী, সবাই দেখলেই বুঝতে পারবেন। ’ তাই বলে অকারণ আবেগের ঢেউয়ে ভেসে যাচ্ছেন না তিনি। সে কারণেই একরকম মেনে নেন বাঁহাতি স্পিনারের অবস্থা। কিন্তু কী করে মানবেন ডানহাতি পেসারের পরিণতি! তাই তো অসহনীয় অসহায় শোনায় মাশরাফির কণ্ঠ, ‘দুইটা ছেলে আমাদের সঙ্গে এত সময় কাটিয়েছে! এখন ওদের ফিরে যেতে হবে দেশে। হয়তো-বা সানিরাটা আমরা মেনে নিয়েছি। কিন্তু তাসকিনের অ্যাকশন বৈধ, এই বিশ্বাস আমাদের মধ্যে আছে। আমরা যা বিশ্বাস করি, সেটা তো হচ্ছে না। এমন জিনিস চাইলেও ভুলে থাকা কঠিন। ’

তাসকিনের ব্যাপারটি বিনা মেঘে বজ্রপাত হয়ে এসেছে নানা কারণে। সবচেয়ে বড় কারণ নিহিত আইসিসির পরীক্ষার ধরনে। ম্যাচে কোনো ধরনের বোলিংয়ে ম্যাচ অফিশিয়ালদের সন্দেহ হলে সেটি থাকে তাঁদের প্রতিবেদনে। সে অনুযায়ী অনুমোদিত পরীক্ষাগারে গিয়ে করতে হয় একই বোলিং। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে যে ম্যাচে তাসকিনের অ্যাকশন প্রশ্নবিদ্ধ, সেখানে চার ওভারের ২৪ বলের মধ্যে একটি বাউন্সারও করেননি তিনি। অথচ চেন্নাইয়ের পরীক্ষাগারের প্রতিবেদনে লেখা, এই পেসারের তিনটি বাউন্সারে কনুই ১৫ ডিগ্রির চেয়ে বেশি বেঁকেছে। প্রথমত এই বাউন্সারের পরীক্ষা তাঁর দেওয়ারই কথা না। দিলেও তিন মিনিটে ৯টি বাউন্সার করার নির্দেশনা নিঃসন্দেহে বাড়াবাড়ি। ষড়যন্ত্রের দুর্গন্ধ পাওয়াটা তাই খুব স্বাভাবিক।

মাশরাফি তো আর সরাসরি তা বলতে পারেন না। কিন্তু নিজেদের বক্তব্যটা ঠিকই জানিয়ে দেন এভাবে, ‘যে ম্যাচে তাসকিনের বোলিং অবৈধ বলা হয়েছে, সেখানে বল একটাও অবৈধ ছিল না। এখন কথা হচ্ছে, ম্যাচে অবৈধ ডেলিভারি না করলে কিভাবে তাকে সাসপেন্ড করবেন? ওখানে কোনো সমস্যা না পাওয়ার পরও কি তাকে আটকে রাখবেন? নাকি রাখবেন না?’ এই প্রশ্নগুলোতেই রাগ-ক্ষোভ-ক্রোধের যাবতীয় অনুভূতি উগড়ে দেন মাশরাফি। এরপর দুঃখ আর অভিমান ছড়িয়ে দেন কক্ষজুড়ে, ‘আমরা এই সিদ্ধান্তে খুবই হতাশ। এখনো বিশ্বাস করি, তাসকিনের ডেলিভারি ঠিক আছে। পদ্ধতি আমি জানি না। এই ধরনের টুর্নামেন্টে কী ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়—জানি না তাও। তবে এই মুহূর্তে তো আমরা অন্য কিছু করতে পারি না। নিয়মের মধ্য দিয়েই যেতে হবে। কিন্তু দল ভীষণ, ভীষণ হতাশ। ’ এই হতাশার আগুনটা আরো জ্বলে ওঠে নিজেদের ভেতর ধূমায়িত হয়ে ওঠা প্রশ্নের বারুদে, ‘নির্দিষ্ট খেলোয়াড়কে নিয়ে কী অনুভব করছি এবং এ বিষয়ে আমরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট কি না—এ নিয়ে নিজেদের ভেতর প্রশ্ন তো থেকেই যায়। এখন আমাদের মন এক জায়গায়, করতে হবে অন্য কিছু। সানির বিষয়টা মেনে নিয়েছি। কিন্তু তাসকিনের ব্যাপার মনে চেপে রেখে কাজ করা খুবই কঠিন। ’

নিজের জীবনে দুঃসময়ের মুখোমুখি কম হননি মাশরাফি। অবিচারের শিকারও কত! ২০১১ বিশ্বকাপ থেকে বাদ পড়ার পর অবশ্য নিজেকে নিয়ে ভাবা ছেড়ে দিয়েছেন। প্রতিটি ম্যাচ খেলতে নামেন শেষ ম্যাচ হিসেবে। কিন্তু তাসকিন আহমেদের ব্যাপার তো আর অমন নয়। মাশরাফির মনের দুঃখ-সাগরে উথালপাথাল ঢেউ সে কারণে আরো বেশি করে। এই যে অধিনায়ক হিসেবে আজ ৫০তম ম্যাচের সামনে দাঁড়িয়ে, সেই উপলক্ষও আনন্দের রং ছড়ায় না তাঁর মনের ক্যানভাসে, ‘আমার নিজস্ব জীবনে অনেক কিছু দেখেছি তো। আমার জন্য হয়তো এটা মেনে নেওয়া অনেক সহজ। এখন কথা হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিশ্রুতিশীল খেলোয়াড়কে নিয়ে। যে কিনা আগামী ১০ বছর বাংলাদেশ দলকে সার্ভিস দেবে। আমরা বিশ্বাস করি তাসকিনের বোলিং অ্যাকশন ঠিক আছে। আইসিসি সব সময় তরুণ ক্রিকেটারদের উৎসাহিত করে। আশা করি, তাসকিন ন্যায়বিচার পাবে। ’

ন্যায়বিচার! হায় ন্যায়বিচার! তাসকিনের বোলিংয়ে যেভাবে নিষেধাজ্ঞার শৃঙ্খল পরিয়ে দেওয়া হলো, তাতে বিশ্বাসের পাহাড়টাই তো ধসে পড়েছে! আর ওই ভাঙনের শব্দই কাল উড়ে উড়ে বেড়ায় মাশরাফির হতাশায়। ক্রোধে। আর আর্তনাদে।


মন্তব্য