শিল্পী আর শিল্পের যুগলবন্দি-333877 | খেলা | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


শিল্পী আর শিল্পের যুগলবন্দি

ডায়েরি, নোমান মোহাম্মদ   

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শিল্পী আর শিল্পের যুগলবন্দি

‘আমি কিন্তু শিল্পী।’

চমকে তাকাতে হয় ভদ্রলোকের দিকে। বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে হয়তো। দুই পাশে পাক ধরা নিখুঁত ছাঁটা চুল। ক্লিন শেভড। চোখে পাতলা ফ্রেমের চশমা। সাদা শার্টের ওপর কেতাদুরস্ত কালো সোয়েটার। ছোটখাটো গড়নের ভদ্রলোকটিকে স্কুল শিক্ষক হিসেবে মানায় খুব। কিংবা ছাপোষা মধ্যবিত্ত চাকুরে। কিন্তু উষ্কখুষ্ক চুল, মুখে দাড়ি-গোঁফের জঙ্গল, ময়লা কুঁচকানো কাপড় আর কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের যে শিল্পীমূর্তি বাঙালির মানসে আঁঁকা—এর সঙ্গে তাঁকে মেলানো যায় না কিছুতেই।

তখনই, চমকের প্রথম ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই হাসি হাসি মুখে আরেক চমকানো তথ্য তাঁর, ‘আমি আমাদের বংশের অষ্টম প্রজন্মের শিল্পী।’

ঘটনাস্থল ধর্মশালার ‘মিউজিয়াম অব কাংড়া আর্ট’। কোতোয়ালি বাজারের ঘিঞ্জি এলাকায় এমন শিল্প-জাদুঘর থাকাটাই অবাক করার মতো ঘটনা। কাল সকালে হিমালয়ের বরফে প্রতিফলিত প্রথম সূর্যের কিরণ গায়ে মেখে সেখানে ঢোকার পর তো চমকের পর চমক। কাংড়া উপত্যকার হাজার বছরের প্রাচীন পুরাকীর্তি, ৩০০-৪০০ বছরের পুরনো হাতে আঁকা ছবি কী যত্নের সঙ্গেই না সংরক্ষিত সেই জাদুঘরে! আর দূর অতীতের সঙ্গে বর্তমানের মেলবন্ধনে ওই অষ্টম প্রজন্মের শিল্পী অনিল রায়না যেন বাড়তি প্রাপ্তি।

এমনিতে ওই পাথুরে দেয়াল ঘেরা জাদুঘরে দ্রষ্টব্যের অভাব নেই। অষ্টম শতকের বিষ্ণু, নবম শতকের লক্ষ্মী, পঞ্চদশ শতকের গণেশ থেকে শুরু করে অষ্টম শতকের ধ্যানস্থ গৌতম বুদ্ধ, কী নেই এখানে! একটি অংশে রয়েছে আবার ভয়ংকর ভূমিকম্পের ক্ষতের স্মৃতিচিহ্নও। ১৯০৫ সালের ৪ এপ্রিল এই কাংড়া ভ্যালিতে হওয়া ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্পের ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে সেই সময়ের হিসাবেই লেগেছিল ২৯ লাখ রুপি!

তবে এই জাদুঘরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ নিঃসন্দেহে এক ঘরজুড়ে থাকা ‘পাহাড়ি মিনিয়েচার পেইন্টিং’। পশ্চিমা বিশ্বের কাছে যা ‘রাজপুত পেইন্টিং’ হিসেবে পরিচিত। ছবিগুলোর বেশির ভাগই ১৭ থেকে ১৯ শতকের। এত পুরনো ছবিও এত জ্বলজ্বলে কিভাবে? এই শিল্পের পরম্পরা গর্বের সঙ্গে বয়ে চলা অনিল রায়না বুঝিয়ে দেন, ‘এগুলো আঁকা হয় হাতে তৈরি কাগজে। ব্যবহার করা হয় অর্গানিক রং। প্রকৃতির সব উপাদান দিয়ে আঁকা বলে এগুলো প্রকৃতিই নষ্ট হতে দেয় না।’ এসব ছবির বিষয়বস্তুতেও কত বৈচিত্র্য! এক ছবিতে যেমন সিংহের শরীরের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া নারীর মাথা। এর নামটিও যথার্থ, ‘এ লায়ন উইথ আ হেড অব লেডি।’

অনিল রায়না এই জাদুঘরে আছেন সিনিয়র মনুমেন্ট অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে। ওই ঘরে থাকা ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে তাঁর বাবার আঁকা রাধা-কৃষ্ণের একটি ছবি। ঠিক সেটি অনুকরণে নিজেও এঁকেছেন তা। অনুরোধে দুটি ছবি পাশাপাশি নিয়ে দাঁড়িয়ে যান। আর বলে চলেন তাঁদের শিল্পী পরম্পরার কথা, ‘আমার আগের সাত প্রজন্ম এ ধরনের আঁকাআঁকি করেছে। আমরা এটিকে বলি কাংড়া মিনিয়েচার পেইন্টিং। ১০-১১ বছর বয়স থেকে এটি শিখতে শুরু করি। বাবাই হাতে ধরে ধরে শিখিয়েছেন। আমার ১৭ বছরের ছেলেকেও যেমন এখন আমি শেখাচ্ছি।’

তবে আঁকিয়ে বলে শুধু যে শিল্পে আগ্রহ অনিল রায়নার, তা কিন্তু না। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ হচ্ছে ধর্মশালায়, জানেন। বাংলাদেশের ম্যাচের টিকিট জোগাড় করে দিতে পারব কি না—এমন প্রশ্নও করেন। তা এখানে তো আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রথম হচ্ছে না। আগে যে ভারত, ওয়েস্ট ইন্ডিজ, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো দল ধর্মশালায় খেলে গেছে, তাদের কেউ কি এই জাদুঘরে আসেনি? উত্তর দিতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস গোপন করেন না অনিল রায়না, ‘ওদের বোধ হয় এসবে আগ্রহ নেই। তা তোমাদের বাংলাদেশ দল যখন এসেছে, ওদের এক দিন নিয়ে এসো না! এই জাদুঘরে এলে ক্রিকেটারদের ভালোই লাগবে।’

ভালো লাগবে নিশ্চয়ই। কিন্তু ঠাসবুনোটের ক্রিকেটসূচিতে সেখানে যাওয়ার অবকাশ কোথায় মাশরাফি-সাকিব-মুশফিকদের! আর আগ্রহটাও তো থাকতে হবে, নাকি!

মন্তব্য