kalerkantho


প্রণবের ছুটে চলা

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



প্রণবের ছুটে চলা

ইয়া লম্বা শরীর নিয়ে হেঁটে যান তিনি গট গট করে। তাঁর পেছন পেছন দৌড়ান ছোটখাটো লিকলিকে একজন। অটোগ্রাফ চাইলেন, কিন্তু দানবীয় কার্টলি অ্যামব্রোসের তাতে আগ্রহ নেই কোনো। হঠাত্ বোধহয় মায়া হলো। মাঠ থেকে ফিরে এসে ক্রিকেটের বলে দেন সই। আর তা পেয়ে ওই ছেলেটির চোখে-মুখে কী রাজ্যের আনন্দ! যেন রাজ্য জয় করলেন এইমাত্র!

বেঙ্গালুরুর লোকজনের মধ্যে হেলদোল নেই খুব একটা। দিন দুয়েকের অভিজ্ঞতায় তাঁদের সহজাত আয়েশি চরিত্রটা নজরে না পড়ে পারে না। সে হিসেবে চিন্নাসোয়ামী স্টেডিয়ামে কাল সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বেঙ্গালুরুর ওই ছেলে প্রণব জৈনের ছোটাছুটি ব্যতিক্রম মানতে হবে। এই যুবক দৌড়ান বাংলাদেশ কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহের পেছনে। পাশ দিয়ে সাকিব আল হাসান হেঁটে যেতেই আবার দে ছুট! ওদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অনুশীলনও তো চলছে! ক্লাইভ লয়েড, অ্যামব্রোসদের না ধরলে চলে না! কারো সই নিচ্ছেন ছোট্ট ব্যাটে, কারো-বা বলে। আবার আবদার ধরছেন সবার সঙ্গে ছবি তোলার। সেই প্রত্যাশা কেউ মেটান, কেউ মেটান না।

কিন্তু প্রণব জৈন হতাশ হন তা তাতে। ছুটে চলেন তিনি। আর সেই ছুটতে ছুটতেই এখন তাঁর সংগ্রহে ক্রিকেটারদের হাজার চারেক অটোগ্রাফ। তাঁদের সঙ্গে তোলা প্রায় ছয় শ ছবি। সঙ্গে বিভিন্ন ক্রিকেটারের জার্সি, বিভিন্ন ম্যাচের বল, ব্যাট, স্টাম্প—কী নেই! চোখে-মুখে কৈশোরের ছাপ লেগে থাকা ১৮ বছরের প্রণব তো গর্বের সঙ্গে এমন ঘোষণাও দিতে পারেন, ‘পৃথিবীর প্রায় সব ক্রিকেটারের সই আমি এক মুহূর্তে চিনতে পারব। ’

তাঁর এই ছুটে চলার শুরু ২০০৭ সালে। চার দিনের অনুশীলন ক্যাম্প করতে ভারতীয় দল আসে বেঙ্গালুরু। বাবার সঙ্গে প্রণব আসেন চিন্নাসোয়ামীতে। ১০ বছরের ছেলেটির খুব ইচ্ছা দূর আকাশের তারাদের কাছাকাছি যাওয়ার। কিন্তু নিরাপত্তার শৃঙ্খল পেরিয়ে সেখানে যাওয়ার সাধ্যি কার! ছোটখাটো প্রণব কিন্তু ফাঁক গলে ঠিকই চলে যান স্বপ্নের ক্রিকেটার মহেন্দ্র সিং ধোনির কাছে। গেলেন না হয়, তাতে লাভ কী! কাগজ-কলম নেই বলে অটোগ্রাফ নিতে পারেন না। ওই বয়সে সঙ্গে মোবাইল রাখার অনুমোদন ছিল না বলে তুলতে পারেন না ছবি। মনে তাঁর রোখ চেপে যায়। ভেবেচিন্তে শুরু করেন এই শখের পথে হাঁটা, ‘তাতে শুরুতে বাবা-মা বাধা দিতেন। পরে বুঝলেন, লাভ নেই। আর এখন তো আমার পড়াশোনা শেষ। এটি নিয়েই থাকতে পারব। ’

পড়াশোনা করেছেন কেবল করার জন্য, গত বছর পাঁচেক ধরে এই অটোগ্রাফ সংগ্রহের নেশাই তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে তাঁকে। এই তো কিছু দিন আগে দুবাইতে মাস্টার্স ক্রিকেট লিগ ও পাকিস্তান সুপার লিগে গিয়েছিলেন। সেখানে বাংলাদেশের বোলিং কোচ হিথ স্ট্রিক উপহার দেন সই করা ক্যাপ। সাকিবের অটোগ্রাফ নিলেও ছবি তোলার সুযোগ হয়নি। কাল তাই বেঙ্গালুরুতে মাশরাফি বিন মর্তুজার দলের প্রথম ট্রেনিং সেশনেই হাজির প্রণব।

মাশরাফি-সাকিব-তামিম এবং দলের সঙ্গে থাকা আকরাম খান-খালেদ মাহমুদ সবার অটোগ্রাফ নিলেন। ছবি তুললেন। ধোনি যে বেঙ্গালুরুতে এলে তাঁর জন্য আলাদা করে মিনিট দশেক সময় রাখেন—বললেন তাও। আবার ভিভ রিচার্ডসের মতো কিংবদন্তির সইয়ের জন্য অপদস্থ হওয়ার গল্পও শোনান প্রণব। তবু তিনি দমে যান না। ক্রিস গেইল অনুশীলন করে হেঁটে বেরিয়ে যেতেই তাঁর সামনে মেলে দেন একটি টিকিট। সই নেওয়ার পর এসে শুনিয়ে যান, ‘যে ম্যাচে গেইল এখানে ১৭৫ করেছিল, এটি সেই খেলার টিকিট। ’

এত সব কিছু দিয়ে কী করবেন প্রণব? চোখে তাঁর জ্বলে ওঠে স্বপ্নের তারা, ‘সবচেয়ে বেশি ক্রিকেটারের অটোগ্রাফ নিয়ে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লেখাতে চাই। আর চাই জাদুঘর বা গ্যালারির মতো কিছু করতে। এখন আমি যেমন ক্রিকেটারদের কাছে যাই, ওরা পরে আমার কাছে আসবে!’

হ্যাঁ, এই ১৮ বছর বয়সে যেটুকু পথ পাড়ি দিয়েছেন প্রণব জৈন, তাতে ক্রিকেটারদের একদিন তাঁর জাদুঘরে যেতেই হবে। ক্রিকেটকেও!


মন্তব্য