kalerkantho


২৬ বছর আগের সেই আতহার

কলকাতা থেকে প্রতিনিধি    

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



২৬ বছর আগের সেই আতহার

: ঘামে ভেজা গ্লাভস খুলে রাখেন পাশে। প্যাড জোড়াও। দীর্ঘ ইনিংস খেলে আসার ক্লান্তি খেলা করে তাঁর চোখে-মুখে। তবে এর চেয়েও বেশি করে খেলে যায় বিষাদের রং। নিজে ভালো খেললে কী হবে, দলকে যে জেতাতে পারেননি আতহার আলী খান!

ঠিক অমন সময় কার যেন ধাক্কায় চমকে ওঠেন। আর সেই চমকটা তাঁর মনের বারান্দায় ফেলে একফালি আনন্দ-রোদ্দুরের আলো। বাংলাদেশ হেরে গেলেও ম্যান অব দ্য ম্যাচের পুরস্কার জেতেন যে আতহার! ১৯৯০ সালের ইডেন গার্ডেন্সের সেই লালচে বিকেলটা তাই স্মৃতির গামারি কাঠে ফ্রেমবন্দি হয়ে আছে স্টাইলিশ এ ব্যাটসম্যানের মনে।

আজ, ২৬ বছর পর আবার যখন ক্রিকেটের নন্দনকাননে খেলতে নামছে বাংলাদেশ, আতহারকে সেই স্মৃতি আলোড়িত না করে পারে!

ভারতেই আছেন তিনি। ধর্মশালার পর্ব শেষে কাল বিকেলে ধারাভাষ্য দিচ্ছিলেন বেঙ্গালুরুতে। সেখান থেকে টেলিফোনে নব্বইয়ের স্মৃতি উসকে দিতেই আতহারের কণ্ঠ তিরতির করে কেঁপে ওঠে আনন্দে, ‘অবশ্যই আমার জীবনের বড় অর্জনগুলোর মধ্যে এটি থাকবে। তখন বাংলাদেশ ক্রিকেট যে অবস্থায় ছিল, তাতে করে কারো ম্যান অব দ্য ম্যাচ হওয়ার কথা আমরা ভাবতেই পারতাম না। ’ প্রত্যাশা ছিল না বলেই প্রাপ্তির আনন্দটা আরো বেশি তাঁর, ‘মন খারাপ করে মাঠের পাশে বসে ছিলাম। আমি রান করলেও দল তো হেরে গেছে! আর শ্রীলঙ্কার ডি সিলভা ও রানাতুঙ্গা দারুণ দুটো ইনিংস খেলে। ম্যাচসেরা হওয়ার কথা তাই মাথাতেই আসেনি। কেউ একজন যখন বলল যে ম্যান অব দ্য ম্যাচ আমি—সত্যি চমকে গেছি। অবশ্যই সেটি আনন্দের চমক। ’

চমক তো বটেই। আগে ব্যাটিং করে শ্রীলঙ্কা সেদিন করে ৪৫ ওভারে ৪ উইকেটে ২৪৯। অরবিন্দ ডি সিলভা ৬০ বলে ৮৯ রান করে আউট। ৬৪ বলে ৬৪ রানে অপরাজিত রানাতুঙ্গা। আড়াই শ রানের লক্ষ্যে নামা বাংলাদেশ ৯ উইকেটে ১৭৮ রানের বেশি করতে পারে না। এর মধ্যে অপরাজিত ৭৮ রান ৪ নম্বরে নামা আতহারের। আর ৯৫ বলে খেলা এ ইনিংসেই ম্যাচসেরার পুরস্কার তাঁর।

এতটা যে হবে শেষ পর্যন্ত, শুরুতে তা ভাবেননি। তবে ভালো ব্যাটিংয়ের আত্মবিশ্বাস ম্যাচ মাঠে গড়ানোর আগে থেকেই ছিল। স্মৃতির সরণিতে হেঁটে কাল সেই দাবিই করেন আতহার, ‘ম্যাচের আগে অনুশীলনের সময় একটি বল কাট করি। সেটি গড়াতে থাকে, গড়াতেই থাকে। এমন মসৃণ আউটফিল্ডে তো আমরা কখনো খেলিনি। তখনই মনে হলো, এখানে ভালো কিছু করা সম্ভব। আর আগের ম্যাচে ফারুক আহমেদের সঙ্গে আমার এক শ’র বেশি রানের জুটি হয়েছিল। সে কারণেও আত্মবিশ্বাস ছিল অনেক। ’ হ্যাঁ, ভারতের বিপক্ষে চণ্ডীগড়ের সেই খেলায় তৃতীয় উইকেটে ১০৮ রান জুড়ে দেন ওই দুজন। ফারুকের ৫৭-র সঙ্গে আতহারের ৪৪ রান। পরের খেলায়ও সে ফর্ম টেনে নেন পরের জন। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২ উইকেট পড়ার পর ক্রিজে গিয়ে আত্মবিশ্বাসের উপাদান পেতে দেরি হয় না আতহারের, ‘ওদের বাঁহাতি স্পিনার ডন অনুরাসিড়ির বলে আমি ছোট্ট করে পুশ করি। বিশ্বাস করুন, তাতে অমন কোনো পাওয়ার ছিল না। কিন্তু টাইমিংটা এত ভালো হলো যে সেটি একেবারে ছক্কা। খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে তিনটি ছক্কা মেরে দিই। ’ তাঁর ওই রুদ্রমূর্তিতে প্রতিপক্ষ অধিনায়কের কোণঠাসা হওয়াটাও ভোলেন না তিনি। এখনো সেই স্মৃতি রোমন্থনে তাই তৃপ্তির হাসি তাঁর, ‘মনে আছে, আমার ওই ছক্কা মারা দেখে রানাতুঙ্গা শ্রীলঙ্কার বোলারদের নেতিবাচক বোলিং পর্যন্ত করতে বলেছিল। ওরা শুরু করে লেগ সাইড দিয়ে বোলিং। ’ কিন্তু তাতেও তো আটকানো যায় না প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে আতহারের ম্যাচসেরা হওয়ার অর্জনের সৌধ গড়া!

সেই টগবগে তারুণ্যে ইডেনের প্রেমে পড়াটা এখনো ভোলেন না তিনি। আড়াই দশকের বেশি সময় অনেক কিছু কেড়ে নিলেও ওই স্মৃতিটা ভুলিয়ে দিতে পারে না আতহারকে, ‘ইডেনে ঢুকেই মনে হয়, কত্ত বড় মাঠ! আর কী সুন্দর! এখানে ভালো কিছু করার প্রতিজ্ঞা করি তখনই। ’ সেই প্রতিজ্ঞায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে সফল হলেও দল পারেনি। আজ ২৬ বছর পর উত্তরসূরিরা সেই হাহাকারের আগুনে পানি দিতে পারবেন বলে আশাবাদী আতহার, ‘আমরা জিততে পারিনি। এবার দেখবেন, বাংলাদেশ ঠিকই পাকিস্তানকে হারিয়ে দেবে। জিতলে তো আমাদের কেউই হবে ম্যান অব দ্য ম্যাচ। ধারাভাষ্যকার হিসেবে ওই সময়ের সাক্ষীটা আমি খুব করে হতে চাই। ’

সেই স্বপ্নটা বুকে নিয়েই তো আজ বেঙ্গালুরু থেকে কলকাতা উড়ে আসছেন আতহার আলী খান। উত্তরসূরিদের দায় এখন তাঁর আক্ষেপ ঘোচানোর। পারবেন না তাঁরা?


মন্তব্য