kalerkantho


স্বর্গোদ্যানে কোহলি বনাম আফ্রিদি

সামীউর রহমান   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



স্বর্গোদ্যানে কোহলি বনাম আফ্রিদি

লড়াইটা যখন ভারত বনাম পাকিস্তান, টি-টোয়েন্টির অনিশ্চয়তার মোড়কে স্নায়ুচাপের অগ্নিপরীক্ষার ম্যাচের ঘটনাস্থল যখন ইডেন গার্ডেনস নামক ক্রিকেটীয় নন্দনকানন, তখন উপমার খোঁজে পুরাণের দ্বারস্থ তো হতেই হয়! টি-টোয়েন্টির বিশ্ব আসরের প্রথম সংস্করণের মহানাটকীয় ফাইনালের দুই প্রতিপক্ষ ফের মুখোমুখি, নিরাপত্তার কারণে যে ম্যাচ হিমালয়ের শান্ত কোলের ধর্মশালা থেকে কলকাতার বুকে হট্টগোলের ধর্মতলার ইডেনে স্থানান্তরিত। ‘লার্জার দ্যান লাইফ’ বোধ হয় একেই বলে।

পৌরাণিক কাহিনীতে কখনো যে দ্বৈরথ দেখা যায়নি, সেই ‘কুম্ভকর্ণ’ আর ‘অর্জুন’কে মুখোমুখি করিয়ে দিচ্ছে চৈত্রের উত্তাপকে আরো চড়িয়ে দেওয়া এই ম্যাচ।

পৌরাণিক কোনো চরিত্রের সঙ্গে তুলনা করলে শহীদ আফ্রিদির তুলনা চলে কুম্ভকর্ণের সঙ্গে। বেশির ভাগ সময় কাটবে ঘুমিয়ে, কিন্তু জাগলে অজেয়! আফ্রিদির ক্যারিয়ারের শেষ ১০টা ম্যাচ দেখুন, মাসখানেক আগে পেশোয়ার জালমির হয়ে পিএসএলের একটি ম্যাচে ১৭ বলে ৩৮ রান বাদে বলার মতো কিছু নেই। বাংলাদেশের বিপক্ষে বিস্ফোরক ম্যাচের আগে বলতে গেলে আফ্রিদি তো ঘুমিয়েই ছিলেন! ব্যাট হাতে দুই অঙ্কের ঘরেই যেতে পারেননি, বোলিংটাও এমন আহামরি কিছু ছিল না। এশিয়া কাপে ফাইনালে উঠতে ব্যর্থ হওয়ার পর সমালোচনার তোড়ে নেতৃত্ব তো পরের কথা, দলে জায়গা নিয়েই টানাটানি! কোচও আকারে-ইঙ্গিতে বলে দিয়েছিলেন, এটাই শেষ সুযোগ। চতুর্মুখী চাপের এই বিস্ফোরণটাই বুঝি হলো বাংলাদেশের সঙ্গে ম্যাচে। আফ্রিদির ব্যাটে নান্দনিকতার চেয়ে পেশিশক্তির প্রয়োগই বেশি। নন্দনকাননে আফ্রিদির দক্ষযজ্ঞে মিসহিটেও ছয় হলো, শট খেলতে গিয়ে দেহ ভারসাম্য হারালেও বল ঠিকই উড়ে গেল সীমানার বাইরে। ১৯ বলে ৪৯ রানের ইনিংসের পর চতুর বোলিং তাঁকে এনে দিল ২৭ রানে ২ উইকেট।

ভারতের বিপক্ষে ম্যাচের আগে দলপতিকে এমন চেহারায় দেখা গেলে তবেই না স্বস্তি ফেরে গোটা দলে!

যতই মহেন্দ্র সিং ধোনির ‘কুল ক্যাপ্টেন্সি’ বা রোহিত শর্মার ‘ফ্লাইং স্টার্ট’ থাকুক না কেন, ভারতীয় ব্যাটিং লাইন আপের ভরকেন্দ  নিঃসন্দেহে বিরাট কোহলি। কৌরবদের বিশাল সেনাবাহিনীর বিপক্ষে পাণ্ডবদের যুদ্ধজয়ের অন্যতম কারণ যে দ্রোণাচার্যের প্রিয় শিষ্য অর্জুনের অস্ত্রবিদ্যার শ্রেষ্ঠত্ব, এ নিয়ে যেমন কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই তেমনি পাকিস্তানকে সামনে পেলে যে চওড়া হয়ে ওঠে বিরাটের ‘গাণ্ডিব’ (পড়ূন ব্যাট) সেটাও স্বতঃস্বিদ্ধ। প্রমাণ হিসেবে মিরপুরের ১৮৩, অ্যাডিলেডের ১০৭ কিংবা সবশেষ দ্বৈরথের ৪৯ রানের ইনিংসটাই দেখুন না। মোহাম্মদ আমিরের অমন বোলিংয়ের সামনে রানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উইকেট যখন পড়ছে, তখন দিল্লির এই ‘অ্যাংরি ইয়ংম্যান’ই তো রুখে দাঁড়িয়েছিল পালটা। বিশ্ব টি-টোয়েন্টির আগের দুটি আসরে ভারত-পাকিস্তান যখন মুখোমুখি, তখন স্কোরকার্ডে দুই দল মিলিয়ে সর্বোচ্চ রানের ইনিংস খেলা ব্যাটসম্যানের নাম বিরাট কোহলি। শ্রীলঙ্কায় ২০১২-র আসরে ম্যাচসেরা, ২০১৪তেও ৩২ বলে ৩৪ রান করা তাঁকে রেখে ২ ওভারে ২২ রানে ২ উইকেট নেওয়া অমিত মিশ্রকে ম্যাচসেরা বাছাটাও অনেকের চোখে বিস্ময়কর। তাই বিশ্ব টি-টোয়েন্টি ও প্রতিপক্ষ পাকিস্তান মানে বিরাটের ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স একেবারে বাংলা ছবির শেষ দৃশ্যে পুলিশের আগমনের মতোই নিশ্চিত। আর ভূমিকম্পের মতোই অনিশ্চিত শহীদ আফ্রিদির ‘আফ্রিদিসুলভ’ পারফরম্যান্সও। টি-টোয়েন্টিতে তো ভারতের বিপক্ষে আফ্রিদি আরো হতাশাজনক, ৭ ম্যাচে মোট রান ৪৫ এবং সর্বোচ্চ ১৪! বল হাতে মোটে ৪ উইকেট। পরিসংখ্যানই বলে দেয়, যে ফরম্যাটে তাঁকে সবচেয়ে বিপজ্জনক মানা হয় সেই টি-টোয়েন্টিতে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দলের বিপক্ষেই আফ্রিদি কতটা অকার্যকর। অবশ্য আফ্রিদিকে পরিসংখ্যান দিয়ে মাপাটা বৃষ্টির পর ঘাসে ছাওয়া পিচে স্পিনারের হাতে নতুন বলটা তুলে দেবার মতোই!

হুট করে ম্যাচটা ইডেনে স্থানান্তর হওয়াতে আয়োজক ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের প্রেসিডেন্ট সৌরভ গাঙ্গুলী মহাব্যস্ত। টিকিট নিয়ে ঝামেলা, ম্যাচ আয়োজনের নিরাপত্তা—এসব নানাবিধ জুতাসেলাই থেকে চণ্ডীপাঠের ভিড়ে বলেছেন খুব মূল্যবান একটা কথা, ‘এটা কাপ ফাইনাল নয় এবং এই ম্যাচটা জিতলেই ভারত বা পাকিস্তান কেউই চ্যাম্পিয়ন হয়ে যাচ্ছে না। ’ সর্বৈব সত্য কথা। আইসিসি ইভেন্টে পাকিস্তানকে গ্রুপ পর্বে হারালেই বিশ্বকাপ ভারতের এমনটাও নয়, কারণ তাহলে প্রতিবার বিশ্বকাপ ভারতই জিতত। তবু ম্যাচকে ঘিরে উৎসাহ আর আগ্রহের কমতি নেই। স্নায়ুর চাপের প্রসঙ্গ আসছে বটে, তবে কোহলিকে খুব সম্ভবত সেসব স্পর্শ করে না। রঞ্জি ম্যাচের মাঝপথে বাবার মৃত্যু সংবাদ পেয়ে গিয়ে শেষকৃত্য করে আসার পর যে সেঞ্চুরি করতে পারে, কোনো ক্রিকেট ম্যাচেই তাঁর স্নায়ুর চাপে ভোগার কথা নয়। সেটা বরং আফ্রিদিরই থাকতে পারে। বাংলাদেশের বিপক্ষে ম্যাচটা যে নিভে যাওয়ার আগে দপ করে জ্বলে ওঠা নয়, এটাও যে প্রমাণ করতে হবে তাঁকে!


মন্তব্য