kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নতুন মাহমুদ উল্লাহ

নোমান মোহাম্মদ -ধর্মশালা থেকে   

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নতুন মাহমুদ উল্লাহ

ধর্মশালার কাংড়া বিমানবন্দরের দরজা ঠেলে সবার আগে বাইরে বেরোলেন ওই দুজন। মাশরাফি বিন মর্তুজা ও মাহমুদ উল্লাহ।

বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের আগামী দিনের নেতৃত্বের হাতবদলের একটি ছবিই কি আঁকা হয়ে গেল তাতে!

সীমিত ওভারের ক্রিকেটে বাংলাদেশের অধিনায়ক মাশরাফি। কিন্তু শরীরজুড়ে তাঁর ইনজুরির ধকল, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে দুই হাঁটুতে অস্ত্রোপচারই তো করাতে হয়েছে সাতবার। ক্যারিয়ার আরেকটু দীর্ঘায়িত করতে এই বিশ্বকাপের পর টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে অবসর নিতে পারেন মাশরাফি। আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা আসেনি এখনো, তবে এই ফরম্যাটে ‘নড়াইল এক্সপ্রেস’ শেষ গন্তব্যে চলে এসেছেন বলে জোর গুঞ্জন। সত্যিই যদি তা হয়, তাহলে বাংলাদেশের টি-টোয়েন্টির নতুন অধিনায়ক হতে পারেন মাহমুদ। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) সর্বশেষ আসরে যিনি নেতৃত্বের পরীক্ষায় পাস দারুণভাবে। আর ঠিক আগের রাতে এশিয়ার কাপ ফাইনালে এই ফরম্যাটে নিজের ব্যাটিং সামর্থ্যের প্রমাণও তো দেন তিনি বিস্ফোরক ব্যাটিংয়ে।

১৩ বলে ৩৩ রান—টি-টোয়েন্টির যুগে অমন আহামরি হয়তো না। কিন্তু ভারতের বিপক্ষে জয়ের যে ন্যূনতম সম্ভাবনা জাগায় বাংলাদেশ, সেটি মাহমুদের ওই ডাকাবুকো ইনিংসের কারণে। দলের ইনিংস একশ হতেও কষ্ট যেখানে, সেখানে ১২০ রানে গিয়ে থামে। অধিনায়ক মাশরাফির কণ্ঠে ফাইনাল শেষেই উচ্ছ্বাস ঝরে সতীর্থের ওই ইনিংস নিয়ে, ‘আমাদের পরিকল্পনামতো ও নিজের ভূমিকা পালন করেছে। রিয়াদের (মাহমুদ) যেটা খেলার কথা ছিল তার থেকে বেশি খেলেছে ও। আমরা যেটা প্রত্যাশা করছিলাম তার থেকে বেশি ও করে দিয়েছে। ’ এমন একজনকে যে মাশরাফি তাঁর ডানাতলে রাখবেন, সেটিই তো প্রত্যাশিত।

এই মাহমুদ পরশু হয়তো বাংলাদেশকে ম্যাচ জেতাতে পারেননি। ‘ট্র্যাজিক হিরো’ বলা যায় বড়জোর। অথচ গত বছর ওয়ানডে বিশ্বকাপে তিনিই ছিলেন হিরো। দু-দুুটি সেঞ্চুরি করেন তিনি। আগের চার বিশ্বকাপে যেখানে কিনা বাংলাদেশের কোনো ব্যাটসম্যানের ব্যাট থেকে আসেনি শতরান। তবে সে কথা মনে করাতেই কাল কাংড়া বিমানবন্দরের ঠিক বাইরে মাহমুদের ঠোঁটে খেলে যায় লাজুক হাসি, ‘আমি কোনো হিরোটিরো না। এই হিরোইজমে আমি বিশ্বাসী না। দলের জন্য যদি ভালো খেলতে পারি, তাহলেই খুশি। ’ ওয়ানডে বিশ্বকাপের মতো টি-টোয়েন্টির বৈশ্বিক আসরেও কি ওই বীরত্বের পুনরাবৃত্তি সম্ভব? বিশ্বকাপে যেমন কোনো সেঞ্চুরিয়ান ছিল না বাংলাদেশের, এই ফরম্যাটেও তো তেমনি শতরান নেই কারো। ছয়-সাতে নামা একজনের পক্ষে সম্ভব সেই শেকল ভাঙা? প্রায় অসম্ভব জেনেও তা উড়িয়ে দেন না মাহমুদ, ‘কে জানে, হতেও পারে! যদিও ব্যাটিং অর্ডারের এখানে নেমে সেঞ্চুরি করা কঠিন। আর এটি ভিন্ন ফরম্যাট। তবে যেখানেই নামি, দলের জন্য অবদান রাখতে চাই। ’

এই অবদানটাই টি-টোয়েন্টিতে তিনি রাখতে পারবেন কি না, এ নিয়ে কত সংশয় সর্বমহলে! বরাবরের মিতভাষী মাহমুদ বরাবরের মতোই ব্যাটে দেন সেই সংশয়ের জবাব। সবচেয়ে বেশি করে এশিয়া কাপ ফাইনালে। তাঁর টি-টোয়েন্টিতে বদলে যাওয়া ব্যাটিংয়ের কারণ ব্যাখ্যা করেন এভাবে, ‘আমার মানসিকতায় অনেক বদল হয়েছে। পরিশ্রমও করেছি খুব। খুলনা ও চট্টগ্রামে সর্বশেষ দুই ক্যাম্পে কোচ আমাকে সেভাবে প্রস্তুত করেছেন। আমি বলব, আমার মানসিক পরিবর্তনের ভূমিকা এখানে বেশি। দলে যে ভূমিকা পাচ্ছি, সেটি পালন করতে ভালো লাগছে। ’

ভালো লাগার পাশাপাশি বিষণ্নতার অনুভূতিও তো কম নেই। এশিয়া কাপ ফাইনাল দল জিততে পারল না যে! ‘সে জন্য আফসোস  তো হচ্ছেই’—যেন ১৬ কোটির প্রতিধ্বনি মাহমুদের কণ্ঠে। তবে ভারতকে হারাতে না পারলেও বিশ্বকাপের জন্য টুর্নামেন্টটি খুব কাজে লাগবে বলে তাঁর বিশ্বাস, ‘আমাদের জন্য এশিয়া কাপ জেতার খুব ভালো সুযোগ ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা হয়নি। তবে এ টুর্নামেন্টে আমরা যেমন ক্রিকেট খেলেছি, সেটি বিশ্বকাপের জন্য আমাদের বড় পদক্ষেপ। ’ কিন্তু এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্বের দ্বৈরথে থাকা দলটিকে যে এবার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে এসে বাছাই পর্ব খেলতে হচ্ছে! এ জন্য মানসিকভাবে একটু কি পিছিয়ে পড়ার কোনো ব্যাপার রয়েছে? সানগ্লাসের ভেতর দিয়েও মাহমুদের চোখের দৃপ্ত তারা যেন ঝলসে ওঠে কণ্ঠের সঙ্গে, ‘না, মানসিক কোনো ব্যাপার নেই। এটি যখন নিয়ম, খেলতে তো হবেই। ’ নেদারল্যান্ডস-আয়ারল্যান্ড-ওমানের বিপক্ষে বাছাই পর্বের ম্যাচগুলোকে বরং মূল পর্বের প্রস্তুতির জন্য তাঁর কাছে যথার্থ মঞ্চ বলে মনে হয়, ‘আমি এভাবেই দেখছি ব্যাপারটা। বিশ্বকাপের প্রস্তুতি হিসেবে দেখছি এই ম্যাচগুলো। আর কাল প্রস্তুতির জন্য আমাদের হাতে একটি দিন রয়েছে। আশা করি, আমরা কন্ডিশনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারব। ’

ধর্মশালার বৃষ্টিভেজা, সন্ধ্যার শীতে কাঁপা এই কন্ডিশন আবার বাংলাদেশের জন্য আরেক চ্যালেঞ্জ। যদিও সেটিকে বড় করে দেখেন না মাহমুদ, ‘যতটুকু শুনেছি, এখানকার উইকেট ভালো। জানুৎয়ারিতে নাকি আরো বেশি ঠাণ্ডা থাকে। ’ আর কোনো প্রস্তুতি ম্যাচ ছাড়া টি- টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে হচ্ছে বলেও দুশ্চিন্তার বিন্দুমাত্র রেশ নেই তাঁর গলায় স্বরে, ‘ম্যাচ খেলার চেয়ে ভালো প্রস্তুতি আর কী হতে পারে! আমরা এশিয়া কাপে দারুণ প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ম্যাচ খেলে এসেছি। সেই ধারাবাহিকতায় আশা করি, বিশ্বকাপেও ভালো কিছু করব। ’

আশার ওই স্বপ্নজাহাজেই তো সওয়ার এখন বাংলাদেশের ১৬ কোটি ক্রিকেটপ্রাণ!


মন্তব্য