kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দালাই লামার একখণ্ড তিব্বত

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দালাই লামার একখণ্ড তিব্বত

সেখানে মেঘদল উড়ে বেড়ায় ভেড়ার পালের মতো। দিগ্বিজয়ী সম্রাটের ঔদ্ধত্য নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে হিমালয়।

অচিন বৃক্ষের শাখা-প্রশাখা স্পর্ধা দেখায় আকাশ স্পর্শের।

আর এখানেই, প্রকৃতির অপার্থিব সৌন্দর্যের নীড়ে ধ্যানস্থ ঋষির মতো চুপটি করে বসে এক ঋষির আশ্রম। তিব্বতের ধর্মগুরু দালাই লামার আশ্রম।

ধর্মশালার মূল শহর থেকেও পাঁচ কিলোমিটার দূরে ম্যাকলয়েড গঞ্জ। তিব্বত থেকে তো সেটি আরো কত দূর! তবু এখানেই গড়ে উঠেছে একখণ্ড ছোট্ট তিব্বত। এখান থেকে পরিচালিত হচ্ছে তিব্বতের স্বাধীনতা আন্দোলন। আর সেটি রীতিমতো স্বাধীন তিব্বতের সরকার গঠন করে। বলাই বাহুল্য, নিজ দেশ থেকে নির্বাসিত দালাই লামা নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেই সংগ্রামের। আর তাঁর কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ম্যাকলয়েড গঞ্জের এই ‘দালাই লামা মন্দির’।

নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী ওই ধর্মগুরু এখন নেই ম্যাকলয়েড গঞ্জে। কী এক কাজে যুক্তরাষ্ট্র সফরে তিনি! পুরো পৃথিবীই ঘুরে বেড়ান, যেখানে যান পান অপার শ্রদ্ধা—কিন্তু যেতে পারেন না তিব্বতে। ১৯৫৯ সালে নিজ দেশ থেকে পালিয়ে আসতে হয় তাঁকে। চীনাদের কাছ থেকে নিজ দেশের স্বাধীনতা চেয়েছেন বলে। ভারতীয় সরকার এই ম্যাকলয়েড গঞ্জে আশ্রয় দেয় দালাই লামাকে। তাঁর অনুসারীরা একে একে আসতে শুরু করেন বানের জলের মতো। এখন তো ‘লিটল লাসা’ নামে পরিচিত হয়ে উঠেছে জায়গাটি; তিব্বতের রাজধানীর নামানুসারে।

দালাই লামার দীক্ষার প্রদীপ অনির্বাণ শিখার মতো জ্বলছে এখানকার তিব্বতি জনগোষ্ঠীর মাঝে। তবে সেটি সহিংস না, বৌদ্ধ ধর্মানুসারে অহিংস নীতিতে। কাল সকালে ওই মন্দিরে পা রেখেই দেখা মেলে সেই চর্চার। বড় এক চত্বরে ক্ষৌর মাথার মেরুন পোশাকের একদল ভিক্ষু বসে। চুপচাপ নেই কেউ। হাততালি দিচ্ছেন ক্রমশ আর উচ্চৈস্বরে তিব্বতীয় ভাষায় আলাপচারিতা। হঠাৎ করে দেখলে মনে হয়, ঝগড়া থেকে হাতাহাতিই না বেধে যায়! কিন্তু পরে মেরুন পোশাকধারীদের একজন বুঝিয়ে দেন, বৌদ্ধ ধর্ম নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করছেন তাঁরা। এই বিতর্কে নাকি শান্ত হবে আত্মা। কিন্তু তিব্বতের কথা ভেবে অশান্ত মন যখন কিছুতেই শান্ত হয় না? নিজেদের গায়ে আগুন ঢেলে আত্মহত্যা করে ‘ফ্রি তিব্বত মুভমেন্ট’ এগিয়ে নেন অনেকে। সপ্তাহখানেক আগেও অমন এক ঘটনায় দিন চারেক একেবারে স্থবির হয়ে ছিল ম্যাকলয়েড গঞ্জের জনজীবন।

ছোট্ট শহরের ছোট্ট মন্দিরটি উন্মুক্ত পর্যটকদের জন্য। কিন্তু এর সঙ্গেই দালাই লামার যে বসতি, সেখানে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা। পাহাড়ের ওপরে পাহারায় সেখানে তাঁর অনেক শিষ্য। ওই মন্দিরেই অবশ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে দালাই লামার দীক্ষার মন্ত্র। মূল মন্দিরের ভেতরে গৌতম বুদ্ধের বড় মূর্তি। ভক্তরা সেখানে আসছেন শয়ে শয়ে। এই ঘরের তিন দিক দিয়ে দেয়ালের গায়ে লাগানো অগুনতি চাকা। চাকার গায়ে লেখা মন্ত্র। প্রতিটি চাকা ঘুরিয়ে দিতে দিতে এগিয়ে যাচ্ছেন ভক্তরা। তাঁদের সঙ্গে তাল মেলাতে দেখা যায় পর্যটকদেরও। ‘এখানে যেসব মন্ত্র লেখা রয়েছে, তার গুণ পাব চাকাগুলো ঘোরালে। এটিই আমাদের প্রার্থনা’—মানালি থেকে আসা হরিশংকর রায়ের কণ্ঠ এভাবেই অবনত শ্রদ্ধায়। আবার অন্য দিকের একটি কক্ষে জ্বলছে অসংখ্য ঘিয়ের প্রদীপ। যেন তিব্বতের স্বাধীনতা আন্দোলনের অনির্বাণ শিখাই প্রজ্বলিত!

চীনাদের কাছ থেকে তিব্বতের স্বাধীনতা আন্দোলন চলছে একেবারে সরকার গঠন করে। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় যেমন গঠিত হয়েছিল স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার। ‘সেন্ট্রাল তিব্বতিয়ান অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’-এ কিন্তু দালাই লামা নেই। তাঁকে এসব রাষ্ট্রীয় কাজের ঊর্ধ্বে রেখেই চলে সরকার গঠন। ১৯৯১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে নিয়ম করে নির্বাচনও হয়। ‘এ মাসের ২০ তারিখেই নির্বাচন। তা নিয়ে তিব্বতীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এখন দারুণ চাঞ্চল্য’—বলছিলেন সেখানকার এক দোকানদার।

ও হ্যাঁ, দালাই লামার এই বসতি কেন্দ্র করে দোকানপাটের বেশ পসরাও কিন্তু বসে গেছে ম্যাকলয়েড গঞ্জে। মন্দিরের ভেতরে চুপচাপ, কিন্তু বাইরে সরগরম। তিব্বতীয়দের সংস্কৃতি, শিল্প, বৌদ্ধ ধর্মের নানা নিদর্শনের দোকান রাস্তার দু’পাশজুড়ে। এর বেশির ভাগই স্থানীয়দের হাতে তৈরি। আর এ থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়েই চলে তাঁদের দিন।

কিন্তু দিন চললেও জীবন হয়তো চলে না। আর কত! সেই ১৯৫৯ সাল থেকে নির্বাসিত তিব্বতীয়রা। দুই-তিন প্রজন্ম পেরিয়ে গেছে। স্বপ্নের স্বাধীনতার দেখা মিলছে না এখনো। কবে মিলবে, তা-ও জানেন না কেউ।

তিব্বতি ভাষায় ‘লামা’ মানে তো গুরু। তা ওই গুরু দালাই লামার দিকেই বরাবরের মতো তাকিয়ে নির্বাসিত তিব্বতীয়রা। ম্যাকলয়েড গঞ্জে নির্বাসিত দালাই লামাও নিশ্চয়ই দিনটির স্বপ্ন দেখেন সবচেয়ে বেশি। তিব্বতের স্বাধীনতার।

সেই স্বাধীনতা মিললে তবেই হয়তো মেঘের ভাঁজে, হিমালয়ের কোলে থাকা এখানকার অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অপার্থিব রূপে ধরা দেবে দালাই লামার চোখে। তার আগে নয়!


মন্তব্য