kalerkantho


এ যেন রান দেওয়ার লড়াই

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



এ যেন রান দেওয়ার লড়াই

দিনটা বাংলাদেশের না হতে পারে, তবে ছিল ফিল্ডার সৌম্য সরকারের। পাকিস্তানের বিপক্ষে ৫৫ রানের বড় ব্যবধানে হেরে যাওয়া ম্যাচে অবিশ্বাস্য এক ক্যাচ নিয়েছেন এই টপ অর্ডার ব্যাটসম্যান। মিড উইকেটে মোহাম্মদ হাফিজের জোরালো শট বাতাসে ভাসতে ভাসতে পেরিয়ে যাচ্ছিল বাউন্ডারি লাইন, সৌম্য অনেকটা লাফিয়ে প্রথমে বলটা আটকালেন, কিন্তু নিজের ভারসাম্য ঠিক রাখতে পারছিলেন না যে তিনি! পড়ে যাবে যাবে অবস্থা, বলটা তাই ছুড়ে মারলেন শূন্যে। এরপর বাউন্ডারি লাইনের ওপার থেকে এপারে এসে মুঠোবন্দি করে আসরের অন্যতম সেরা ক্যাচের তালিকায় নিজের নামটাও লিখে ফেলেন সৌম্য। ছবি : মীর ফরিদ কলকাতা থেকে

আল-আমিন হোসেনের এক নম্বরে। মাশরাফি বিন মর্তুজার দুই নম্বরে।

পাঁচ নম্বরে সাকিব আল হাসানের। তাসকিন আহমেদের আবার এক নম্বরে। আর আরাফাত সানির চার নম্বরে। নিজ নিজ টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে ইকোনমির হিসেবে এই ক্রম। কাল ইডেন গার্ডেন্সের মঞ্চে পাকিস্তানের বিপক্ষে দ্বৈরথেই সেটি হতে হলো!

টি-টোয়েন্টিতে বোলিং সাফল্যের মানদণ্ড যতটা উইকেট শিকারে, এর চেয়ে কোনো অংশে কম নয় রান আটকানোয়। আর সেখানে কাল বাংলাদেশের বোলাররা কী যাচ্ছেতাই রকম ব্যর্থ! এক-দুজন তো না, ব্যর্থতার সেই অন্ধকারে ডুব প্রায় সবার। কুড়ি-বিশের ফরম্যাটের নিজেদের ক্যারিয়ারের বাজে বোলিংগুলোর ছোট্ট তালিকায় থাকবে ইডেন গার্ডেন্সের এই বেধড়ক পিটুনি।

পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের জয়ের মশাল তাই একরকম নিভে যায় সেই প্রথম ইনিংসেই। ব্যাটিং করার সময় বড়জোর প্রদীপের টিমটিমে আলোই ছিল তাদের সম্ভাবনার সম্বল।

বোলারদের মধ্যে খলনায়কের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর প্রার্থীর অভাব নেই। দুই মহারথী মাশরাফি বিন মর্তুজা কিংবা সাকিব আল হাসান এর বড় দাবিদার। শুরুটা অবশ্য আল-আমিন হোসেনের। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে আসেন বোলিংয়ে। দুটি ছক্কা, একটি চার এবং দুই সিঙ্গেলে ওই ওভার থেকে পাকিস্তান তুলে নেয় ১৮ রান। এই যে হোঁচট, সেখান থেকে আর কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারে না বাংলাদেশের বোলিং লাইন। আল-আমিন তো আরো বেশি করে। দ্বাদশ ওভারে ফিরে সাত রান দেওয়াটা তবু ভালো। ১৬তম ওভারে আবার দিয়ে বসেন ১৮ রান। সব মিলিয়ে কাল আল-আমিনের বোলিং বিশ্লেষণ ৩-০-৪৩-০। ওভারপ্রতি ১৪.৩৩। ২২ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে এত খরুচে বোলিং কখনো করেননি এই পেসার। কিছু দিন আগের এশিয়া কাপ ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ১০.৫৮ ইকোনমিই ছিল সবচেয়ে বেশি। তবু তো সেদিন ২.৫ ওভার বোলিং করে একটি উইকেট নিয়েছিলেন!

মাশরাফির অবস্থাই-বা এর চেয়ে ভালো কিসে! কাল ওভারপ্রতি ১৩.৬৬ রান দিয়ে তিন ওভারে ৪১ রান খরচে উইকেটশূন্য তিনি। ৪৬ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে এটি সবচেয়ে বাজে ইকোনমি নয় হয়তো। ২০১৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এই পাকিস্তানের বিপক্ষেই চার ওভারে দেন তিনি ৬৩ রান। ওভারপ্রতি ১৫.৭৫। সেই ম্যাচটি বাদ দিয়ে এই ফরম্যাটে কালই সবচেয়ে খরুচে বোলিং মাশরাফির। কাণ্ডারি এমন দিশাহীন হলে মাঝি-মাল্লা আর দিশা খুঁজে পায় কী করে! কাল বাংলাদেশের ক্রিকেট-জাহাজ পড়ে যায় তাই দুঃসময়ের কালস্রোতে।

অন্ধকারে আলোর ফুল ফোটাতে পারতেন সাকিব। কতবারই তো ফুটিয়েছেন! কিন্তু ক্রমেই যেন তা পরিণত হচ্ছে আরেক জনমের গল্পে। হ্যাঁ, গত ম্যাচে ওমানের বিপক্ষে ৪ উইকেট পেয়েছেন। কিন্তু যে অবস্থায় পেয়েছেন, সে হয়তো পেতে পারতেন সতীর্থ যে কেউ! কারণ ম্যাচে তখন বাংলাদেশের জয় কেবল আনুষ্ঠানিকতার অপেক্ষায়। কাল ক্রিকেটের নন্দনকাননে বরং সাকিবের কাছে প্রত্যাশা ছিল আকাশচুম্বী। কলকাতা নাইট রাইডার্সে খেলার সুবাদে ইডেন গার্ডেন্স তো তাঁর ঘরের মাঠে। সেখানেই কিনা চার ওভারে ৩৯ রান দিয়ে দেন তিনি! উইকেট পান না কোনো, ওভারপ্রতি রানও দুই অঙ্ক ছুঁই ছুঁই—৯.৭৫। এর চেয়ে বাজে ইকোনমি বাংলাদেশের জার্সিতে খেলা ৫১ ম্যাচের মধ্যে আরো চারবার করেছেন তিনি। এ বছর এশিয়া কাপ ফাইনালে ভারত (১৩), ২০১৪ বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া (১২), এ বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচ (১১.২৫) এবং ২০১২ বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডের (১০) বিপক্ষে বল হাতে বিবর্ণ সাকিবের ওই পরিসংখ্যান। ইকোনমিতে সবচেয়ে বাজে পঞ্চকে কাল ঢুকে যায় পাকিস্তানের বিপক্ষে খেলা।

তাসকিন চার ওভারে ৩২ রান দিয়ে ২ উইকেট পান বটে। ওই জোড়া শিকারে হাততালি তাঁর অবশ্যপ্রাপ্য। কিন্তু যদি ইকোনমি হিসাব করেন, তাহলে স্বস্তিতে থাকার উপায় নেই এই পেসারেরও। কাল ওভারপ্রতি যে ৮ রান দেন, এটিই ১৩ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে তাসকিনের সবচেয়ে খরুচে বোলিং। আরো দুইবার অবশ্য ওভারপ্রতি দেন ৮ রান—এ বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে খুলনায় এবং এশিয়া কাপে সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিপক্ষে। কাল দুই উইকেট পেলেও এই ইকোনমি নিশ্চয়ই কিছুটা খচখচানি দেবে তাসকিনকে।

বোলিং অ্যাকশন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার পর বাঁহাতি স্পিনার আরাফাত সানি কাল প্রথম নামেন মাঠে। প্রথম ওভারেই পান শারজিল খানের উইকেট; পরে মোহাম্মদ হাফিজও তাঁর শিকার। কিন্তু ওভারপ্রতি সাড়ে আট রানে চার ওভারে ৩৪ রান দেন তিনিও। ১০ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারে ওভারপ্রতি রান এর চেয়ে বেশি দেন তিনি আর মাত্র তিন ম্যাচে—গত বছর পাকিস্তান (১১.৫০), এ বছর জিম্বাবুয়ে (৯) ও পাকিস্তানের (৮.৭৫) বিপক্ষে।

রইলেন বাকি আর সাব্বির রহমান। তিনি তো পার্টটাইমার। আর কাল ওভারপ্রতি ৫.৫ রান দিয়ে ১১ রান দিয়ে এক শিকারের কৃতিত্ব তাঁর। কৃতিত্বটা আরো বেড়ে যায় সতীর্থ বোলারদের ব্যর্থতার কারণে।

টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে খরুচে বোলিংয়ের দিক দিয়ে কাল এমনই ‘উদার’ বাংলাদেশের বোলাররা। সেই ব্যর্থতার উদাহরণেই তো নিজ নিজ ক্যারিয়ারের হিসাবে কাল আল-আমিন প্রথম, মাশরাফি দ্বিতীয়, সাকিব পঞ্চম, তাসকিন প্রথম, আরাফাত চতুর্থ।

পাকিস্তানের বিপক্ষে এমন মহাগুরুত্ব ম্যাচেই কিনা এমন হলো!


মন্তব্য