মহাকালের আর মহাকাব্যের সাক্ষী-334988 | খেলা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১২ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৪ জিলহজ ১৪৩৭


মহাকালের আর মহাকাব্যের সাক্ষী

ডায়েরি, নোমান মোহাম্মদ   

১২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মহাকালের আর মহাকাব্যের সাক্ষী

এখানেই একদিন বেজে ওঠে দুন্দুভি। পাশের হিমালয় কেঁপে ওঠে কামানের গর্জনে। তলোয়ারের ঝনঝনানিতে বয়ে যায় রক্তের নহর। উপত্যকার সবুজ বেয়ে দু’পাশের মাঝি ও বেন গঙ্গা নদীর পানিতেও হয়তো পড়ে লাল লাল ছোপ। কত আক্ষেপ, কত হাহাহার, কত বিলাপ, কত মৃত্যুগোঙানির যন্ত্রণা আঁকা এখানকার কালের খাতায়!

আর মহাকালের সেই মহাকাব্যের সাক্ষী হয়ে এখনো তো গর্বিত ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে কাংড়া দুর্গ!

ধর্মশালা থেকে দূরত্বটা ২০ কিলোমিটারের। রীতিমতো দুর্গম এক পাহাড়ি এলাকায় এই দুর্গ। কাল সাতসকালে সেখানে গিয়ে যখন উপস্থিত বাংলাদেশি একদল সাংবাদিক, তখনো ঠিকমতো আড়মোড়া ভাঙেনি শহর। আকাশের মুখ গোমড়া। টিপ টিপ বৃষ্টি থেমেছে কেবল। কনকনে শীতের সেই প্রভাতে কাংড়া দুর্গ আমাদের নিয়ে যায় ইতিহাসের আশ্চর্য সব বাঁকে। ভারতের সবচেয়ে পুরনো দুর্গ যখন এটি, ইতিহাসের ঐশ্বর্যও এর সবচেয়ে বেশি হওয়ার কথা।

দুর্গের চূড়ায় দেখা হওয়া প্রৌঢ় শক্তি চন্দ্রের কথাটি তবু চমকে দেয়, ‘মহাভারতে এই দুর্গের কথা উল্লেখ রয়েছে। এখান থেকে রাজা সুসর্ম চন্দ্র যুদ্ধ করতে যান পাণ্ডবদের বিপক্ষে।’ চমকে গেলেও বিশ্বাস হয়নি। নিজেদের অতীতকে রঙিন করতে অমন কত মনগড়া কথাই তো বলেন স্থানীয়রা! কিন্তু খোঁজখবর করে জানা যায়, ঘটনা সত্যি। খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ সালে রাজা সুসর্ম এখান থেকেই যান পাণ্ডবদের বিপক্ষে যুদ্ধ করতে। শুধু তা-ই নয়, আলেকজান্ডার দ্য গ্রেটের যুদ্ধ-তালিকায়ও উল্লেখ রয়েছে কাংড়া দুর্গের। খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ সালে এখানকার রাজা পরমানন্দ চন্দ্র যুদ্ধ করেন ওই মহাবীরের বিপক্ষে। কাল আকাশের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে তাই আর মেঘ-সূর্যের লুকোচুরি মনে চাঞ্চল্য জাগাতে পারে না তেমন। বরং মহাবীর  আলেকজান্ডারের অশরীরী উপস্থিতির রোমাঞ্চ ছড়িয়ে পড়ে মনজুড়ে।

ঢুকতে হয় ছোট্ট গেট দিয়ে। এরপর পাহাড়ের ওপরে যেন পাহাড়জুড়ে ছড়িয়ে কাংড়া দুর্গ। বিভিন্ন অংশে দেখা মেলে আমিরি দরজা, জাহাঙ্গীরি দরজার। গঙ্গা ও যমুনা দেবীর মূর্তি মূর্তমান দর্শিনী দরজার দু’পাশে। দর্শনীয় জিনিসের অভাব নেই কোনো। কিন্তু বর্তমান ছাপিয়ে সেই দূর অতীতটাই যেন সামনে চলে আসে বারবার। ১০০৯ সালে এই কাংড়া দুর্গ গজনীর মাহমুদের দখল করা, ১৩৩৭ সালে মুহাম্মদ তুঘলক এবং ১৩৫১ সালে ফিরোজ শাহর পদানত হওয়া। তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য সেটি দখল করে রাখতে পারেন না কেউ। মুঘল সম্রাট আকবরও না। তাঁর সন্তান জাহাঙ্গীর ১৬২২ সালে অবশেষে দখলে নেন দুর্গ। ৫৬ বার ব্যর্থ চেষ্টা এবং ১৪ মাস পেরিয়ে যাওয়ার পর। ইতিহাসের দুরবিনে চোখ রাখলে কাল সকালে মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীরও তাই চলে আসেন কাছে।

এরপরই রাজা শামসার চন্দ্রের বীরত্বের পর্ব। মুঘল সাম্রাজ্যের ক্ষয়িষ্ণুকালে ১৭৮৬ সালে পূর্বসূরিদের এই দুর্গ আবার দখল করেন তিনি। কাংড়া রাজপুত পরিবারের রক্তের ঋণ তাতে শোধ হয় যেন। রাজা ভূমি চন্দে র হাত ধরে যে কাংড়া সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা নাকি খ্রিস্টপূর্ব ৪৩০০ সালে; একই সময়ে মিসরে তৈরি হচ্ছিল পিরামিড। ইতিহাসের এই পাঠ দুর্গের পাশের জাদুঘর থেকে পাওয়া।

তবে ওই জাদুঘরে যাওয়ার আগে দুর্গে প্রবেশ করতে শুরু করেন এক-দুজন করে পর্যটক। একসঙ্গে পাওয়া যায় ১৯ ইউরোপিয়ানের দল। পেশাগত জীবন থেকে অবসরের পর জীবন সায়াহ্নে তাঁরা ঘুরে বেড়াচ্ছেন পৃথিবী। এঁদেরই দুজন ইংল্যান্ড থেকে আসা লিওন-জেয়স দম্পতি। একদার ডিজাইনিং ইঞ্জিনিয়ার ও একদার শিক্ষকের এখন অখণ্ড অবসর। কাংড়া দুর্গের বিশালত্ব-বৈচিত্র্য, এর ইট-পাথরের কারুকাজে মুগ্ধ তাঁরা। ‘পুরনো দিনের এমন স্থাপনায় আমাদের আগ্রহ ব্যাপক। ইউরোপের প্রায় সব দেশেই তো ঘুরেছি। সেখানে এমন দুর্গের অভাব নেই। সেগুলোর চেয়ে সুন্দর বলব না কাংড়া দুর্গকে, তবে ভারতীয় বলে রোমান্টিসিজমের একটি ব্যাপার মিশে আছে এর সঙ্গে’—মুগ্ধতার সঙ্গে বলে চলেন জেয়স। আর বিশ্বকাপ কাভার করতে এসেছি শুনে লিয়ন মহা উত্তেজিত, ‘আমি ক্রিকেট যে খুব অনুসরণ করি, তা নয়। কিন্তু স্পোর্টস পছন্দ করি খুব। সবচেয়ে ভালো লাগে সাইক্লিং। এরপর ফুটবল। ইংল্যান্ডে আমার বাড়ির পাশের ক্লাব মিডলস ব্রোর অবস্থা অবশ্য এখন বেশ খারাপ। আর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তোমাদের দেশ বাংলাদেশের প্রতি আমাদের শুভকামনা রইল।’

দুর্গের পাশের পাহাড়ে কাংড়া জাদুঘর। এর স্বত্বাধিকারী সেই সাত হাজার বছরের পুরনো রাজপরিবার। জাদুঘরে আছে রাজদণ্ড, ময়ূরপাখা, মুদ্রা, স্ট্যাম্প। রয়েছে রাজা-রানিদের পোশাক, তৈজসপত্র, দুরবিন, রুপার পালঙ্ক। একটি রুমজুড়ে আছে শুধু যুদ্ধাস্ত্র— বন্দুক, তলোয়ার, চাকু, ঢাল, শিরোস্ত্রাণ। বর্তমান রাজা আদিত্য দেব চন্দ্রের ছবিও দেখা গেল সেখানে; দালাই লামার সঙ্গে। ‘২০১০ সালে জাদুঘরের উদ্বোধনের ছবি এটি’—বলে এখনকার রাজপরিবারের কথাও বলেন জাদুঘরের কর্মকর্তা বিএস জাওয়াল, ‘এখন তো আর আগের দিন নেই। তবে রাজ্য না থাকলেও রাজা আছেন, আছে রাজপরিবার। তাঁরা থাকেন দিল্লিতে। গত বছরের মে মাসে সর্বশেষ এখানে এসেছিলেন।’

রাজপরিবারের সদস্যরা হয়তো খুব একটা আর আসেন না। কিন্তু ফিরে ফিরে আসেন শুধু ইতিহাসপিপাসুরা। পর্যটকরা। কাংড়া দুর্গের সৌন্দর্য মুগ্ধ করে তাঁদের। বিশালত্ব করে বিস্মিত। আর দুর্গজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা ভাঙা ভাঙা ইট-পাথরে মহাকালের যে দীর্ঘশ্বাস শুনে যান, এ ঘোর কাটতে সময় লাগে কিছুটা।

কিছুটা নয় আসলে, অনেকটা।

মন্তব্য