kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


স্মৃতিস্তম্ভে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



স্মৃতিস্তম্ভে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ

আকাশের বাড়িতে অতিথি হয়ে আসে মেঘ। অল্প সময়ের জন্যই আসে, বেশির ভাগ সময় দূরে কোথাও অদৃশ্য হয়ে যাওয়াই দস্তুর। কিন্তু ধর্মশালার আকাশে মেঘ যে গেঁড়ে বসেছে অনাহূত অতিথির মতো! চাইলেও যাকে আর তাড়ানো যাচ্ছে না। দিন কেটে যায় বৃষ্টিতে, কাটে রাত। পরদিন সকালে আবার ঘুম ভাঙে সেই বৃষ্টির শব্দে।

ক্রিকেট-বিরক্তির কারণ হয় তা। একই রকমভাবে ধর্মশালার শহরের নবাগতদের ভারী হয় মন। তবু যেমন ক্রিকেট দমিয়ে রাখা যায় না, তেমনি এই পাহাড়ি জনপদের আঁকবাঁক দেখাটাও কি আর থেমে থাকে! আকাশের বাড়িতে মেঘের অনাহূত অতিথি হয়ে থাকা, প্রায়শ তার বৃষ্টি ঝরানোও দমিয়ে রাখতে পারে না যা।

কাল সকালে বৃষ্টি মাথায় নিয়েই তাই বাংলাদেশের সাংবাদিকদের একটি দল বেরিয়ে পড়ে। মাশরাফি বিন মর্তুজার দলের ম্যাচ তো রাতে। দিনের প্রথমভাগ কাজে লাগানোর জন্য এদিক-সেদিক বেরিয়ে পড়া। আর তাতে সৌন্দর্যের নানা আবিষ্কার তো থাকেই, সঙ্গে স্থানীয়দের ইতিহাস-ঐতিহ্য-গর্বের নানা বিষয়ের সঙ্গেও হয়ে যায় পরচিয়।

ধর্মশালা শহরের ভেতরে ঢোকার মুখে থাকা ‘যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ’ যেমন। হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের যে মাঠে বাংলাদেশ দল লড়ছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাই পর্বে, সেখান থেকে তা দূরে নয় খুব। আবার বাংলাদেশের মানুষের হূদয়ের কাছাকাছিও সেই স্মৃতিস্তম্ভ। কেন? ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে যেসব ভারতীয় সৈনিক মারা যান, তাঁদের নামও তো খোদাই করা রয়েছে সেখানে! কালো মার্বেল পাথরে জ্বলজ্বলে হরফে। কাল দুপুরে সেখানে যখন গিয়ে উপস্থিত আমরা, তখন বৃষ্টি পড়ছে অঝোরে। সেটিকে তখন আর আকাশের অনাহূত অতিথি মেঘের বিরক্তিকর কাণ্ড বলে মনে হয় না। মনে হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের প্রতি আকাশের শ্রদ্ধা। তাঁদের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের কৃতজ্ঞতার কান্না।

এমন নয় যে, ওই যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভে শুধু ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে শহীদ হওয়া ভারতীয় সেনাদের নাম রয়েছে। ১৯৪৭-৪৮, ১৯৬২, ১৯৬৫ সালের ভারতের বিভিন্ন যুদ্ধে মারা যাওয়া সৈন্যদের উপস্থিতি সেখানে। আকাশছোঁয়া পাইনগাছের বনের ভেতর এই স্মৃতিস্তম্ভ। বৃষ্টির কারণে কাল হয়তো স্থানীয় দর্শনার্থীদের ভিড় তেমন ছিল না। কিন্তু অন্য সময়টা নিশ্চয়ই তেমন না। নিজ দেশের যুদ্ধে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা কি আর জানায় না ধর্মশালার অধিবাসীরা!

এর আগে সাত সকালে অবশ্য দর্শন মিলেছে দালাই লামার। দর্শন বলতে কিছুটা দূরত্ব থেকে চর্মচক্ষে দেখা। ধর্মশালায় পা রেখেই ওই তিব্বতের ধর্মগুরুর বাসভবন ঘুরে আসা হয়েছে। তিব্বতিয়ানদের কাছে দালাই লামা যে কতটা, এ কদিন শহরে থেকে সেটি বোঝা গেছে বেশ। তবে সেই বোঝা যে আসলে সামান্য—বোঝা গেল কাল। নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী এই মহান ধর্মগুরু বেশ কিছুদিন ধরে নেই ধর্মশালায়। সফরে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে। কাল সকালে ফিরলেন পরদেশে নিজ ভুবনের নিজ বাসিন্দাদের মাঝে। হোটেল রুমের বারান্দায় দাঁড়িয়েই চোখে পড়ে রাস্তার পাশে সার দিয়ে থাকা বিশাল লাইন। শুরুতে মনে হয়, ১০ মার্চের ‘তিব্বতিয়ান আপরাইজিং ডে’র মতো কালও তেমন কোনো উপলক্ষ কিনা। কিন্তু পরে দেখা গেল তিনি আসছেন। সাদামাটা এক গাড়িতে ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে আছেন। খোলা গ্লাসে দেখা যায় তাঁর হাতজোড় মূর্তি। আর দালাই লামা যখন পেরিয়ে যান সে জায়গা—ওখানকার সব তিব্বতিয়ানের করজোড়ে নোয়ানো মাথা। উদ্বাস্তু এক জাতির স্বাধীনতার স্বপ্ন আবর্তিত যাঁকে ঘিরে, তাঁকে এমন মান্য না করলে চলে!

নাড্ডিতে গিয়ে হিমালয়ের বরফদর্শন হলো খুব কাছ থেকে। ‘সেন্ট জন ইন দ্য ওয়াইন্ডারনেস’ নামে ১৬৪ বছর আগে নির্মিত চার্চ। ‘ডাল লেক’ নামে ছোট্ট দীঘি নিয়ে ওদের কী গর্ব! আরো ছোট্ট চা বাগান নিয়েও। তবে বৃষ্টিভেজা দিনে এসব জায়গা ঘুরে দেখলে মাথায় ঘুরপাক খায় কেবল ওই দুটি জিনিস। তিব্বতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা দালাই লামা দর্শন এবং ‘যুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ’তে থাকা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে ভারতীয় শহীদদের খোদাই করা নাম।

দুই দেশের দুটি স্বাধীনতা আন্দোলন তাতে কিভাবেই না মিলে যায় একই মিছিলে!


মন্তব্য