একজন কিউরেটর ও তাঁর একটি হ্যাট-335351 | খেলা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

সোমবার । ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১১ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৩ জিলহজ ১৪৩৭


একজন কিউরেটর ও তাঁর একটি হ্যাট

ডায়েরি, নোমান মোহাম্মদ   

১৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



একজন কিউরেটর ও তাঁর একটি হ্যাট

আরে, এ যে ক্লেভিস ফের্নান্দেসের জাতিস্মর!

ব্রাজিল ফুটবল দলের বিখ্যাত সমর্থক ফের্নান্দেস। গ্যালারিতে বসে দেখেছেন সাত-সাতটি বিশ্বকাপ। ২০১৪ আসরের সেমিফাইনালে জার্মানির কাছে হারের পর বিশ্বকাপের রেপ্লিকা আঁকড়ে ধরে তাঁর বোকা কান্নার ছবি ছুঁয়ে যায় সারা বিশ্বের ব্রাজিল সমর্থকদের হূদয়। গত বছরের সেপ্টেম্বরে পৃথিবী ছেড়ে অন্যলোকে পাড়ি জমানো ফের্নান্দেস কাল যেন ফিরে এলেন ধর্মশালার ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। এখানকার কিউরেটর সুনীল চৌহানকে দেখলে হঠাৎ যে ফের্নান্দেস ভেবে চমকে যেতে হয়!

প্রৌঢ়ত্বে পৌঁছানো ভারী শরীর। ইয়া মোটা পাকালো গোঁফ। চৌহানের মাথার ওপর ফের্নান্দেসের মতো কাউবয় হ্যাটও তো রয়েছে। আর এই হ্যাটই যেন দুই ভুবনের, দুই খেলার, দুই পেশার, দুজন মানুষকে আরো বেশি করে মিলিয়ে দেয় অভিন্ন মোহনায়। ফের্নান্দেসের হ্যাটে ছিল বিশ্বকাপ ট্রফি, ব্রাজিল ফুটবল দলের লোগো, গিটার—এমনি নানা জিনিসের ‘এমব্লেম’। আর চৌহানের কাউবয় হ্যাটে কলমের কালিতে আঁকা ক্রিকেট-কিংবদন্তিদের অটোগ্রাফ। সুনীল গাভাস্কার থেকে রিচি রিচার্ডসন। শচীন টেন্ডুলকার থেকে অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। ভিভিএস লক্ষ্মণ, অনিল কুম্বলে, বীরেন্দর শেবাগ, মাইকেল হোল্ডিং, রবি শাস্ত্রী, ইয়ান বিশপ, মহেন্দ্র সিং ধোনি, এবি ডি ভিলিয়ার্স, হাশিম আমলা, মাখায়া এনটিনি, মোহাম্মদ কায়েফ, চামিন্ডা ভাস—ক্রিকেট ইতিহাসের জ্বলজ্বলে সব নামের উজ্জ্বল উপস্থিতি সেখানে। ধর্মশালা স্টেডিয়ামে পা পড়া কিংবদন্তিদের সই নিজের হ্যাটে পরম যত্নে যে নিয়ে রাখেন চৌহান!

আর সেখানে অন্যদের সঙ্গে আলো ছড়ায় বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার স্বাক্ষরও। আজ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের শেষ ম্যাচ খেলে ধর্মশালা ছাড়ার আগে সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবালের সই নেবেন বলে হাসিমুখে জানান চৌহান।

ভদ্রলোক আগে ছিলেন হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের অফিস বিয়ারার, পরে অ্যাডমিন ম্যানেজার। ৯-১০ বছর ধরে কাজ করছেন কিউরেটর হিসেবে। কাল মেঘে ঢাকা আকাশের নিচে ধর্মশালার মাঠে দাঁড়িয়ে চৌহান শুরুতে জানান এই হ্যাটপ্রাপ্তির ইতিহাস। তাতে কী গভীর মমতার এক গল্পই না লেখা, ‘টুপিটা আমার মেয়ে অপূর্বা দিয়েছে। ও বলল, বাবা, তুমি সারা দিন মাঠে কাজ করো। এটি মাথায় থাকলে রোদে কষ্ট কম হবে।’ সেই হ্যাটে কিংবদন্তিদের অটোগ্রাফ নেওয়ার ধারণা মাথায় এলো কিভাবে, জিজ্ঞেস করতেই তাঁর সহাস্য উত্তর, ‘ধারণাটি তো মাথা থেকে আসেনি। এসেছে হূদয় থেকে। এখানে যত ক্রিকেট-কিংবদন্তি আসবেন, সবার অটোগ্রাফ নিয়ে রাখতে চাই।’

শুরুটা করেছেন শচীন টেন্ডুলকারকে দিয়ে, চৌহান যাকে বর্ণনা করেন ‘কিংবদন্তিদের কিংবদন্তি’ হিসেবে, ‘শুরুর জন্য শচীনের চেয়ে ভালো আর কে হতে পারে! মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে আইপিএলের ম্যাচে আসে যখন তখন অটোগ্রাফ নিই। ও তো খুব বেশি কথা বলে না। তবে এখানকার উইকেট-মাঠের প্রশংসা করে খুব।’ ওয়েস্ট ইন্ডিজের ব্যাটিং গ্রেট রিচি রিচার্ডসনের সই নেওয়ার সময়ও নাকি একই ঘটনা, ‘রিচি এসেছিল ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলের ম্যানেজার হিসেবে। উইকেট দেখে বলছিল, ওর নাকি আবার ব্যাটিং করতে নেমে পড়তে ইচ্ছে করছে। দুর্দান্ত ব্যাটসম্যান ছিল। আমি মনে করি ভিভ রিচার্ডসের পর ক্যারিবিয়ানদের মধ্যে সেরা।’

চৌহানের কাউবয় হ্যাটের অনেকটা জায়গা বাকি এখনো। সেগুলো খুব দ্রুত ভরে উঠবে বলে আশা তাঁর, ‘এখন আমি অপেক্ষায় আছি কপিল দেব, ওয়াকার ইউনুস, ওয়াসিম আকরাম, রাহুল দ্রাবিড়, ভিভ রিচার্ডসদের। ওরা এখানে এলেই অটোগ্রাফ নিয়ে নেব। ভিভ অবশ্য একবার দিল্লি ডেয়ারডেভিলসের মেন্টর হিসেবে এসেছিল। কিন্তু তখন ও এবং আমি—দুজনই এত ব্যস্ত ছিলাম যে সই নেওয়া হয়নি।’ হোল্ডিং-বিশপ-রিচার্ডসনরা থাকলেও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বর্তমান প্রজন্মের কোনো ক্রিকেটারের স্বাক্ষর তাঁর হ্যাটে নেই। কেন? চৌহানের সহাস্য উত্তর, ‘এখানে সই করার যোগ্যতায় ওরা পাস করতে পারেনি।’

যোগ্যতার সেই মানদণ্ডে উতরেছেন মাশরাফি। বাংলাদেশ অধিনায়কের অটোগ্রাফ আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের দিন নেন বলে জানান তিনি, ‘ওর কাছ থেকে কাল (পরশু) অটোগ্রাফটি নিলাম। মর্তুজা ভালো মানুষ, মাথার ওপরে ঠাণ্ডা মাথা, দারুণ অধিনায়ক—এটি অনেক দিন ধরে খেয়াল করছি।’ বাংলাদেশের আরো দুজনের অটোগ্রাফও বিখ্যাতদের পাশে ঠাঁই পাবে বলে আশা করছেন চৌহান, ‘সাকিব ও তামিমের অটোগ্রাফও নেব। ওরা ধর্মশালা ছাড়ার আগেই নেব।’

চৌহানের হ্যাটের কিছু জায়গা বাকি এখানো। সেগুলো কিংবদন্তিদের স্বাক্ষরে ভরে ওঠার পর ভেতরের অংশও খালি রাখতে চান না। কিন্তু একটা সময় তো হ্যাটের জায়গা ফুরিয়েই যাবে! এরপর? পরিকল্পনা করা আছে সুনীল চৌহানের, ‘আমাদের এই ধর্মশালায় একটি ক্রিকেট-জাদুঘর হচ্ছে। ওরা যদি চায়, আমার হ্যাটটি সেখানে দিয়ে দেব।’

কে জানে, ব্রাজিলের বিখ্যাত ফুটবল সমর্থক ক্লেভিস ফের্নান্দেসের কাউবয় হ্যাটটিও হয়তো ভবিষ্যতে ঠাঁই পাবে কোনো ফুটবল-জাদুঘরে!

মন্তব্য