kalerkantho

26th march banner

সেই স্পিনেরই ফাঁদে বাংলাদেশ

সাইদুজ্জামান   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সেই স্পিনেরই ফাঁদে বাংলাদেশ

ইংরেজিতে মোক্ষম একটা শব্দ আছে ‘এক্সপোজড’, টি-টোয়েন্টির বাংলাদেশও কেমন যেন ‘এক্সপোজড’ হয়ে গেছে; দুর্বলতা উদোম হয়ে যাওয়া আর কি!

বাংলাদেশ দলের পক্ষ থেকে এশিয়া কাপ ফাইনালে ওঠার পরও ‘টি-টোয়েন্টি শিখে গেছি’ বলে জোরালো দাবি ওঠেনি। অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা থেকে শুরু করে তামিম ইকবাল একই সুরে বলে গেছেন, ‘কেবল খেলাটা শিখতে শুরু করেছি’। তাই ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশ দারুণ কিছু করে বসবে ভেবে যাঁরা টিভি পর্দায় বুঁদ, আশাভঙ্গের দায়টা একান্তই তাঁদের। সুসময়ে তো আর দুর্বলতার কঙ্কালটা দেখা যায় না। তাসকিন আহমেত ও আরাফাত সানির বোলিং অ্যাকশন অবৈধ ঘোষণার পর ফ্লাশ-লাইটের আলোয় উন্মুক্ত বাংলাদেশের দুর্বলতাগুলো।

ঘটনাচক্রে দুর্বলতম দিকটা স্পিনে, যে স্পিন বিভাগই এত দিন অক্সিজেন জুগিয়ে এসেছে দলকে। সম্প্রতি পেসাররা ভালো করায় ধীরে ধীরে পড়তি জমিদারির মতো স্পিনারদের হারিয়ে যাওয়াটা সেভাবে নজরে পড়েনি কারোর। যদিও এই সেদিন একটি টিভি টক শো’র ফাঁকে জাতীয় এক নির্বাচক নীরব আশঙ্কার কথা বলছিলেন অফ এয়ারে, ‘আমরা পেসারদের প্রশংসা করতে করতে স্পিনারদের গুরুত্ব একদমই ভুলে যাচ্ছি!’ আরাফাত সানির বেঙ্গালুরু থেকে দেশে ফিরে আসার খবরে ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টির পরের অংশে স্পিনারদের নিয়েই সম্ভবত বেশি হাপিত্যেশ করতে হবে বাংলাদেশকে।

আরাফাত ফেরার আগেই অবশ্য বিশ্ব টি-টোয়েন্টি আসরে স্পিনারদের গুরুত্ব চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে অন্য দলগুলো। ভারতের উইকেট মিরপুরের মতো নয়, সেই সাবেকি আমলের স্পিনস্বর্গই হয়ে আছে। ভাবা যায়, নিউজিল্যান্ড তিন স্পিনার খেলিয়ে হারিয়ে দিচ্ছে ভারতকে! অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে কম পুঁজি নিয়েও স্পিন দিয়েই ম্যাচ বের করে নিয়েছে কিউইরা। দক্ষিণ আফ্রিকার আকাশছোঁয়া ইনিংসের ওপর দিয়ে উড়তে গিয়ে ইংলিশদের সামান্য যেটুকু সমস্যা হয়েছিল, তা প্রোটিয়া স্পিনারদের ওভারগুলোতেই। টি-টোয়েন্টির দিন যত যাচ্ছে, ততই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে স্পিনারদের ভূমিকা, আর ততই আশঙ্কার মেঘ জমছে বাংলাদেশকে ঘিরে। স্পিনার ভাণ্ডার যে সমৃদ্ধ নয়!

কে বলল, সাকিব আল হাসান আছেন না! আছেন, কিন্তু তাঁর ব্যাকআপ আরাফাত সানির অভাব অভিষেকেই (যদি হয়) পুষিয়ে দেবেন সাকলাইন সজীব, অতটা আশা করা নবাগতের প্রতি অন্যায়ই হবে। দলের ভেতরের আস্থায় অবশ্য সাকলাইনের চেয়ে শুভাগত হোমের অফস্পিনেই আস্থা বেশি। তবু তিনি তো মূলত ব্যাটিং অলরাউন্ডার। বিকল্প আছেন মাহমুদ উল্লাহ ও নাসির হোসেন। কিন্তু শুভাগতর এঁদের কেউও বিশেষজ্ঞ স্পিনার নন। নাসিরের একাদশে জায়গা নিশ্চিত নয়। কে জানে, এ অবস্থায় আব্দুর রাজ্জাককে প্রাথমিক স্কোয়াডে না রাখার ভুলটা এখন উপলব্ধি করছে কিনা টিম ম্যানেজমেন্ট! অভিজ্ঞতা এবং ফর্ম মিলিয়ে এ বাঁহাতি স্পিনার অবশ্যই সাকিব-আরাফাতের পরের জায়গাটির দাবিদার। প্রথম ৩০ জনে নেই বিধায় রাজ্জাককে ভারতে উড়িয়ে নেয়ার সুযোগ নেই। অগত্যা একজন সাকিবের সঙ্গে ইনফর্ম পেসারদের ওপরই ভরসা রাখতে হচ্ছে মাশরাফি বিন মর্তুজাকে।

এটা ঠিক যে প্রতিপক্ষ, কন্ডিশন বিবেচনার চেয়ে ফর্মটারই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। কিন্তু ফর্ম মানে তো আর নেদারল্যান্ডস-ওমানের ওপর কর্তৃত্বের ছড়ি ঘুরিয়ে দেড় শ রানকে যথেষ্ট প্রমাণ করা নয়। সুপার টেন শুরু হতেই পাওয়ার ব্যাটিংয়ের তোড়ে যেভাবে গ্যালারিতে উড়ে উড়ে গিয়ে পড়ছেন বিশ্বের নামিদামি পেসাররা, তাতে মাশরাফি-আল আমিনদের জন্য উদ্বেগ জাগাটাই স্বাভাবিক। পাকিস্তান ম্যাচে তার ছোটখাটো প্রদর্শনী এরই মধ্যে দেখা হয়ে গেছে সবার, অপেক্ষমাণদের তালিকায় আছে আরো তিন হেভিওয়েট—অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড ও স্বাগতিক ভারত।

এই তিনটি দলের ব্যাটিংয়ে একটাই দুর্বল দিক দেখেছে এবারের ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টি, সেটি স্পিনের বিপক্ষে। বলার অপেক্ষা রাখে না, এর পেছনে উইকেটের যথেষ্ট ভূমিকা রয়েছে, সঙ্গে ব্যাটসম্যানের রানের পেছনে মরিয়া হয়ে ছোটার যোগফলই স্পিনারদের সাফল্যের চাবিকাঠি। তাই কেতাবি ‘ফর্ম’টাকে পাশে রেখে ‘কন্ডিশন’টাকে পুঁজি করে বাজিমাত করে দিয়েছে নিউজিল্যান্ড। ১৯৯২ বিশ্বকাপে পিঞ্চ হিটিং যদি কিউই ক্রিকেট মস্তিষ্কের প্রথম মাস্টারস্ট্রোক হয়ে থাকে, তাহলে ২০১৬ ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতে তাদের তিন স্পিনার নিয়ে ভারতের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়াটা শতাব্দী-সেরা প্ল্যান। ২০১৫ বিশ্বকাপে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দেওয়া ট্রেন্ট বোল্ট ডাগআউটে বসে সে প্ল্যান উপভোগই করেছেন।

উপভোগ করেছে গোটা ক্রিকেট বিশ্বই। কিন্তু এ পট পরিবর্তন দেখেও কিছুই করার নেই বাংলাদেশ দলের। অবশ্য এ দায় টিম ম্যানেজমেন্টের একার নয়, এ দেশের সামগ্রিক ক্রিকেট জনগোষ্ঠীরই। অস্ট্রেলিয়ার উইকেটে দাপট দিয়ে পেসারদের জয়গান শুরু, মিরপুরের হোম অব ক্রিকেটের কালো মাটির সবুজ আচ্ছাদনে আরো আড়ালে পড়েছেন স্পিনাররা। তাতে বাংলাদেশের ড্রেসিংরুমে পেসারদের জায়গা দিতে একে একে বেরিয়ে যেতে হয়েছে স্পিনারদের। তাই উপমহাদেশের আসরেও একজন সাকিবের ঘাড়েই চেপে বসে স্পিন আক্রমণের দায়।

দুঃসময়ই এসব মনে করিয়ে দিচ্ছে। পেসারদের জয়গান তো আর কোচ-অধিনায়করাই নন, ক্রিকেটসংশ্লিষ্ট সবাই—মিডিয়া এবং সাধারণ ক্রিকেট অনুসারীরাও করে এসেছেন। তাই কৌশলগত এ হারটা আমাদের সবার, আত্মঘাতী গোলের হার আর কি!


মন্তব্য