kalerkantho


তামিমের আরেক রূপকথা

১৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তামিমের আরেক রূপকথা

টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের হয়ে প্রথম সেঞ্চুরির সঙ্গে এক হাজার রানও হয়ে গেল তামিম ইকবালের

প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন চন্দিকা হাতুরাসিংহেকে। বলেছিলেন, ‘বিশ্বকাপে তোমায় আমি একটি সেঞ্চুরি উপহার দেব।

’ কিন্তু এমন কত অঙ্গীকারই তো মিলিয়ে যায় সময়ের হাওয়ায়! কথা দিয়ে কথা না রাখার অগুনতি উদাহরণ দেখা যায় কালের বাইনোকুলারে চোখ রাখলে। তবে তামিম ইকবাল ঠিকই রক্ষা করেন প্রতিশ্রুতি। তাতে শুধু টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নয়, এই ফরম্যাটেই প্রথম সেঞ্চুরিয়ান পায় বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ ক্রিকেট পরিক্রমায় ১৩ মার্চ তারিখটি তাই আলাদা উল্লেখের দাবি রাখবে সব সময়।

কুড়ি-বিশের ফরম্যাটে লাল-সবুজের প্রতিনিধিদের পথচলা কম দিনের না। সেই ২০০৬ সালের ২৮ নভেম্বর থেকে শুরু। মহাকালের পঞ্জিকায় ১০ বছর পেরোতে চলল; ম্যাচের হিসাবে পেরিয়ে যায় ৫৭ ম্যাচ। কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে একজন সেঞ্চুরিয়ানের অপূর্ণতার সেতু আর পাড়ি দিতে পারে না বাংলাদেশ। তামিম যেন তাই পূর্বসূরি-সতীর্থদের দায় তুলে নেন নিজের কাঁধে।

জাতীয় দলের কোচকে দেন অমন সাহসী প্রতিশ্রুতি! কাল সেই প্রতিশ্রুতি পূরণের মুহূর্তে যে ড্রেসিংরুমের সামনে দাঁড়ানো হাতুরাসিংহেকে ইঙ্গিত করে তা উদ্যাপন করেন তামিম—তাতে আর আশ্চর্য কী!

কালকের আগ পর্যন্ত পারেননি কেউ—ঠিক আছে। কিন্তু কেউ পারলে যে তামিমই পারবেন—এ নিয়েও তো বাজির পাল্লা ভারী হচ্ছিল ক্রমশ! টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের আগের সর্বোচ্চ স্কোর তাঁর দখলে থাকাটা এক কারণ। ২০১২ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে সেই অপরাজিত ৮৮ রান। আরো বড় কারণ চলতি টুর্নামেন্টে এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যানের ফর্ম। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে প্রথম খেলায় আবারও পুরো ২০ ওভার ব্যাটিং করেন তিনি। ৮৩ রানে থাকেন অপরাজিত। এরপর সংবাদ সম্মেলনে এসে বলে যান, সেঞ্চুরির কথা নাকি সেভাবে ভাবেনইনি। কিন্তু তামিম না ভাবলেও ক্রিকেট-বিধাতা ভেবে রাখেন ঠিক। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে তাঁর বিস্ফোরক ৪৭ রান ওই ভাবনার পালে জোগায় হাওয়া। আর কাল সেই হাওয়ায় ভেসে তামিম উড়ে যান অবিশ্বাস্য অর্জনের আকাশে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের আরো একটি ‘প্রথম’-এ অমোচনীয় কালিতে লেখা হয়ে যায় ডাকাবুকো এই ওপেনারের নাম।

আর সেটি করলেন কোন ম্যাচে? যেখানে ঝুলে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ স্বপ্ন। যে ম্যাচে হারলে পাততাড়ি গোটাতে হবে টুর্নামেন্ট থেকে। কিন্তু তামিম তা হতে দেন কী করে! ওপেনিং সঙ্গী সৌম্য সরকার ধোঁকেন। অন্য প্রান্ত থেকে ভরসা দেন তিনি। দলের অভিজ্ঞ দুই ব্যাটসম্যান সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমের বাজে ফর্মের চক্করে পড়ায় দুশ্চিন্তায় টিম ম্যানেজমেন্ট। তাঁদের কপালের ভাঁজকে বলিরেখা হতে দেন না তামিম। স্থির প্রতিজ্ঞায় অবিচল থেকে ঠিকই বাংলাদেশকে নিয়ে যান ওমানের ধরাছোঁয়ার বাইরে। আর নিজের ব্যাটে লিখে ফেলেন বাংলাদেশ ক্রিকেট রূপকথার আরেক অধ্যায়।

কাল ব্যাট থেকে তাঁর প্রথম রান আসে পঞ্চম বলে। অষ্টম বলে প্রথম চার। রয়েসয়ে এই শুরুর পর হাত খুলতে সময় নেননি খুব একটা। পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার পরের ওভারে টানা দুই বলে চার-ছক্কা। দশম ওভারের এক বাউন্ডারির পরের ওভারে আবার দুটো। কাট করেন তামিম, ফিল্ডার নড়ার সময় পান না। কাভার ড্রাইভ মারেন, প্রতিপক্ষও যেন কুর্ণিশ করে এর সৌন্দর্যের। আমির কালিমকে ফাইন লেগ দিয়ে মারা বাউন্ডারিতে ফিফটিতে পৌঁছেন মোটে ৩৫ বলে। তৈরি হয়ে যায় আরো বড় বিস্ফোরণের মঞ্চ। পরের বলটি ছক্কা মেরে যেন সে বার্তাই ভাষণের সুরে দেন তামিম!

ফর্মের শিখরে থাকা এমন ব্যাটসম্যানকে রোখার সাধ্যি কার!

ওমানের অসহায় বোলাররা পারেননি। বাঁহাতি স্পিনার অজয় লালচিতাকে চার মারার পরের বলে তামিম বেরিয়ে এসে আছড়ে ফেলেন লং অনের ওপারে। লেগ স্পিনার খাওয়ার আলীকে হাঁটু মুড়ে যে ছক্কা মারেন, তাতে তো বলের ডানা গজানোর দশা। মাঠ পেরিয়ে, গ্যালারি ছাড়িয়ে পাশের হিমালয় চূড়ায় যেন যাওয়ার সাধ। আরো এক ছক্কায় তামিম ঢুকে যান নব্বইয়ের ঘরে। বাংলাদেশ ক্রিকেটের রুদ্ধশ্বাস অপেক্ষা তখন রোমাঞ্চকর সমাপ্তির প্রতীক্ষায়। টি-টোয়েন্টিতে প্রথম সেঞ্চুরিয়ানকে বরণ করা বলে কথা!

৯৭ রানের সময় পর পর তিন বলে রান নিতে পারেন না তামিম। নড়বড়ে নব্বই? ধুর, পরের বলেই কাভার দিয়ে মারা বাউন্ডারিতে ঠিকই তো পৌঁছে যান অনন্য উচ্চতায়। ১০ চার ও পাঁচ ছক্কায় ৬০ বলে স্পর্শ করেন সেঞ্চুরির মাইলফলক। আর ইনিংস শেষে অপরাজিত ৬৩ বলে ১০৩ রান করে।

কথা দিলে কিভাবে কথা রাখতে হয়—ক্রিকেট দুনিয়াকে কাল অন্তত সেটি দেখিয়ে দিলেন তামিম ইকবাল।

 


মন্তব্য