kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উঁকি দেওয়া শিরোপা-স্বপ্ন

সাইদুজ্জামান   

৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



উঁকি দেওয়া শিরোপা-স্বপ্ন

সব জায়গায় একটা গা ছমছম ব্যাপার। ভয়ের নয়, রোমাঞ্চের।

মাশরাফি বিন মর্তুজা একটু দেরি করেই বিছানায় যান। শনিবার রাতে আরো দেরি হয়েছে সঙ্গীদের সঙ্গে আড্ডা দিতে দিতে। সে আড্ডার সারবস্তু অবশ্য একটাই—এশিয়া কাপের ফাইনাল। সেখান থেকে উঠে শেষবার ফেসবুকে চোখ বোলাতে গিয়ে আবেগের চোরাবালিতে মুহূর্তেই হারিয়ে গেলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক, ‘সবার প্রোফাইলে বাংলাদেশ। বিশ্বাস করবেন না, দেখে গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গিয়েছিল!’

ফাইনালে এর আগেও উঠেছে বাংলাদেশ। ২০১২ এশিয়া কাপ সবচেয়ে হাতের কাছের স্মৃতি। পাকিস্তানের কাছে হারের পর মুশফিকুর রহিমকে জড়িয়ে ধরে সাকিবের কান্না লুকানোর চেষ্টা বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের ফ্রেমে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছে। সেই সাকিব গত কিছুদিন কেমন যেন ঘুমিয়ে পড়া বাঘ হয়ে ছিলেন। কিন্তু জেগে ওঠার পর তিনি শুধুই দলের সেরা অলরাউন্ডার নন, অনন্ত অনুপ্রেরণাও হয়ে উঠছেন। ‘এবার কাপটা ছাড়া যাবে না’, দলের ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে নাকি চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞাও করেছেন তিনি। ৪৮ ঘণ্টা আগে নেটে বলের আঘাতে ঊরুর পেশিতে চোট পাওয়া নিয়ে মিডিয়ার উদ্বেগ দেখে দলসংশ্লিষ্ট একজনের মুচকি হাসি, ‘হি ইজ ডিফারেন্ট। ৬০ ভাগ ফিট হলেও খেলবে। ফাইনালে খেলা নিয়ে সাকিবের নিজের মনে কোনো সংশয়ই তৈরি হয়নি। ’ তবে সেই ছমছমানিটা আছে।

গতকাল সকালের হোটেলের লবি থেকেই শুরু করা যাক। অন্যান্য দিন সিকিউরিটি আর্চ দিয়ে প্রবেশ করলেই বিনা বাধায় পৌঁছে যাওয়া যাচ্ছিল টিম হোটেলের লবিতে। কাল ভদ্রতা বজায় রেখে জিজ্ঞাসাবাদও হচ্ছিল। অবশ্য একেবারে বিনা কারণে নয়। নিত্য ভক্তদের ভিড়ে যে গত ৪৮ ঘণ্টায় যুক্ত হয়েছে টিকিটের দাবিও! অন্যান্য ম্যাচের মতো সে দাবি পূরণের ক্ষমতা ক্রিকেটারদেরও নেই। তবু কে শোনে সে যুক্তি। ম্যানেজার খালেদ মাহমুদের মোবাইল ফোনটা বেজেই চলেছে ক্রমাগত। চেনা নম্বর থেকে আসা অনেক ‘কল’ও ধরছেন না। সে তুলনায় ক্রিকেটারদের অবস্থা অন্যান্যবারের চেয়ে ভালো। ভালো মানে টিকিট তুলনায় কম পেয়েছেন কিন্তু ম্যাচ ‘হাইপ’ তুলে প্রত্যাশীদের অনুরোধ উপেক্ষাও করতে পারছেন অনায়াসে। সাকিবের অবশ্য সে হ্যাঁপা নেই, নিয়মিত প্রত্যাখ্যাত হয়ে টিকিটপ্রার্থীরা আর ভিড় করেন না তাঁর দরজায়। সাকিবকে ‘রোল মডেল’ ধরে এগোলে সম্ভবত বাঁচত বিসিবিও! যাক, টিকিট দুর্লভ হয়ে ওঠায় একটা লাভ হয়েছে বাংলাদেশ দলের। বড় ম্যাচের আগে টিকিট জোগাড় এবং বিলিবণ্টনের ঝামেলার কারণে ক্রিকেটারদের ফোকাস নড়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এবার সে ঝঞ্ঝাট থেকে কিছুটা হলেও নিবৃত খেলোয়াড়রা, মনপ্রাণ সঁপে দিতে পেরেছেন ফাইনালে।

আবার পুরোটা কি পেরেছেন? আইসিসি গা-জোয়ারি করে ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতে এমন সূচি বানিয়েছে যে প্রস্তুতি ম্যাচই পাচ্ছে না বাংলাদেশ। এশিয়া কাপের সুবাদে ম্যাচ প্র্যাকটিস হয়ে যাওয়ায় ওটুকু না হয় ছাড় দিল বাংলাদেশ। কিন্তু একটার আগে আরেকটা ম্যাচ নিয়ে ভাবার হাত থেকে তো রেহাই নেই মাশরাফিদের। আমিরাত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানের পর ভারতকে হারানোর রণপরিকল্পনার ফাঁকে ফাঁকে ওয়ার্ল্ড টি-টোয়েন্টিতে নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড এবং ওমান ম্যাচের ছকও আঁকতে হয়েছে দলকে। অচেনা ধর্মশালায় নামার ৩৬ ঘণ্টা পরই যে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে মাঠে নামতে হবে মাশরাফিদের। ফাস্ট ফরোয়ার্ড বাটনে পুশ করলেই হুড়মুড়িয়ে হামলে পড়ছে আয়ারল্যান্ড, ওমান ম্যাচ। তাই ঢাকায় বসে ভারতের বিপক্ষে মহারণের পরিকল্পনা থেকে উঠেই শিষ্যদের নেদারল্যান্ডস-আয়ারল্যান্ড ‘পড়িয়েছেন’ চন্দিকা হাতুরাসিংহে।

খুব সমস্যা হচ্ছে না? সমস্যা বলতে সমস্যা! একাধারে চার প্রতিপক্ষকে নিয়ে ভাবতে গিয়ে গুলিয়ে ফেলার আশঙ্কার সঙ্গে রয়েছে ফাইনালের রাত ভোর হলেই দিল্লিগামী ফ্লাইট ধরার জন্য এয়ারপোর্ট যাওয়ার ঝক্কি। ম্যাচ এবং অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে হোটেলে দুটার আগে ফেরা সম্ভব নয়—সেটা আগের ম্যাচগুলো জানিয়ে দিয়েছে তামিম ইকবালদের। এরপর ব্যাগপত্র গোছানো, নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার হুড়োহুড়িতে বিশ্রামেরই সময় নেই ক্রিকেটারদের। তাই যে যখনই সময় পাচ্ছেন, চট করে বেরিয়ে পড়ছেন হোটেল থেকে। মাশরাফি যেমন দুপুর দুটায় টিম মিটিং ধরার বাধ্যবাধকতার কারণে বারোটার দিকে রওনা দেন বাড়ির উদ্দেশে। ব্যাগ গোছানো, নিজের অনুপস্থিতি স্ত্রী-সংসারের সুবন্দোবস্ত—কত্ত কাজ। এরমাঝে এক পাক নিজের চেনা চত্বরেও গিয়েছেন তিনি। বাংলার ক্রিকেটের মুখ হয়ে ওঠা মাশরাফিকে ফাইনালের দুপুরে কাছে পেয়ে কেউ আশীর্বাদ দিচ্ছেন, কেউ-বা নিচ্ছেন; কোনো বয়সভেদও নেই। ঢিল মারা দূরত্বে স্টেডিয়াম তবু হাতে টিকিট নেই। তাই মাশরাফির এলাকার যুবারা গর্বভরে অধিনায়ককে জানিয়ে গেলেন, ‘বড় প্রজেক্টরের ব্যবস্থা করেছি ভাই। সবাই একসঙ্গে খেলা দেখব!’

কিছুটা কি বিহ্বল বাংলাদেশ অধিনায়ক? একপলক তাকিয়ে মাশরাফি বিন মর্তুজার উত্তর, ‘এই মানুষগুলাকে দেখলে মনে হয় পৃথিবীর সব কাপ জিতে আনি!’ মাশরাফির অভিব্যক্তি ঠিকরে বেরোনো নীরব আবেগ, সাকিবের ‘এবার কাপটা ছাড়া যাবে না’ প্রত্যয়ের বটমলাইন একটাই— আর সবার মতো কাপটা জয়ের স্বপ্ন নিয়েই ফাইনালে নেমেছিলেন ক্রিকেটাররা। স্বপ্নপূরণ হয়েছে কি হয়নি সেটা বড় কথা নয়। এই যে অনভ্যস্ত ফরম্যাটে অমিত শক্তিধর ভারতকে হারিয়ে কাপ জেতার সাহস দেখানো কম নয়। তার ওপর কাপ জিতে ভক্তের ভালোবাসার প্রতিদান দেওয়ার ইচ্ছা দলে সঞ্চারিত হওয়াও তো বিশাল ব্যাপার।

এই দল একদিন চ্যাম্পিয়ন না হয়েই যায় না!


মন্তব্য