kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিশ্বকাপের সুবাদেই পেস বোলিং বিপ্লব

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিশ্বকাপের সুবাদেই পেস বোলিং বিপ্লব

প্রশ্ন : আকিব জাভেদ, ম্যাথু হেইডেনের মতো সাবেক ক্রিকেটাররাসহ অনেকেই বলছেন পেস বোলিংই বদলে দিয়েছে বাংলাদেশ দলের চেহারাটা। দলের বোলিং কোচ হিসেবে আপনি এই মন্তব্যগুলোকে কিভাবে দেখেন?

হিথ স্ট্রিক : এমন প্রশংসা শুনতে তো ভালোই লাগে।

আগে যখন বাংলাদেশের বিপক্ষে খেলার জন্য কোনো দল প্রস্তুতি নিত, তারা আশা করত বেশি করে স্পিনারদের খেলতে হবে। বিশেষ করে বাঁহাতি স্পিনারদের। এখন তারা এসে দেখছে বাংলাদেশে অন্তত দুজন সত্যিকারের ফাস্ট বোলার আছে। তাসকিন, মাশরাফি, আল-আমিন, রুবেল, হায়দার এবং মুস্তাফিজ—সবাইকে নিয়ে বেশ বড় একটা ফাস্ট বোলারের দল আছে আমাদের।

প্রশ্ন : যে দলটা বাঁহাতি স্পিনের ওপর অনেক বেশি নির্ভরশীল ছিল এবং সফলও হচ্ছিল, সেই দলটাকে পেস বোলিং-নির্ভর আক্রমণে রূপান্তর করতে কী কী চ্যালেঞ্জের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে?

স্ট্রিক : আমরা একটা ভারসাম্য আনতে চেয়েছিলাম। এ জন্য অনেককে সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তারা নিজেদের প্রমাণও করেছে। পেস বোলারদের সামর্থ্য ছিল, তবে বোলিংয়ের উপযোগী পরিবেশ তারা পাচ্ছিল না। আমাদের জায়গায় কাজটা ছিল তাদের দক্ষতাটা আবিষ্কার করা, তাদের সেই সামর্থ্যকে কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষের দুর্বলতার জায়গাটা খুঁজে বের করা।

প্রশ্ন : তা ঠিক আছে, তবে একটা দল যারা বাঁহাতি স্পিনার খেলিয়ে সফল হচ্ছে এবং পাইপলাইনে অনেক বাঁহাতি স্পিনারও আছে, এমন একটা দলে পেসারদের আক্রমণের সামনে নিয়ে আসতে কর্তৃপক্ষকে বোঝানোটা কতটা কঠিন ছিল?

স্ট্রিক : আমার মনে হয় অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডে বিশ্বকাপে খেলার প্রস্তুতিটাই এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। আমরা জানতাম, অস্ট্রেলিয়াতে গিয়ে তিন স্পিনারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। অস্ট্রেলিয়াতে আমরা পেসারদের নিয়ে আক্রমণ সাজাতে চেয়েছি এবং তারা সেখানে খুব ভালোও করেছে। বিশ্বকাপে আমাদের পেসাররাই প্রতিপক্ষের মূল ক্ষতিটা করেছে। সেটাই কর্তৃপক্ষকে ভাবতে বাধ্য করেছে যে আমাদের পেসারদের সামর্থ্য ধারণার চেয়ে অনেক বেশি।

প্রশ্ন : এখন তো বাংলাদেশ পেস বোলিংয়ের জোরটাকে মানতেই হবে, এটাই দলের অন্যতম শক্তির জায়গা। এই পর্যায়ে এসে সামনের দিনের চ্যালেঞ্জটা কী? কিভাবে তাদের ফিট রাখা যায়, গতিটা ধরে রাখা যায়...

স্ট্রিক : আমাদের টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে আরো কাজ করতে হবে। এটা অবশ্য বেশি বেশি খেলা থেকেই আসবে। বাংলাদেশের একটা সমস্যা হচ্ছে আমরা খুব বেশি টেস্ট খেলি না। দুটো টেস্ট সিরিজের মাঝে বিস্তর সময়ের ফারাক। তাও একটা-দুটো টেস্ট সিরিজের বেশি বছরে খেলা হয় না। এ ছাড়া দেশের বাইরে, যেখানকার কন্ডিশন আমাদের চেনা নয় সেখানে গিয়ে ভালো খেলাটাও বড় চ্যালেঞ্জ। এখন সামনে আমাদের লক্ষ্য দেশের বাইরে গিয়েও যাতে পেসাররা ভালো করে সেভাবেই তাদের তৈরি করা। বাইরে তারা কতটা ভালো করতে পারবে, সেটাই হবে সত্যিকারের পরীক্ষা।

প্রশ্ন : ভারতের একজন অভিজ্ঞ সাংবাদিক তাঁর প্রতিবেদনে তাসকিন আহমেদকে উপমহাদেশের সবচেয়ে দ্রুতগতির বোলার উল্লেখ করেছেন। আপনিও কি এই ব্যাপারে একমত?

স্ট্রিক : হ্যাঁ, সে নিশ্চয়ই এরকমই কিছু হবে। এই আসরেই তো কিছু কিছু ম্যাচে ওর বলের গতি ১৪৫ কিলোমিটারের আশপাশে ছিল। এটা সত্যিই খুব জোরে বল করা। তা ছাড়া সে এখন বল ঠিক জায়গায় ফেলছে। তবে একটা দিক দিয়ে বাংলাদেশ সৌভাগ্যবান যে দলে চমত্কার একটা বৈচিত্র্য আছে। মাশরাফি এখন একটু স্লিঙ্গিং অ্যাকশনে বল করে, আল-আমিন কোনাকুনি বল ছাড়ে আর ওর বোলিং অ্যাকশনটাও একটু ভিন্ন ধাঁচের। এরপর আছে মুস্তাফিজ, ওর কাটারগুলো ব্যাটসম্যানের জন্য বোঝা খুবই কঠিন। হায়দার আছে, সেও বাঁহাতি এবং বেশ জোরেই বল করে। রুবেল আছে, স্লিঙ্গিং অ্যাকশন এবং বলে গতি আছে। আমাদের পেসার বেশ কয়েকজনই আছে কিন্তু কেউই কারো মতো নয়। অনেক সময় দেখা যায় দলে একাধিক পেসার থাকলেও সবার বোলিংয়ের ধাঁচটা একই রকম। আমাদের তেমন নয়। সাকিব সত্যিকারের অলরাউন্ডার; নাসির, সানি তারাও ভালো বল করে। সব মিলিয়ে আমাদের আক্রমণটা একরৈখিক নয়। ফলে অধিনায়ক দারুণ বুদ্ধিদীপ্তভাবে বোলিং পরিবর্তন করতে পারে।

প্রশ্ন : এত বৈচিত্র্য তো কোচের জন্যও সমস্যা। দলে মাশরাফি আছেন, যার ওপর অনেক চোটের ধকল গেছে। তাসকিন তরুণ, গতিশীল কিন্তু চোটপ্রবণ। মুস্তাফিজেরও চোট-আঘাত লাগছে। সব মিলিয়ে আপনি অনুশীলনে এদের সামলান কিভাবে? প্রত্যেকের ধরন যেহেতু ভিন্ন, প্রস্তুতি ও তাদের আরো ধারালো করে তোলার ব্যবস্থাপত্রও তো নিশ্চয়ই আলাদা আলাদা?

স্ট্রিক : আমাদের একধরনের একটা ব্যবস্থা আছে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে, খেলতে গেলে পেসাররা চোট পাবেই, এটা কাজেরই অংশ। অন্য দেশের বোলারদের দেখুন, সেখানেও তো একই অবস্থা। ভাগ্য ভালো বলা যায়, বাংলাদেশে খেলোয়াড়দের ওপর নিয়ন্ত্রণ অনেক বেশি। তা ছাড়া বিশ্বমানের সাপোর্ট স্টাফ আছে। ভালো ফিজিও, ট্রেনার আছে। তবে একটা ব্যাপার কি, এই যে বোলারদের প্রস্তুত করার যে কাজটা, সেটা তো ঠিক বিজ্ঞান নয়। তাই একই নিয়ম সবার বেলায় খাটে না। কেউ অনেক বেশি বল করলে ভালো থাকে, কেউ বেশি বল করলে চোটে পড়ে। কারো যদি একেবারে ব্যাকরণ মানা বোলিং অ্যাকশন থাকে এবং রান আটকে রাখার বোলিং করে, তাহলে তার পক্ষে অনেক বেশি খেলা সম্ভব। আবার রুবেলের কথাই ধরুন, ওকে বোলিং করার মতো ফিট হতে গেলে অনেক সময় লাগে, কারণ তার অ্যাকশনটাই এমন। তাই রুবেলকে খেলাতে অনেক বেশি সতর্ক হতে হয়। আমরা চেষ্টা করি কার জন্য কোন প্রক্রিয়াটা সেরা সেটা বের করতে।

প্রশ্ন : মুস্তাফিজ আইপিএল খেলতে সুযোগ পেয়েছেন, সম্প্রতি সাসেক্সের সঙ্গে তার চুক্তি হয়েছে। এত অল্প বয়সে বেশি বেশি খেলার ভার তার ওপর চাপিয়ে দেওয়াতে আরেকটা ‘মাশরাফি কেস’ হয়ে উঠবেন না তো মুস্তাফিজ?

স্ট্রিক : যেই বোলারই নিয়মিত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলবে তাকে আসলে এই চাপটা সইতেই হবে। সে ফিট একজন তরুণ, পেশাদার এবং সতর্ক। দেখুন, টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট হচ্ছে ভাগ্যের খেলা। সে যদি কাউন্টিতে বড় দৈর্ঘ্যের ম্যাচগুলোতে খেলতে সুযোগ পেত যেখানে ম্যাচে তাকে ১০০ ওভারের মতো বল করতে হবে দুই ইনিংস মিলিয়ে, তাহলে বলতাম শঙ্কা আছে। কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে সে মাত্র চার ওভারই বল করার সুযোগ পাবে। সে নিজের শরীরের ব্যাপারে সচেতন। ম্যাচের আগে ও পরের অনুশীলনগুলো নিয়মিত করছে। আশা করি সমস্যা হবে না।

প্রশ্ন : সাধারণত যেটা হয়, বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বোলারের পেস কমে আসে। মুস্তাফিজের কাটারগুলো এখন দুর্বোধ্য লাগলেও পরে হয়তো ব্যাটসম্যানরা রহস্যটা ধরে ফেলবেন। আগামীর জন্য আপনি তাদের কিভাবে প্রস্তুত করছেন?

স্ট্রিক : এটাই ক্রিকেট। এখানে টিকে থাকতে হলে নিত্যনতুন কৌশল আয়ত্ত করতে হবে। তাসকিনের ব্যাপারে বলতে পারি, বেশি বেশি তাকে খেলালে তার গতি কিন্তু কমে আসবে। তাই আমরা পেসারদের খেলা, ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলা, অনুশীলনে ক্লান্তি সব কিছু মাথায় রেখেই তার জন্য একটা কৌশল ঠিক করি। শক্তি কমে গেলে তাকে মাঠের খেলা থেকে বের করে এনে জিমে পেশিগঠনের কাজে লাগাই। এভাবেই একজন বোলারকে টিকে থাকতে হবে, ক্রমাগত মানিয়ে নিতে হবে এবং সব সময়ই উন্নতির চেষ্টা করতে হবে।

প্রশ্ন : একদম শেষ প্রান্তে আমরা। এখন বিশ্ব ক্রিকেটে অনেক বাঁহাতি পেসার। মিচেল স্টার্ক, ট্রেন্ট বোল্ট, মোহাম্মদ আমির, মুস্তাফিজ...সময়টা কি তাহলে এখন বাঁহাতি পেসারদের?

স্ট্রিক : এটা খুবই চমত্কার। তবে এতজন বাঁহাতি বোলার যখন আছে তখন ব্যাটসম্যানরাও কিন্তু তাদের ভালো খেলতে শিখে যাবে। যে জিনিসের প্রাপ্তি কম, সে জিনিসে লোকে অনভ্যস্ত... এটা খুব সাধারণ মানসিকতা। একই ধরনের বোলারদের যত বেশি খেলা হবে, ততই কিন্তু ব্যাটসম্যানরা ভালো করবে!


মন্তব্য