kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আরেক রক্তাক্ত মার্চের গল্প

ডায়েরি,নোমান মোহাম্মদ   

১১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আরেক রক্তাক্ত মার্চের গল্প

পাহাড়ি শহরে মধ্যরাতের ডাকপিয়নের অভাব নেই কোনো। রাতজাগা কোনো পাখি বিচিত্র শব্দে ডেকে ওঠে হঠাৎ।

দূর থেকে অচেনা কোনো জানোয়ারের চিত্কার ভেসে আসে হয়তো। পাহাড়ে পাহাড়ে ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত সেসব শব্দ তৈরি করে আলো-আঁধারির রহস্যময় এক জগৎ। ঘুমিয়েও যেন সর্বদা জেগে থাকে অমন অঞ্চল।

কিন্তু সকালগুলো সেখানে বড্ড শান্ত। প্রকৃতিতে তাড়াহুড়োর লক্ষণ নেই। মানুষজনেও এর ছাপ। সবাই চলে ঢিলেতালে, মন্দ্রসপ্তকে। পুরনো সেই অভিজ্ঞতার কোনো ব্যত্যয় তো ধর্মশালার আগের তিন প্রভাতে দেখিনি। কাল সকালে এক প্রভাতফেরির চাঞ্চল্যে ঘুম ভাঙাটা তাই একটু চমকে যাওয়ার মতোই বৈকি!

শান্ত শহরটা হঠাৎ এমন ফুঁসে উঠল কেন? বিশ্বকাপে ভারত-পাকিস্তান দ্বৈরথ এখান থেকে সরিয়ে কলকাতায় নেওয়ার কারণেই কি? ক্রিকেটের চৌহদ্দিতে ভাবনার ঘোরাঘুরিতেই প্রথমে অমনটা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু পরে যা জানা গেল, সেটি তো আরেক মার্চের গল্পই। বাংলাদেশের জন্য যেটি ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চ, তিব্বতিয়ানদের কাছে সেটিই ১৯৫৯ সালের আগুনঝরা ওই মাস!

ধর্মশালা শহর প্রদক্ষিণ করে কাল রূপসী এক মিছিলে। সেই মিছিলের মুখ হয়ে কারা নেই। মেরুন পোশাকের সন্ন্যাসী, স্কুল পোশাকের বালক-বালিকা, কেতাদুরন্ত পোশাকের চাকরিজীবী—সবাই। আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা বাদ নেই কেউ। আগের তিন দিন দেখা হাসি হাসি মুখগুলো কাল ফুলে ফুলে ওঠে স্লোগানের দমকে। সৌম্য চোখের তারার প্রতিজ্ঞার ঝলসানি। চিত্কার করছে সবাই। দিচ্ছে স্লোগান। আর সেই স্লোগানই বলে দেয় তাঁদের চাওয়া—‘তিব্বতে গণহত্যা বন্ধ করো’, ‘মুক্ত করে দাও তিব্বতকে’, ‘ছাড়ো ছাড়ো তিব্বত ছাড়ো’ ‘চিরজীবী হোন দালাই লামা’—এমন আরো কত কি! স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করছেন ভারতের এই হিমাচল প্রদেশে আশ্রয় পাওয়া তিব্বতিয়ানরা।

কিন্তু কালই কেন? কেন এই ১০ মার্চ? মিছিলের মুখদের কাছ থেকে যা জানা গেল, সেটি শিউরে ওঠার মতো। ১৯৫৯ সালের এই দিনে তিব্বতে আগ্রাসন চালায় চীন। মেরে ফেলে হাজার হাজার অধিবাসীকে। বন্দি করে আরো অনেককে। স্বাধীনতা চাওয়াটাই ছিল তাদের অপরাধ। আর ওই আগ্রাসন থেকে পালিয়ে দালাই লামা চলে আসেন ভারতে। এই ধর্মশালায় আশ্রয় পান। তাঁর অনুসরণে হাজার হাজার তিব্বতবাসী চলে আসেন এখানে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম পেরিয়ে যায়। কিন্তু স্বাধীনতার স্বপ্ন তাঁদের মরে না। আর ভোলেন না তাঁরা এই ১০ মার্চকে। ‘তিব্বতিয়ান আপরাইজিং ডে’ হিসেবে দিনটি পালন করেন তাঁরা।

ঠিক যেমনিভাবে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ ভোলেনি বাংলাদেশ। এখনো শ্রদ্ধায়-ব্যথায় স্মরণ করা হয় দিনটি। বাংলাদেশ না হয় স্বাধীনতা পেয়েছে। তিব্বতিয়ানরা সেই স্বাধীনতার আন্দোলন বেগবান করতেই ১০ মার্চকে এমন মিছিলে-স্লোগানে-সভায় স্মরণ করেন প্রতি বছর। কালও মিছিল শেষে ধর্মশালার ডিসি অফিসের সামনের সভা করে নিজেদের দাবির জানান দেন অন্তত হাজার বিশেক মানুষ।

তাঁদেরই একজন ডোনডুপ। এখানকার তিব্বতিয়ান চিলড্রেন ভিলেজে কাজ করেন তিনি। বয়স চল্লিশের কোঠায়। ১৯৫৯ সালে চীনের ওই আগ্রাসনের সময় তাঁর জন্ম হয়নি। কিন্তু সেই নিপীড়নের ইতিহাস স্থায়ী ক্ষত হয়ে আছে তাঁর বুকে, ‘আমার বাবা-মাকে তখন লুকিয়ে থাকতে হয়েছিল। পরে তাঁরা ধরা পড়েন চীনা সেনাবাহিনীর কাছে। কী নির্যাতন যে সয়েছেন! আর আমার চাচাসহ অনেক আত্মীয় তো ওই সময় মারাও যান। ’ তিব্বতের স্বাধীনতার স্বপ্ন তিনি দেখেন খুব করে। আর সেটি দালাই লামার দর্শনে অহিংস নীতিতেই, ‘আমরা সহিংসতায় বিশ্বাস করি না। আর চীনের সঙ্গে লড়াই করে পারবও তো না। তাই আলোচনার মাধ্যমে, বিশ্ববিবেক জাগ্রত করে তিব্বত স্বাধীন হতে চায়। ভারত উপমহাদেশ থেকে ব্রিটিশরা যদি দুই শ বছর পর বিতাড়িত হতে পারে, তাহলে আমাদের ওখান থেকে চীনারা যাবে না কেন? মোটেই তো ৫৭ বছর হলো!’

এই মিছিলে শামিল ধর্মশালায় তিব্বতিয়ান ভাষা শিখতে আসা যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ বেন, পোল্যান্ডের জুটি ফিলিপ ও আনা এবং যুক্তরাজ্যের প্রিসিলাও। তিব্বতের স্বাধীনতা একদিন না একদিন হবে বলে বিশ্বাস তাঁদের। সবচেয়ে বেশি প্রত্যয়ী শোনায় ফিলিপের কণ্ঠ, ‘দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় পোল্যান্ডে কী হয়েছে, সবাই জানে। আমিও দাদা-দাদি, মা-বাবাদের কাছ থেকে সে গল্প শুনেছি। তো আমরা যখন হিটলারকে তাড়াতে পেরেছি, তিব্বত তাহলে চীনাদের হঠাতে পারবে না কেন?’

আবেগের তারে বাঁধা এই মিছিলে ডোনডুপ নিয়ে এসেছেন তাঁর তিন বছরের ছেলে তেনজিংকে। ছোট্ট শিশুটি চড়ে বাবার কাঁধে। চোখে তার রাজ্যের বিস্ময়। ওকে নিয়ে আসার কারণ ডোনডুপ ব্যাখ্যা করেন এভাবে, ‘ও তো এসব কিছু বোঝে না। কিন্তু আজ মিছিলে আসার পর থেকে ক্রমাগত প্রশ্ন করছে এসব নিয়ে। আমিও ওকে জানাতে পারছি তিব্বতের রক্তাক্ত ইতিহাস। আর স্বাধীনতার বীজ বুনে দিতে পারছি তেনজিনের মনে। ’

একাত্তরের মার্চ বাংলাদেশকে স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। ঊনষাটের মার্চ তিব্বতিয়ানদেরও দেবে নিশ্চয়ই। কাল ধর্মশালায় তিব্বতিয়ানদের রূপসী মিছিল সে বার্তাই যেন দিয়ে যায় বিশ্ববাসীকে। বিশ্ববিবেক কি শুনছে না তা?


মন্তব্য