kalerkantho


নিজেকে ফিরে পেতে মরিয়া সৌম্য

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নিজেকে ফিরে পেতে মরিয়া সৌম্য

ছবি : মীর ফরিদ, কলকাতা থেকে

ধর্মশালার প্রকৃতিতে শীতের দাপট। কলকাতা পুড়ছে আবার চৈত্রের খরতাপে।

একেবারে ভিন্ন কন্ডিশনে মানিয়ে নেওয়াটা একটু কঠিনই ছিল বাংলাদেশ দলের জন্য। কলকাতা থেকে বেঙ্গালুরুতে এসে আবার সে সমস্যা নেই। এখানেও তো সেই গরমেরই রাজত্ব। বাংলাদেশ দল এবার জ্বলন্ত উনুন থেকে উত্তপ্ত কড়াইয়ে এসে পড়ল—এই যা!

কিন্তু সৌম্য সরকারের এই প্রকৃতির রূপবদল নিয়ে ভাবনার সময় কোথায়! ধর্মশালা থেকে কলকাতার উইকেট ছিল ভিন্ন, বেঙ্গালুরুর ২২ গজ প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে আবার অন্য রকম হওয়ার—এসব নিয়েও চিন্তা করতে রাজি নন তিনি। নিজেকে নিয়েই বরং বড্ড ব্যস্ত। বাজে ফর্মের চোরাবালি থেকে বেরোনোর উপায়ই ঘুরপাক খাচ্ছে তাঁর মাথায়, ‘আমি আসলে অন্য কিছু ভাবছি না। ভাবব কেন! দলের কথাও এখন আর সেভাবে মাথায় রাখছি না। আপাতত যেটা ভাবছি, আমি ভালো করলে অবশ্যই দলের জন্য ভালো হবে। চেষ্টা করছি তাই দলকে ভালো কিছু দেওয়ার জন্য।

কাল মধ্যাহ্নের গনগনে সূর্য ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস মাত্রা নিয়ে স্বাগত জানিয়েছে বাংলাদেশ দলকে। অমন টগবগে ফর্ম তো সৌম্য সরকারেরও ছিল। আর তাও এই সেদিনের কথা! গত বছর পাকিস্তানের বিপক্ষে স্ট্রোক ঝলমল সেঞ্চুরি আসে তাঁর ব্যাট থেকে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজ জেতানোর পথে শেষ দুই ম্যাচের ইনিংসগুলো কে ভুলতে পারবেন! কিন্তু ওই সৌম্যই এরপর ইনজুরিতে পড়লেন। এ বছরের শুরুতে জাতীয় দলে ফিরলেও ফর্মে ফিরতে পারেননি এখনো। প্রত্যাবর্তনের পরের ১৩ ম্যাচে কোনো ফিফটি নেই। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে দ্বিপক্ষীয় সিরিজ, এশিয়া কাপ ও বিশ্বকাপের সবগুলো ম্যাচে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের। তাতে ১৭.৪৬ গড়ে মাত্র ২২৭ রান সৌম্যর। চলতি বিশ্বকাপের চার ম্যাচের স্কোর ১৫, ২০, ১২ ও ০। যখন জানবেন, এই ইনিংসগুলোর মধ্যে ‘জীবন’ রয়েছে কয়েকটি—সৌম্যর সংগ্রাম বুঝতে আর অসুবিধা হয় না।

কাল বেঙ্গালুরু বিমানবন্দরে দাঁড়িয়ে অবশ্য ফর্মে ফেরার আশাবাদ প্রবলভাবে ঝরে তাঁর কণ্ঠে, ‘সবাই দেখেছেন, আমার ফর্ম একটু খারাপ যাচ্ছে। চেষ্টা করছি ফর্মে ফিরতে। অনুশীলনে বাড়তি সময় দিচ্ছি। ভুলগুলো কোথায় হচ্ছে, বের করার চেষ্টা করছি। আশা করি সামনের ম্যাচগুলোয় রান পাব। ’ সৌম্যর ওই চেষ্টার পথ কোনটি? মানসিক চেষ্টা ও পরিশ্রম দুটোর কথাই বলেন তিনি, ‘একেকজনের পথ একেক রকম থাকে নিজেকে ফিরে পাওয়ার। অনেকে পরিশ্রম করে, অনেকে চিন্তা করে নিজেকে ফিরে পায়। আমি বোঝার চেষ্টা করছি, কোনটা করা উচিত। আপাতত দুটিই করছি। ’ ভালো সময় ফিরে পেতে ভালো সময়ের ভিডিও দেখছেন তিনি। আর তা কেবল বাংলাদেশ জাতীয় দলের, তা নয়। সেই যে অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে কাতারের বিপক্ষে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন, দুঃসময় ডিঙ্গাতে সেই ইনিংসের ভিডিও পর্যন্ত দেখছেন সৌম্য, ‘ভালো সময়ের ভিডিও সব সময় দেখি। নিজের ভালো ইনিংসগুলোতে যেভাবে খেলেছিলাম, সেটা দেখে এখন পার্থক্যটা বের করার চেষ্টা করছি। সব ভালো ইনিংসই দেখছি। অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে যে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলাম, সেটার ভিডিও পর্যন্ত দেখছি। ’

পাকিস্তানের বিপক্ষে ইডেনের উদ্যানে আরো একটি ইনিংস মাথায় নিয়ে মাঠে গিয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, ঐতিহ্যের এই মাঠ তাঁর সৌভাগ্যের মাঠ, ‘ইডেনে আমার যেটা প্রথম মাথায় এসেছিল, এখানে আগে একটি ম্যাচই খেলেছিলাম পশ্চিমবঙ্গ জুনিয়র দলের বিপক্ষে। ১২৯ রান করেছিলাম তাতে। তাই ভেবেছি, সৌভাগ্যের এই ইডেনে হয়তো আমি ফর্মে ফিরতে পারব। কিন্তু পারিনি। ’ তবে দ্বিতীয় বলে আউট হলেও সৌভাগ্যের মাঠ একেবারে শূন্য হাতে ফেরায়নি সাতক্ষীরার এই তরুণকে। বাউন্ডারি লাইনে মোহাম্মদ হাফিজের যে ক্যাচ ধরেন, সেটি ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতিতে থেকে যাবে অনেককাল। আর এই ক্যাচের প্রশংসা ফিল্ডিং কিংবদন্তি জন্টি রোডস পর্যন্ত করেছেন। ব্যাটে রান না থাকলেও এক দিক দিয়ে তাই ভালো লাগার উপকরণ খুঁজে পাচ্ছেন সৌম্য, ‘ফিল্ডিংয়ে যখন থাকি, সব সময় চেষ্টা করি ভালো কিছু করার। এমন কিছু করার, যেন সবাই দেখে। কাল (পরশু) অমন একটা সুযোগ আসে। ক্যাচটা নিতে পেরে ভালো লেগেছে। আর শুনলাম জন্টি রোডসও নাকি এটি নিয়ে টুইট করেছেন। ’

সৌম্য না হয় ব্যর্থ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের চার ম্যাচেই। বাংলাদেশ তো হারল এই প্রথম। যে কারণে নিজেকে নিয়ে কিছুটা চিন্তা থাকলেও দল নিয়ে কোনো দুশ্চিন্তা নেই তাঁর, ‘বিশ্বকাপের আগের তিনটি আমরা জিতেছি। চার নম্বরটি হারতেই পারি। খারাপ যেতেই পারে একটা ম্যাচ। পরের তিন খেলায় আমরা অবশ্যই চেষ্টা করব ঘুরে দাঁড়াতে। ’ তাতে স্বপ্নের সিঁড়ি নিয়ে যাবে কোন স্বর্গ পর্যন্ত? ‘অবশ্যই সেমিফাইনালে যাওয়া লক্ষ্য’—দৃপ্ত কণ্ঠে বলেন সৌম্য।

সর্বশেষ ম্যাচটি দল হারল যাচ্ছেতাইভাবে। নিজেও অনেক দিন ধরে নেই ফর্মে। তবু সৌম্যর উচ্চারণে কী আত্মবিশ্বাস! বদলে যাওয়া বাংলাদেশ বুঝি এমনই!


মন্তব্য