kalerkantho


আধুনিকতা আর ঐতিহ্যের সেতু

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আধুনিকতা আর ঐতিহ্যের সেতু

ঝাঁ চকচকে শহর বেঙ্গালুরু। আকাশছোঁয়া সব ভবন ঘোষণা দিচ্ছে আধুনিকতার।

অত্যাধুনিক সব মডেলের গাড়িও রাস্তায় চোখে পড়ে অহরহ। সেখানেই আবার স্টেডিয়ামের ভেতর ঢুকতে ‘ক্লাব হাউস’ যেভাবে আমন্ত্রণ জানায় নগরে নতুন অতিথির চোখকে, তা বিস্মিত করার মতো। আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের মেলবন্ধন যেন সেটি।

চিন্নাসোয়ামী স্টেডিয়াম চত্বরের ভেতর বিশাল সব অচিন বৃক্ষ। তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি ছুঁলে কী হবে, ওই বৃক্ষরাজির ছায়া বুলিয়ে দেয় সুশীতল পরশ। সেই ছায়াতেই কালের সাক্ষী হয়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ক্লাব হাউসটি। লাল টালির ছাদ ওপরে। আর নিচে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ক্রিকেট-রূপকথার কত অমূল্য সব রতন! এই মাঠে হওয়া প্রথম টেস্টের স্কোরকার্ড সযত্নে সংরক্ষিত। আর অগুনতি রথী-মহারথীর অটোগ্রাফ।

তাতে মহাকালের ঝাপটা এসে যেন লাগে সমকালে। মনে হয়, ওই তো এখানে একদিন এসেছিলেন ভিভ রিচার্ডস থেকে মনসুর আলী খান। ইমরান খান থেকে গুণ্ডাপ্পা বিশ্বনাথ। কপিল দেব থেকে টনি গ্রেগ। চিন্নাসোয়ামীতে টেস্ট খেলেননি, এমন অনেকের, অনেক দলের সইয়ের ভাণ্ডারও এটি। সংগ্রাহকের কাছ থেকে পাওয়া সেই স্মৃতিখণ্ডে উপস্থিত ডন ব্র্যাডম্যান থেকে বিজয় মার্চেন্ট। গ্যারি সোবার্স থেকে রিচি বেনো। সময়ের বাইনোকুলারে চোখ রেখে এসব কিংবদন্তিকে যেন দেখা যায় এই ক্লাব হাউস থেকে। টের পাওয়া যায় তাঁদের নিঃশ্বাসের শব্দ। আর বেঙ্গালুরুর ঘরের ছেলে রাহুল দ্রাবিড়, অনিল কুম্বলে, জাভাগাল শ্রীনাথরা তো এখনো প্রায়ই আসেন এই ক্লাব হাউসে।

কাল দুপুরের ক্লাব হাউসটি ছিল বেশ নির্জন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তুতিতে দুই দিন নাকি বন্ধ থাকবে তা। কিন্তু কর্ণাটক রাজ্য ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার এডওয়ার্ড দাওয়াকারের কাছ থেকে ঠিকই পাওয়া যায় ইতিহাসের পাঠ। এই রাজ্য অ্যাসোসিয়েশনের সঙ্গে ২৭ বছর ধরে সম্পৃক্ত তিনি। এই ক্লাব হাউসের গোড়ার কথা শোনান ভদ্রলোক, ‘এটি তৈরি হয় ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে। মূলত সামাজিক ক্লাব। কানাড়া রাজ্য দলে থাকলেই এই ক্লাবের সদস্য হতে পারেন। আমাদের এই অঞ্চলের সব আন্তর্জাতিক তো বটেই, প্রথম শ্রেণিতে খেলা সব ক্রিকেটারই এর সদস্য। অনুশীলনের ফাঁকে, খেলা শেষে সন্ধ্যার পর তাঁরা এসে এখানে আড্ডা দেন মন খুলে। ’ তবে আগের চেয়ে এখন সেই সংখ্যা কমে গেছে বলে জানান দাওয়াকার, ‘দ্রাবিড়-কুম্বলেরা তো খুব ব্যস্ত। এখন আর সেভাবে আসেন না। আগে সপ্তাহে অন্তত একবার আসতেন। ’

ক্রিকেট-রোমান্টিকদের জন্য এই ক্লাব হাউসের সবচেয়ে বড় সম্পদ হয়ে আছে অগুনতি অটোগ্রাফ। রিচি বেনোর নেতৃত্বাধীন ১৯৫৯-৬০ সালের অস্ট্রেলিয়া, ১৯৭৬ সালের গ্লেন টার্নারের নিউজিল্যান্ড, ১৯৬১ সালের হানিফ মোহাম্মদের পাকিস্তান, ১৯৬৩-৬৪ সালের মনসুর আলী খান পতৌদির ভারত দলের সবার সই সেখানে। আছেন ১৯৫৮-৫৯ সালের ক্যারিবিয়ান দলের গ্যারি সোবার্স, ল্যান্স গিবস, সনি রামাধিন, ওয়েস হল, রয় গিলক্রিস্টরা। এ ছাড়া ১৯৮৭ সালের বিশ্বকাপজয়ী অস্ট্রেলিয়া দলের সবারই সই-উপস্থিতি। এখানেই কি শেষ! বড় একটি ফ্রেমের পুরোটা জুড়ে বাঁধাই হয়ে আছেন ডন ব্র্যাডম্যান। সেখানে শুধু তাঁর ব্যাটিংয়ের ছবি নেই। দিলীপ সিং ও লালা অমরনাথের সঙ্গেও আছেন তিনি। রয়েছে ব্র্যাডম্যানের নিজের হাতের লেখাও। ১৯৮৩ সালে রাঘবেন্দ্র রাওকে যে চিঠি লিখেছিলেন, খামের ওপরের সেই ঠিকানাতেই হাতের লেখা সর্বকালের সেরা ওই ব্যাটসম্যানের। কিন্তু এই রাঘবেন্দ্র রাও কে? ধরিয়ে দেন ওই অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার এডওয়ার্ড, ‘দেখছেন না, সবগুলো ফ্রেমের নিচেই তাঁর নাম লেখা? তিনিই এসবের সংগ্রাহক। সব কিছু দিয়ে দিয়েছেন কর্ণাটক ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনকে। ’

ক্লাব হাউসের এক প্রান্তে একজন ব্যাটসম্যানের ভাস্কর্য। যেন মাত্রই মাঠ থেকে এলেন। গ্লাভস একটি খোলা, অন্যটি খোলার সময় পাননি। হেলমেটকে কোলের ওপর রেখে ব্যাট ধরে বসে আছেন। এর কিছুটা দূরেই ম্যাড়মেড়ে কাগজে জ্বলজ্বল করছে চিন্নাসোয়ামীতে হওয়া প্রথম টেস্টের স্কোরকার্ড। ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে ভারত-ওয়েস্ট ইন্ডিজ ম্যাচের। কাচঘেরা ফ্রেমের ভেতর হলুদ কাগজের ওপর লেখা স্কোরকার্ডে কালো, লাল, নীল ও সবুজ কালিতে লেখা। লেখাগুলো বিবর্ণ হয়ে গেছে, তবু কী রংই না ছড়ায় তা ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে! আরেক দিকে বড় ফ্রেমের ভেতর গা এগিয়ে পড়ে আছে ক্রিকেটের নানা বই। সেখানে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাস নিয়ে ‘লং শ্যাডেডাস : হান্ড্রেড ইয়ার্স অব অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট’ যেমন রয়েছে, তেমনি ভারতের ১৯৮৩ বিশ্বকাপ জয় নিয়ে ‘মিরাকল অ্যাট লর্ডসও’।

চিন্নাসোয়ামীর ক্লাব হাউসের উজ্জ্বল ইতিহাসের এত এত বাঁকে বাংলাদেশের কেউ কি থাকবেন না? এখানে বিশ্বকাপের দুটি ম্যাচ খেলতে আসা মাশরাফি বিন মর্তুজার দলের অটোগ্রাফ তো নিয়ে রাখতে পারে তারা। এডওয়ার্ডের কণ্ঠে নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না, ‘এগুলো তো আমাদের সিদ্ধান্ত না। কে জানে, হতেও পারে!’ তবে একটু ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে বাংলাদেশের উপস্থিতি কিন্তু রয়েছে সেখানে। ১৯৬৩-৬৪ সালের ভারত দলের সবার অটোগ্রাফে আছে সেলিম দুরানির সই। ভারতের হয়ে ২৯ টেস্ট খেলা এ অলরাউন্ডারের সঙ্গে বাংলাদেশের কিন্তু অন্য রকম সম্পর্ক। তাঁর বাবা মাস্টার আজিজ ছিলেন ক্রিকেট কোচ। ১৯৭১ সালের যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সময়ে ঢাকা স্টেডিয়াম এলাকায় অনুশীলন করাতেন। শহীদ জুয়েল, রকিবুল হাসানরা সবাই তাঁর ছাত্র।

সেলিম আজিজ দুরানির একটি সই সুদূর এই বেঙ্গালুরু স্টেডিয়ামের ক্লাব হাউসের সঙ্গে মিলিয়ে দিল যেন বাংলাদেশকে!


মন্তব্য