kalerkantho

26th march banner

আমার দলে ১১ জনই অধিনায়ক

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আমার দলে ১১ জনই অধিনায়ক

কালের কণ্ঠ : অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচটি দিয়ে যে তিন ফরম্যাট মিলিয়ে বাংলাদেশের অধিনায়ক হিসেবে হাফ সেঞ্চুরি হতে যাচ্ছে আপনার, জানেন?

মাশরাফি বিন মর্তুজা : না তো ভাই। এই আপনার কাছ থেকেই শুনলাম।

প্রশ্ন : জেনে কেমন লাগছে?

মাশরাফি : শরীরের ওপর দিয়ে ইনজুরির এত ধকল গেছে যে আবার অধিনায়ক হওয়ার কথা কখনো ভাবিনি। ৫০ ম্যাচ তো অনেক পরের ব্যাপার। বিতর্ক না হলে যেকোনো দেশের অধিনায়ক তো অন্তত দুই-আড়াই বছর থাকেন। তখন এই ৫০ ম্যাচ, ৬০ ম্যাচ হয়। এখন অধিনায়ক হিসেবে আমার ৫০ ম্যাচ হয়ে যাচ্ছে—আপনার কাছে শোনার পর মনে হচ্ছে, কিছু একটা করতে পেরেছি।

প্রশ্ন : আপনার অধিনায়কত্বে দুটি স্পষ্ট ভাগ। প্রথম ভাগে ব্যক্তিগত ইনজুরির দুর্ভাগ্য। আর দ্বিতীয় ভাগে বাংলাদেশ পেয়েছে দু’কূল উপচানো সাফল্য। এই ৫০তম ম্যাচের মাইলফলকের সামনে দাঁড়িয়ে যদি একটু প্রথম খেলার স্মৃতিচারণ করতেন?

মাশরাফি : সবাই তো জানেন, সেটি কত কষ্টের স্মৃতি। অধিনায়ক হয়ে গেলাম ওয়েস্ট ইন্ডিজে। কত স্বপ্ন ছিল দেশকে অনেক কিছু দেব! কিন্তু ইনজুরির কারণে খেলতেই পারলাম না। ওই কষ্টটা আসলে কখনো যাবে না।

প্রশ্ন : পরিসংখ্যান কিন্তু বলছে, অধিনায়ক হিসেবে এক টেস্টে এক জয়ের রেকর্ড আপনার...

মাশরাফি : (হাসি) কী আর বলব! ওই রেকর্ডের চেয়ে আমার কষ্ট অনেক বেশি।

প্রশ্ন : মাঝে ২০১০ সালে একবার ইংল্যান্ড-আয়ারল্যান্ড সফরে অধিনায়ক হয়েছিলেন। সেবার সব ঠিকঠাক থাকলেও নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে দেশের মাটিতে সিরিজের প্রথম ম্যাচেই আবার ইনজুরিতে। তখন কি মনে হয়েছে, অধিনায়কত্ব আমার জন্য না?

মাশরাফি : মনে হয়েছে। একটা পর্যায়ে গিয়ে আমি ভয় পেতাম। অধিনায়কত্ব এলেই তো ইনজুরিতে পড়ে যাই! এবারও যখন প্রস্তাব এলো, খুশির চেয়ে ভয়টাই ছিল প্রথম অনুভূতি। অধিনায়ক হওয়ার প্রস্তাব মেনে নেব কি নেব না— এ নিয়ে খুব মানসিক চাপ গেছে তখন।

প্রশ্ন : শেষ পর্যন্ত মেনে নিলেন কেন?

মাশরাফি : মেনে নিলাম বাবার জন্য। উনি বললেন, ‘তোমার ক্যাপ্টেন্সি করা উচিত। ’ আমি বললাম, ‘অধিনায়ক হয়ে খেলতে নামলেই তো আমার ইনজুরি হয়। ’ বাবা বললেন, ‘অধিনায়ক না হয়ে সাধারণ খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামলেও ইনজুরিতে পড়তে পার। ’ বাসার সবার কথাতে ভরসা করে অধিনায়ক হওয়ার প্রস্তাব মেনে নিই।

প্রশ্ন : ২০১৪ সালের শেষ দিকে হন অধিনায়ক। তখন বাংলাদেশ দলের অবস্থা বেশ খারাপ। ঠিক ওই অবস্থায় কোন কাজটিকে প্রথম কাজ হিসেবে করতে চেয়েছেন?

মাশরাফি : আমি যখন অধিনায়ক হই, দলে বেশ কিছু জুনিয়র খেলোয়াড়। তাসকিন, আল-আমিনরা নতুন ঢুকেছে। পরে এলো সৌম্য, সাব্বির। আরো পরে মুস্তাফিজ। আমি চেয়েছিলাম, দলের মধ্যে সবার জন্য পরিবেশ তৈরি করতে। চেয়েছি, তরুণরা যেন আমাদের সিনিয়রদের সঙ্গে মিশতে পারে। তবে ভাবিনি যে, অধিনায়ক হিসেবে বড় কিছু করতে হবে বা করে ফেলব। আমরা সিনিয়ররা তো ছিলাম। তাঁদের কাছ থেকে ভালো পারফরম্যান্স প্রত্যাশিত। আমি ভেবেছি, তরুণদের জন্য পরিবেশ তৈরি করতে পারলে বাংলাদেশ ক্রিকেট অনেক এগিয়ে যাবে। কেননা ওদের সামর্থ্যের ওপর আমার আস্থা ছিল। ঠিক সেটিই কিন্তু পরে করে দেখিয়েছে সৌম্য, সাব্বির, তাসকিন, মুস্তাফিজরা।

প্রশ্ন : সিনিয়রদের এই একই ছাতার তলে নিয়ে আসাটা কতটা চ্যালেঞ্জিং ছিল?

মাশরাফি : আমার একটা সুবিধা কী, ওদের চেয়ে আমি একটু সিনিয়র। বছর পাঁচেক আগে বাংলাদেশের হয়ে খেলা শুরু করেছি। আর দ্বিতীয় কথা হলো, অধিনায়কত্বে সিনিয়ররা আমাকে অনেক সাহায্য করেছে। আমি যেসব সিদ্ধান্ত নিয়েছি, সবই হয়তো সবার মনঃপূত হয়নি। কিন্তু সামনাসামনি সব সময় বলেছে, ‘মাশরাফি ভাই, আমরা আপনার সিদ্ধান্তের সঙ্গে আছি। ’ এটি বড় ব্যাপার। আরেকটি ব্যাপারও রয়েছে। আমি কখনো কোনো সিদ্ধান্ত কারো ওপর চাপিয়ে দিইনি। সবার সঙ্গে আলাপ করি। সিনিয়রদের সঙ্গে, জুনিয়রদের সঙ্গেও। এটিও সাহায্য করেছে আমাকে।

প্রশ্ন : তার মানে কি এই যে, আপনার দলের ১১ জনই অধিনায়ক?

মাশরাফি : বলতে পারেন। আমি সব সময় বিশ্বাস করি, যেকোনা কাজ একজন করলে যতটা কষ্ট, ১১ জন করলে ততটা না। হ্যাঁ, শেষ পর্যন্ত অধিনায়ক হিসেবে সিদ্ধান্ত নিই আমিই। তাই বলে একা আমিই সব করি না। সবার কাছ থেকে মতামত নিই। অবশ্যই এ ক্ষেত্রে সিনিয়রদের মত বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আবার দলে নতুন আসা জুনিয়রকেও জিজ্ঞেস করি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়।

প্রশ্ন : আপনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের তো অনেক সাফল্য। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি তৃপ্তি দেয় কোনটি?

মাশরাফি : (একটু ভেবে) বিশ্বকাপের কথাই বলব। এটি আসলে অন্য রকম মঞ্চ। ইংল্যান্ডের সঙ্গে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে ওঠার অনুভূতি বলে বোঝানোর মতো না। আমার কথা বাদ দিন। সৌম্য কিংবা সাব্বিরের মতো প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়া ক্রিকেটারদের কাছে এটি প্রায় বিশ্বকাপ জিতে যাওয়ার মতো ব্যাপার। আর বাংলাদেশ ক্রিকেটের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথেও ওই সাফল্য বড় ভূমিকা রেখেছে। সবার আগে তাই সেটিকে রাখছি। আবার ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ জয়ও অনেক বড় অর্জন। আরেকটি অর্জনের উল্লেখ করতে চাই। পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্টে তামিম-ইমরুলের বিশ্বরেকর্ড জুটি। যদিও আমি সেই দলে ছিলাম না আর এটি ব্যক্তিগত রেকর্ড—কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য তা অনেক অনেক বড় অর্জন।

প্রশ্ন : বিশ্বকাপের কথা যখন উঠলই, একটু ২০১১ টুর্নামেন্টের কথা জানতে চাই। ২০১২ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ চলার সময় আপনি কালের কণ্ঠকে বলেছিলেন, আরো ৫০টি বিশ্বকাপ খেললেও দেশের মাটির ওই টুর্নামেন্ট খেলতে না পারার কষ্ট যাবে না। ২০১৫ বিশ্বকাপের সময় কি মাথায় ২০১১ ছিল?

মাশরাফি : ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি মিলিয়ে আমি এখন পর্যন্ত ৯টি বিশ্বকাপ খেলে ফেলেছি। বিশ্বকাপের প্রতি তাই আর আলাদা মোহ থাকার কথা না। কিন্তু তবু ২০১১ বিশ্বকাপের কথা মনে হলেই প্রচণ্ড কষ্ট পাই। দেশের মাটিতে খেলা বলে সেটি ছিল আমার কাছে স্বপ্নের বিশ্বকাপ। নানা কারণে তো খেলতে পারলাম না। এই কষ্ট যত দিন বেঁচে থাকব, আমার যাবে না। ২০১৫ বিশ্বকাপ না খেললে কিন্তু এত কষ্ট লাগত না। পরে সেটিই হয়ে গেল বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য ইতিহাস। তবে যে প্রশ্নটি করেছেন তার উত্তরে বলি, ২০১৫ বিশ্বকাপের সময় ২০১১ মাথায় ছিল না।

প্রশ্ন : ক্রিকেট অধিনায়ককে প্রতি ম্যাচে অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিতে হয়। আপনার এই ৪৯ ম্যাচের নেতৃত্বের ক্যারিয়ারে অমন কিছু সিদ্ধান্তের কথা কি মনে করতে পারেন, যেগুলোতে খুব ভালো লেগেছে?

মাশরাফি : দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে তৃতীয় ওয়ানডের দুটি সিদ্ধান্ত মনে পড়ছে। আমি দুই ওভারে ১০ রান দিলাম। এমন সময়ে তো আমার বোলিং থামানোর কথা না। কিন্তু আমার কাছে মনে হলো, বল যেন উইকেটে একটু গ্রিপ করছে। নিজেকে সরিয়ে বোলিংয়ে আনি সাকিবকে। ও দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলে আউট করে ফাফ দু প্লেসিকে। ওই ম্যাচের আরেক জায়গায় সাকিব এক ওভারে উইকেট পেল। আমি পরের ওভারে ওকে সরিয়ে বল দিই মাহমুদ উল্লাহকে। প্রথম বলেই উইকেট! বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে ওদের জুটি হয়ে যাচ্ছে দেখে রুবেলকে আনি বোলিংয়ে। স্পেলের তৃতীয় ওভারে ছয় বলের মধ্যে বেল ও মরগানের উইকেট তুলে নেয় ও। এ ছাড়া নাসিরের আরেকটি ঘটনার ঘটনা মনে পড়ছে। গত বছরের ওয়ানডে সিরিজের দ্বিতীয় ম্যাচে ওকে বোলিংয়ে আনার পর কোহলিকে এলবিডাব্লিউ করেছিল। তাতেও মজা পেয়েছি খুব।

প্রশ্ন : কোনো সিদ্ধান্তের জন্য কোনো দুঃখবোধ? মনে হয়নি, এটি হয়তো অন্যভাবে করতে পারতাম?

মাশরাফি : গত বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের শেষ টি-টোয়েন্টিতে শেষ ওভারে নাসিরকে বোলিংয়ে আনা। তখন ওদের দরকার ছিল ১৮ রান। নাসির বোলিং করছিল দুর্দান্ত; আমি তাই রেকর্ডের বিপক্ষে যাইনি। আর ওর ওপর আমার বিশ্বাসও ছিল পুরোমাত্রায়। কিন্তু আমার মন বলছিল, মাহমুদ উল্লাহকে বোলিংয়ে আনতে। এখনো আমার মনে হয়, যদি মনের কথা শুনতাম, তাহলে ম্যাচটি হয়তো হারতাম না।

প্রশ্ন : বাংলাদেশ ক্রিকেট মহলে আশঙ্কা আছে, মাশরাফি যখন আর অধিনায়ক থাকবেন না, তখন বাংলাদেশ ক্রিকেটের এই স্বর্ণসময় থাকবে না। আপনারও তা-ই মনে হয়?

মাশরাফি : না না, আমার কাছে সেটি একেবারে মনে হয় না। আমি একটি দলীয় সংস্কৃতি তৈরি করতে চেয়েছি। সেখানে কোচ চন্দিকা হাতুরাসিংহের বড় অবদান। আমরা সবাই মিলে দলটিকে নিয়ে আসতে চেয়েছি এক কাতারে। এগুলো আসলে প্র্যাকটিসের ব্যাপার। একজনের ব্যাপারে সবাই হয়তো জানে, ও খারাপ। কিন্তু খারাপ জিনিস না করতে করতে একটা সময় চাইলেও আর সেটি করতে পারবে না। আমরা ঠিক পথে আছি। যদি এই দলীয় সংস্কৃতি পুরোপুরি গড়ে দিয়ে যেতে পারি, তাহলে কাল আমি বাদে অন্য কেউ অধিনায়ক হলেও কিছু হবে না। সংস্কৃতিটা থেকে যাবে। আর তা থাকলে বাংলাদেশ ক্রিকেটও পেতে থাকবে সাফল্য।

প্রশ্ন : গত বছর দেড়েকের কারণে বোলার কিংবা ক্রিকেটার ছাপিয়ে মাশরাফিকে সবাই অধিনায়ক হিসেবেই চেনেন-জানেন। লোকে আপনাকে কিভাবে মনে রাখুক বলে আপনি কী চান?

মাশরাফি : ক্যারিয়ার শেষে নিজেকে আমি কোথাও দেখতে চাই না। কোথায় আছি, কোথায় নেই, কোথায় যাব—এসব নিয়ে আমি ভাবি না। আসলে ২০১১ বিশ্বকাপের পর থেকে প্রতিটি ম্যাচ খেলি শেষ ম্যাচ হিসেবে। আগে বিশ্বের সেরা বোলারদের সঙ্গে লড়াইয়ের স্বপ্ন দেখতাম। এখন ভাবি, আজ ম্যাচ জেতার পথে আমার ছোট্ট একটি অবদান থাকলেও তা গুরুত্বপূর্ণ। সেটি একটি ক্যাচ, একটি উইকেট বা একটি বাউন্ডারি হতে পারে। শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় বাস্তবতা তো বুঝি। এভাবে নিজেকে তৈরি করতে অনেক সময় লাগলেও এখন পেরেছি তো।

প্রশ্ন : শেষ প্রশ্ন। ক্রিকেটার মাশরাফি মানেই তো এখন অধিনায়ক। আর কত দিন বাকি সেই ক্যারিয়ারের?

মাশরাফি : ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে অবসরের ভাবনা ভাবতেই হয়। আমিও ভাবছি। কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি এখনো। তবে এটুকু বলতে পারি, আর বেশি দিন না। আমি খুব তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নেব। সবার যদি আমার প্রতি ধৈর্য থাকে, তাহলে ঠিক সময়েই সরে যাওয়ার ঘোষণা দেব। হয়তো সেটি খুব তাড়াতাড়ি।


মন্তব্য