kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ভারতে বসে দেখা ফাইনাল

নোমান মোহাম্মদ, ধর্মশালা থেকে   

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ছোট্ট শহরটির বসতি আকাশের রাজ্যে। মেঘের সাম্রাজ্যে।

কাল দুপুর গড়ানোর পর থেকেই গুড়ু গুড়ু ধ্বনিতে শুরু সেই মেঘের জল ঝরানোর ফিসফিসানি। বিকেল হতে না হতেই আকাশের ডাক ছেড়ে কান্না। ভেসে যায় হিমালয়ের আঁচল। সবুজ উপত্যকা সতেজ হয়ে ওঠে আরো। কী বৃষ্টি! কী বৃষ্টি!

তখনো কে ভেবেছিল বুনো বৃষ্টির এই গানের সুরই কাল একাকার করে দেবে চৌদ্দশ মাইল এপার-ওপার! ঢাকা ও ধর্মশালা। শেরেবাংলা জাতীয় স্টেডিয়াম ও হিমাচল প্রদেশ ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন স্টেডিয়াম।

এশিয়া কাপের ফাইনালের উত্তাপে কদিন ধরেই কাঁপছে বাংলাদেশ। তপ্ত সেই ক্রিকেটজ্বরে কাল বিকেলে বেরসিকের মতো পানি ঢেলে দেয় ফাল্গুনের অকাল কালবৈশাখী। আর শীত পেরিয়ে গ্রীষ্মের অপেক্ষায় থাকা ধর্মশালাতেও তখন ঝেঁপে আসে অসময়ের বৃষ্টি। অসময়ই তো! গত ৯ দিন ধরে এই শহরে থাকা আইসিসির মিডিয়া ম্যানেজার রাবীদ ইমামও যে প্রথমবারের মতো দেখলেন বৃষ্টির এই রুদ্ররূপ।

এমনিতে ক্রিকেট নিয়ে খুব মেতে নেই ধর্মশালা। অন্য অনেক পাহাড়ি বসতির মতো হিমাচল প্রদেশের কাংড়া জেলার শহরটিও চলে মন্দ্রসপ্তকে। একটু ঢিমেতালে। শহরের হাজার পঞ্চাশেক জনতার উত্তেজনার মৌচাকে ঢিল ছুড়তে পারেনি আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। অথচ এই টুর্নামেন্ট খেলতে এরই মধ্যে ধর্মশালায় চলে এসেছে আয়ারল্যান্ড। আজ বিকেলে ঘাঁটি গাড়ছে বাংলাদেশ। এশিয়া কাপের ফাইনাল খেলা দল এলে এখানকার ক্রিকেট-উত্তাপের পারদ যদি একটু বাড়ে!

বাংলাদেশকে নিয়ে এমনিতে অবশ্য উন্মাদনা না থাকলেও উত্তেজনার কমতি নেই। আকাশ-সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতার নেতাজি সুভাষ চন্দ  বোস বিমানবন্দরে ঢুকতেই ইমিগ্রেশন কর্তা তাই বাংলাদেশের সাংবাদিকদের দিকে সহাস্যে প্রশ্ন ছুড়ে দেন, ‘এশিয়া কাপের ফাইনাল বাদ দিয়ে আপনারা এখানে কেন?’ কে আগে ভেবেছিল, টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটেও সব হিসেব-নিকেশ পাল্টে মাশরাফি বিন মতুর্জার দল উঠে যাবে ট্রফির দ্বৈরথে! বাংলাদেশ দলেরও তো প্রাথমিক পরিকল্পনায় ৪ মার্চ ধর্মশালায় চলে আসার কথা। কিন্তু ক্রিকেটের সূর্যসন্তানরা ঠিকই উঠে যায় এশিয়া কাপের ফাইনালে। আর সেটি নিয়ে এপার বাংলায় ওঠে উচ্ছ্বাসের ঢেউ। দার্জিলিং জেলা দলে একসময় ক্রিকেট খেলা ওই ইমিগ্রেশন অফিসার যেমন বলে ওঠেন, ‘পাকিস্তান-শ্রীলঙ্কাকে টপকে বাংলাদেশ ফাইনালে ওঠায় আমরা অবশ্যই খুশি। আমরাও বাঙালি তো। আর শিরোপা যে-ই জিতুক, জয় আমাদের। হয় আমাদের দেশ জিতবে, নয় বাঙালি। ’ পাশ থেকে আরেক কর্তা জুড়ে দেন, ‘ভারত তো অনেক জিতেছে, এবার বাংলাদেশই জিতুক। ওদের দলটাও কী দুর্দান্ত!’

শুধু বাঙালি বলে নয়, বাংলাদেশ ক্রিকেট দল এই সমীহ আদায় করে নিয়েছে সবার কাছ থেকে। দিল্লির ব্যবসায়ীর মুখে উচ্ছ্বাসের খই ফোটে। ধর্মশালার চেকপোস্টে নিরাপত্তাকর্মীও এশিয়া কাপ ফাইনালে কে জিতবে—এটি নিয়ে বিশ্লেষণী আলোচনায় ডুব দিতে চান। কে জানে, ভারত-পাকিস্তানের তীব্র ক্রিকেট-যুদ্ধ না ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-ভারত ক্রিকেট-সমরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সোপানগুলো এখন তৈরি হচ্ছে কিনা!

এশিয়া কাপের পিঠাপিঠিতেই বিশ্ব টি-টোয়েন্টির ময়দানে নেমে পড়তে হচ্ছে মাশরাফির দলকে। ছবির মতো সুন্দর ধর্মশালা প্রস্তুত তাদের বরণ করে নেওয়ার জন্য। মেঘের বাড়িতে ক্রিকেটের নিমন্ত্রণ বলে কথা! স্টেডিয়ামের প্রস্তুতি অবশ্য পুরোপুরি শেষ হয়নি। কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের তো আর কোনো প্রস্তুতি নেই। সবচেয়ে সুন্দর ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ছোট্ট তালিকাতেও থাকবে হিমালয়ের দলাধার রেঞ্জের পাড়ের এই স্থাপনা। সাড়ে চার হাজার ফুট উঁচুতে ঝিম ধরা শহরের মধ্যে সৌন্দর্যের ক্যানভাস হয়ে ফুটে আছে তা। পাহাড়ের মাঝে, মেঘের কোলে। তামিম ইকবাল-মুশফিকুর রহিমরা তাই চার-ছক্কা মারার সময় দেখবেন ওই পর্বতের অপরূপ শোভা। মাশরাফি বিন মর্তুজা-সাকিব আল হাসান বোলিং করবেন হয়তো মাথার মেঘ মুছে।

আর ‘সিটি অব গডস’ নামে পরিচিত এই ধর্মশালায় সৌন্দর্যের বাইরেও অনেক আকর্ষণ। ধর্মগুরু দালাইলামারও বসতি এখানে। আরো কত কী! কিন্তু আজ মাশরাফি-সাকিব-মুশফিক-তামিমরা চলে আসার পর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে তারাই।

এশিয়া কাপে অমন রং ছড়ানো পারফরমেন্সের পর সেটিই তো প্রত্যাশিত!


মন্তব্য