kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সেলফিজ্বরের পর কালবৈশাখী ঝড়!

সামীউর রহমান   

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সেলফিজ্বরের পর কালবৈশাখী ঝড়!

বলা হতো, ভারতে ক্রিকেট ধর্মের মতো এবং শচীন টেন্ডুলকার সেখানে ঈশ্বরজ্ঞানে পূজিত হন। বক্তা খুব সম্ভবত ২০১৬-র ৬ মার্চের মিরপুর দেখেননি।

ক্রিকেট বাংলাদেশে এখন আর কোনো সাধারণ খেলা নয়। ক্রিকেট হচ্ছে সেই সব পেয়েছির চাবিকাঠি, জীবনের সব অপ্রাপ্তি বঞ্চনা ভুলে থাকার নেশার ঘোর। ক্রিকেট মানুষকে হাসায়, কাঁদায়, ঘুম পাড়ায় এবং জাগিয়ে তোলে। তাইতো খেলোয়াড়দের বহন করা বাসটা যখন স্টেডিয়ামের রাস্তা দিয়ে ঢোকে, তখন লোকে সেই বাসকে হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা ভেবে পেছনে ঘোরলাগা মূষিককুলের মতোই ছোটে।

অর্থনীতিবিদদের কাছে বাংলাদেশ এক জটিল ধাঁধা। এত দুর্নীতি, এত জনসংখ্যার চাপ নিয়ে একটা দেশ কিভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তরে ঘুম হারাম বাঘা বাঘা অর্থনীতিবিদদেরও। ক্রিকেট লিখিয়েদের কাছেও হয়তো বাংলাদেশ এমনই এক ধাঁধা হয়ে উঠেছে। দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট কাঠামো ঠিক নেই, একমাত্র রাজধানী বাদে কোথাও নিয়মিত লিগ হয় না, সবেধন নীলমণি একাডেমি আর বিকেএসপিই সম্বল। সেখান থেকে মাছ-ভাত খাওয়া শরীরে কী করে ১৪০ কিলোমিটারের ওপরে বল করা পেসাররা উঠে আসেন! কী করে মফস্বলের একটি ছেলে বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার হয়ে ওঠেন! তবে তার চেয়েও বড় ধাঁধা বোধহয় ঢাকাবাসীর মন। দেশের অডিও ইন্ডাস্ট্রি মৃতপ্রায়, শিল্পীদের ক্যাসেট বিকোয় না। তবু বছরের পর বছর উচ্চাঙ্গ সংগীত সম্মেলনে লাখো লোকের ভিড়ে ভোররাত অবধি গমগম করে আর্মি স্টেডিয়াম। ঘরোয়া ক্রিকেটে কিংবা টেস্ট ম্যাচে লোক হয় না, স্কুল ছাত্রদের ফ্রি প্রবেশাধিকার দিয়ে মাঠ ভরাতে হয়। অথচ প্রায় একই দল বা কিছু খেলোয়াড়ের অদল-বদলে এ দলটা যখন ওয়ানডে বা টি-টোয়েন্টি খেলে, তখন টিকিটের দাম শেয়ারবাজারের পাগলাসূচককে ছাড়িয়ে উঠতে থাকে চড়চড় করে।

বিকেল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শেরেবাংলা স্টেডিয়ামের গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে প্রবেশপথের রাস্তায় একে একে দেখা যায় সরকারি বিভিন্ন সংস্থার গাড়ি। নিরাপত্তা কিংবা প্রশাসন, পতাকা লাগানো এবং তারকাখচিত সব ধরনের গাড়িগুলোরই একটাই পথ। গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে প্রবেশপথের সামনে তারা নামিয়ে দিয়েছেন যাত্রীদের। দামি গাড়ির সেই সব যাত্রীরা এসেছেন মূল্যবান প্রসাধনীর সৌরভ ছড়িয়ে। পাশ্চাত্য ঘেঁষা পোশাকে বাঙালিয়ানা জুড়তে স্লিমফিট জিনসের ওপর বাংলাদেশের জার্সি। অনেকের চেহারায়  চড়া দাগের পার্টি মেকআপ, মেঘ ঘনিয়ে আসা বিকেলে অতিপ্রাকৃত মনে হলেও সন্ধ্যার আলোয় সেলফি তুলতে তো এমন সাজই চাই! গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে খেলা দেখছি...ফেসবুকে এমন চেক-ইন দিয়ে, সেলফি তুলে, টিভি ক্যামেরায় ধরা পড়ার সব প্রলোভনের ডালি সাজিয়ে এবং বিগস্ক্রিনে নিজেকে দেখে অবাক হওয়ার ভান না করলে ক্রিকেট মাঠে আসা কি সার্থক হয় নাকি! 

উত্তর, পূর্ব ও পশ্চিম গ্যালারিমুখী দর্শকদের মাঝে তবু খুঁজে পাওয়া যায় আমজনতার ছায়া। তারা গেট খোলার অপেক্ষায় লম্বা সময় লাইনে দাঁড়ানো এবং সর্পিল সেই রেখা ক্রমশ বর্ধমান। তবে গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডে ঢোকার বেলায় লম্বা লাইন নেই আর ভেতরে যেন তারার মেলা। চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহি, পরিচালক দেবাশীষ বিশ্বাস, মডেল তানহা, চিত্রনায়ক সায়মনসহ অনেকেই হাজির হয়েছিলেন মাঠে। অভিনেত্রী মৌসুমী হামিদকে প্রায়ই খুঁজে ফেরে লাইভ ম্যাচের ক্যামেরা। মাহির গাড়ি এসে থামতেই তাঁকে ঘিরে জটলা, ভিড় ঠেলে মাহিকে বের করে নিয়ে গেলেন স্বেচ্ছাসেবকদের একজন। গাড়ি থেকে নেমে রাস্তা পার হতে হতেই মাহিকে পেছনে রেখে সেলফি তুলতে বা মাহির ছবি তুলতে ব্যস্ত অনেকে, চীনা বিপ্লবের কল্যাণে স্মার্টফোন যে হাতে হাতে! বাঘের সাজে শোয়েব আলী, টাইগার মিলনসহ আরো বেশ কজনের সঙ্গে নবাব সিরাজউদ্দৌলা সাজা বাঁশিওয়ালার দলটা এগিয়ে আসতেই সেদিকে লোকজনের হামলে পড়া ভিড়, এবং যথারীতি সেলফি। কার ফ্রেমে কে ঢুকে পড়ছেন, ছবিতে কী আসছে সেই বিবেচনা পড়ে হবে, আগে তো সেলফিখানা তুলে নেই!

সন্ধ্যা ৬টা বাজার মিনিট বিশেক আগে রাস্তায় উদয় হলো বাংলাদেশ ক্রিকেট দলকে বহন করা বাস, তাতেই হুল্লোড়ের শব্দ চড়া। রবির রঙ্গে রাঙা বাসের ভেতরে কে কিভাবে বসে আছেন বোঝার উপায় নেই, অনেকটা বেগম রোকেয়ার সময়ের পর্দানশিন মহিলার মতো অবস্থা। সেই বাসের সামনে সেনাবাহিনী ও র্যাবের গাড়ি, সাইরেন বাজছে, পুলিশ লাঠি নাড়ছে তবে এর মধ্যেও সেলফি থেমে নেই। বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের বহনকারী গাড়িকে নেপথ্যে রেখেও সেলফি হলো। বাংলাদেশ দলের পিছু পিছু ভারতীয় খেলোয়াড়দের বহন করা বাসটিও এলো, এই গাড়িটি অবশ্য হাল ফ্যাশনের তরুণীদের মতোই! বিরাট কোহলি, আশিস নেহরা, হেডফোন কানে গান শুনছেন এটা বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট। সেলফি শিকারিরা এই সুযোগও হাতছাড়া করেননি।

এই সেলফি জ্বরের খানিক বাদেই ধেয়ে এলো কালবৈশাখী ঝড়। ফাল্গুনের মৃদুমন্দ হাওয়া ফুঁসে উঠে রূপ নিল দুরন্ত ঝঞ্ঝায়। ক্যামেরার ফ্ল্যাশের বদলে চমকাল বিদ্যুৎ। আঁধারে ঢেকে গেল গোটা মাঠ। বাইরের ভিড় তখন ছত্রভঙ্গ, গ্যালারির দর্শকরা আশ্রয় নিয়েছেন একচিলতে ছাদের নিচে। সেখানে আঁধারে তারকা আর ভক্তের সহাবস্থান! এরপর অবশ্য ফের জ্বলেছে আলো, খেলাও গড়িয়েছে তবে খেলা শুরু হতে হতে গ্র্যান্ডস্ট্যান্ডের উত্তেজনা তখন অনেকটাই থিতিয়ে। ধূলিঝড়ে পড়ে আর বৃষ্টিতে ভিজে উতসাহে ভাটা পড়েছে। টিকিট নিয়ে এমন হাহাকারের ম্যাচেও বেশ কিছু আসন দৃষ্টিকটুভাবে ফাঁকা পড়ে রইল। ম্যাচ না হওয়ার শঙ্কায় অনেকেই যে ঝড়-জল মাথায় বেরোননি। যারা ছিলেন, তারাও অন্য দিনগুলোর তুলনায় অনেক বেশি নিরুত্তাপ। ম্যাচের আগে উত্তেজনায় ফুঁসতে থাকা দর্শকদের যেন প্রকৃতি নিজ হাতেই শীতল করে দিল।


মন্তব্য