kalerkantho

মঙ্গলবার । ৬ ডিসেম্বর ২০১৬। ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৫ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জীবনের ইনিংস শেষে অনন্তের পথে শিল্পী

শেষ হয়ে গেল সেই এক ঘণ্টা!

খালিদ রাজ   

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শেষ হয়ে গেল সেই এক ঘণ্টা!

২০১৫ বিশ্বকাপ চলার সময় কথাটা বলেছিলেন যখন, তখন প্রথমবার বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথ তৈরি করছিল নিউজিল্যান্ড। ঘরের মাঠে ক্রিকেটের বিশ্ব আসর হওয়ায় কিউইদের সম্ভাবনার পালে হাওয়াও লাগছিল জোরেশোরে।

তাই একটাই চাওয়া ছিল তাঁর, অন্তত নিউজিল্যান্ডকে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দেখে যেন ছাড়তে পারেন পৃথিবী।

প্রতি মুহূর্ত মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা মার্টিন ক্রো’র স্বপ্নটা পূরণ হয়নি। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ফাইনাল হেরে স্বপ্নভঙ্গ হলেও তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলে বলেছিলেন, ‘আজ হয়নি, তবে একদিন হবেই। জীবনের শেষ সময়ে এটাই বা কম কিসে!’ ক্যান্সার নামের নীরব ঘাতক শরীরের মধ্যে এমনভাবে বীজ ছড়িয়ে দিয়েছিল, শেষদিকে হাল ছেড়েই দিয়েছিলেন ক্রো। জীবনঘড়ির জন্য তাই বরাদ্দ রেখেছিলেন ‘এক ঘণ্টা’। যে ঘণ্টার ঘণ্টা বেজে গেছে গতকাল। জীবনপ্রদীপ নিভে যাওয়া ক্রো না ফেরার দেশে চলে গেলেন মাত্র ৫৩ বছর বয়সে।

চোটের কারণে তাড়াতাড়ি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটকে বিদায় বলতে হয়েছিল ক্রোকে। তাই বলে ২২ গজকে নয়। বরং ক্রিকেটকে সঙ্গী করে কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের বাকি সময়টা। ২০১২ সালে শরীরে ‘লিমফোমা’ (রক্তকোষে টিউমার) ধরার পরও আঁকড়ে ধরে ছিলেন ক্রিকেটকে। একবার বলেছিলেন, ‘একজন মাতালের কাছে যেমন মদ নেশা, আমার কাছে ক্রিকেট তেমনই। ’ একই সঙ্গে লড়াই চালিয়ে গেছেন ঘাতক ক্যান্সারের বিরুদ্ধে, সফলও হয়েছিলেন তিনি। আট মাস পর ক্রো ঘোষণা দেন, তাঁর শরীর থেকে বেরিয়ে গেছে ক্যান্সারের বীজ। কিন্তু ঈশ্বর না চাইলে কি আর নিয়তি বদলানো যায়! ২০১৪ সালে ‘লিমফোমা’ আবার বাসা বাঁধে ক্রোর শরীরে। শুরুর দিকে লড়াই করলেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন নিউজিল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক। হাল ছেড়ে দিয়ে বরং উপভোগ করতে শুরু করলেন জীবন, একই সঙ্গে গুনতে থাকলেন মৃত্যুর দিন। যে দিনটা গতকাল আলিঙ্গন করে তাঁকে নিয়ে গেল বহুদূরে।

এককথায় ‘অলরাউন্ডার’। বল হাতে টেস্টে মাত্র ১৪ উইকেট পেয়েছেন তাঁর পরও! বিশ্বসেরা ক্রিকেটার, টেলিভিশনের নির্বাহী প্রযোজক, ধারাভাষ্যকার, লেখক, ক্রিকেট-বিশ্লেষক, মেন্টর—সাফল্যের পদচিহ্ন এঁকেছেন তিনি সবখানে। শেষ পর্যন্ত মার্টিন ক্রো নামটা ক্রিকেট ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে ধ্রুপদী ব্যাটসম্যান হিসেবে। তাঁর অধিনায়কত্ব ক্রিকেট বিশ্বকে উপহার দিয়েছিল নতুন এক যুগের। ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপে নিউজিল্যান্ডকে উপস্থাপন করেছিলেন নতুন ঢঙে। দলকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া ক্রো টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ৪৫৬ রানের সঙ্গে দুর্দান্ত অধিনায়কত্বের যুগলবন্দিতে ফাইনাল না খেলেও হয়েছিলেন সেরা খেলোয়াড়। নিউজিল্যান্ডের সর্বকালের সেরাও ধরা হয় কিন্তু তাঁকে!

আন্তর্জাতিক অভিষেক ওয়ানডে দিয়ে। ১৯৮২ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে নাগপুরে ৫০ ওভারের ক্রিকেটে প্রথম ম্যাচ খেলা এই কিংবদন্তি ব্যাটসম্যানের টেস্ট অভিষেক দিন কয়েক পরই। ১৯৯৫ সালে ২২ গজের মঞ্চকে বিদায় জানানোর আগে খেলেছেন ৭৭ টেস্ট। ৪৫.৩৬ গড়ে করেছেন ৫,৪৪৪ রান। টেস্টে তাঁর ১৭ সেঞ্চুরি এখনো পর্যন্ত কোনো নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বেশি সেঞ্চুরির রেকর্ড। আর ১৪৩ ওয়ানডেতে ৩৮.৫৫ গড়ে করেছেন ৪,৭০৪ রান।

অবসরের পর ক্রো উদ্ভাবন করেছিলেন ‘ক্রিকেট ম্যাক্স’ নামের তিন ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত ফরম্যাটের ক্রিকেট। ‘ক্রিকেট ম্যাক্স’-এর ধারণার সঙ্গে অনেকটা মিল আছে আজকের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের। পাশাপাশি কাজ করেছেন স্কাই টিভির সঙ্গে। সমানতালে চালিয়েছেন ধারাভাষ্য ও লেখালেখির কাজ। ২০০৬ সালে আবার শুরু করেছিলেন মেন্টরের কাজ। রস টেলরের মতো ক্রিকেটার তৈরির পেছনে ক্রো’র অবদান অনেক। যে মানুষটি ক্রিকেটকে এতটা দিয়েছেন, বদলে তাঁকে কিছু না দিলে কী হয়। আইসিসি তাই ২০১৫ বিশ্বকাপ চলার সময় ক্রোকে সম্মানিত করে ‘হল অব ফেম’-এ অন্তর্ভুক্ত করে।

এত প্রাপ্তির ভিড়েও দুটি অভিশাপ খুব করে তাড়া করত তাঁকে। ১৯৯১-৯২ সালে টেস্টে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২৯৯ রানে আউট হয়ে যাওয়া। আর ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ইডেন পার্কে হ্যামস্ট্রিংয়ে টান পড়ায় নিজের সেরাটা দিতে না পারার অক্ষমতা। ২০১৪ সালে ভারতের বিপক্ষে ব্রেন্ডন ম্যাককালাম ৩০২ রানের অসাধারণ ইনিংস খেলে প্রথম অভিশাপ থেকে মুক্তি দিয়েছেন তাঁকে। দ্বিতীয় অভিশাপ থেকে মুক্তি দেওয়ার পথ তৈরি করেও পারেননি ম্যাককালাম।

মুক্তি কাল মিলেছে, তবে সেটা জীবন থেকে। ক্যান্সারের সঙ্গে লড়াই করে হাঁফিয়ে ওঠা ক্রো মুক্তিই চেয়েছিলেন জীবন-যন্ত্রণা থেকে। জীবনঘড়িতে তাই তাঁর বরাদ্দ ছিল মাত্র ‘এক ঘণ্টা’। তথ্যসূত্র : এএফপি


মন্তব্য