kalerkantho


জীবন জীবিকার অনেক উপায়

মাসুদ রুমী ও শেখ শাফায়াত হোসেন   

২১ এপ্রিল, ২০১৮ ০০:০০



জীবন জীবিকার অনেক উপায়

মো. আসাদুজ্জামান। স্বপ্ন, আগোরা বা মিনাবাজারের মতো বড় চেইন শপের মতো কিছু করার সামর্থ্য ছিল না। রাজধানীর বাসিন্দাও তিনি নন। তবে স্বপ্নের সঙ্গে সাহস ছিল। স্বল্প পুঁজি দিয়েই মেধার জোরে আধুনিক একটি চেইন শপ দাঁড় করিয়ে ফেললেন খুলনায়। ‘সেফ এন সেভ’। অথচ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বাবা ‘তনু বাহার’ নামে ছোট্ট একটি কাপড়ের দোকান চালাতেন। ছেলে আসাদুজ্জামান আযম খান সরকারি কমার্স কলেজ থেকে হিসাববিজ্ঞানে অনার্স-মাস্টার্স করে চাকরির পেছনে ছোটেননি। ২০০৪ সালে খুলনার নিউ মার্কেট এলাকায় ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মতো করে বিক্রয়কেন্দ্র খুললেন। শুরু মাত্র আড়াই হাজার পণ্য দিয়ে। এখন সংগ্রহ দুই লাখের বেশি। কাছের থানা দৌলতপুরেও পৃথক ‘আউটলেট’ খুলেছেন। বর্তমানে তাঁর প্রতিষ্ঠানে সরাসরি কাজ করছে দেড় শর মতো লোক।

‘তুমি যখন কিছু শেখো, নতুন কিছু করো, ক্লাসের পড়ালেখার বাইরেও এটা-সেটায় অংশ নাও, তখন মনে হতে পারে এসব করে কী হবে? কিন্তু ১০ বছর পর যখন দেখবে এই টুকরো টুকরো পরিশ্রমগুলো কী সুন্দর এক সুতায় গাঁথা হয়েছে তোমার জীবনে!’ কালজয়ী এক বক্তৃতায় বলেছিলেন বিশ্বখ্যাত উদ্যোক্তা আইফোনের জনক স্টিভ জবস।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কথাগুলো আরো বেশি সত্য। হাল ছাড়া যাবে না। নিজেকে তৈরি করতে হবে, অনেক সম্ভাবনা চারপাশে রয়েছে, সেগুলো কাজে লাগাতে হবে। ইতিমধ্যে অসংখ্য তরুণ-যুবা প্রথাগত চাকরির পেছনে না ছুটে আউটসোর্সিং, ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন উদ্যোগে যুক্ত হচ্ছে। অনেকে মোবাইলে আর্থিক সেবার এজেন্ট, ই-কমার্স ডেলিভারি, পাঠাও, চলো, উবারে ড্রাইভিং, সাইবার ক্যাফে, এজেন্ট ব্যাংকিং, ফ্রিল্যান্সিং, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিংসহ তথ্য-প্রযুক্তিভিত্তিক নানা উদ্যোগে উদ্যোক্তা হয়ে নিজেদের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি আরো অনেকের কাজের সুযোগ করে দিচ্ছে। চড়া মূল্যের ধীরগতির ইন্টারনেট, লোডশেডিংসহ নানা প্রতিবন্ধকতা মাড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে তারা।

ঢাকায় দ্রুত জনপ্রিয় হচ্ছে মোবাইল অ্যাপসভিত্তিক পরিবহন ও পণ্য ডেলিভারি সেবা। উবার, পাঠাও, চলো, ট্যাক্সিওয়ালা, আমার বাইকসহ বহু সেবা চালু হয়েছে। অ্যাপসভিত্তিক এই পরিবহনব্যবস্থা একদিকে যাত্রীদের দুর্ভোগ কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) খাতে ৪০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এই খাত থেকে ১৮০ মিলিয়ন ডলার আয় হচ্ছে। সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ‘লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং’ প্রকল্পের অধীনে প্রশিক্ষণ গ্রহণকারীরা এখন মাসে ১৬ লাখ ডলার আয় করছে। ইন্টারনেটের মাধ্যমে পণ্যের অর্ডার দিয়ে ঘরে বসে বাজার করে ফেলার সংস্কৃতি এখন শহুরে শিক্ষিত সমাজে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই খাতে কর্মসংস্থান হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে অনেক তরুণ-তরুণী এককভাবে আবার কেউ বা দলগতভাবে এ খাতে নিজেদের নাম লেখাচ্ছে উদ্যোক্তা হিসেবে। মোবাইল ব্যাংকিং ও এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমেও বহু স্বল্পশিক্ষিত তরুণের কর্মসংস্থান হচ্ছে।

শ্রমের মর্যাদায় প্রকৃত শিক্ষা : আসাদুজ্জামানের বড় পুঁজি ছিল শিক্ষা, সঙ্গে সাহসী স্বপ্ন। তিনি বলেন, ‘পরিশ্রম সৌভাগ্যের প্রসূতি—প্রবাদটি আমি সব সময় মনে রেখেছি। লেখাপড়াটাকে কাজে লাগিয়ে চেষ্টা করেছি নিজে কিছু করতে। বাবা ব্যবসায়ী ছিলেন। সেটাই বড় একটি নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। আমি শুধু যোগ করেছি আধুনিক চিন্তাধারা। খুলনার মানুষগুলোর জীবনযাত্রায় যখন পরিবর্তন আসতে থাকে, মায়েরা যখন কর্মব্যস্ত হতে থাকে, খাটি পণ্য যখন খুঁজে পাওয়া কঠিন হতে থাকে, তখন এই পণ্যগুলো একটি জায়গায় জড়ো করে উন্নত পরিবেশে কেনাকাটার ব্যবস্থা করে দিয়ে নিজে কিছু করতে চেয়েছি। চাকরির জন্য বসে থাকিনি।’

আসাদুজ্জামানের মতো অনেক শিক্ষিত ছেলে-মেয়েই একাডেমিক পরীক্ষায় পাসের জন্য পড়া প্রবন্ধের শিক্ষা দিয়ে শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করছেন। রাজধানীর বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় একটি ধোপার দোকানে (লন্ড্রি) বিশাল সাইনবোর্ড লাগানো, অনলাইনে কাপড় লন্ড্রির অর্ডার দিন, হোম ডেলিভারি। এটাই শিক্ষার মাহাত্ম্য। মোটামুটি শিক্ষা লাভের পর একজন ধোপাকে তার পারিবারিক পেশা বাদ দিয়ে বাবুগিরি করতেই হবে এমন নয়। বরং শিক্ষা তার চিন্তার জগত্ ও বাজার বিশ্লেষণের দক্ষতা বাড়াবে, যাতে সে শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে আধুনিক ব্যবস্থাপনায় ব্যবসা সম্প্রসারণ বা বিপণন ব্যবস্থা উন্নত করতে পারে।

একদল শিক্ষিত যুবক দেখিয়ে দিলেন পোশাক বিক্রি করে বড় ব্যবসায়ী হয়ে ওঠার পাশাপাশি সৃজনশীলতা দিয়ে সম্মান অর্জন করা যায়। এমন এক উদ্যোক্তা শাহবাগের আজিজ মাকের্টের জনপ্রিয় ফ্যাশন হাউস নিত্য উপহারের বাহার রহমান। বলা যায়, এখান থেকেই দেশি দশের মতো বড় পোশাক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। বিশ্ববিদ্যালয় পাস করা কয়েকজন মেধাবী তরুণ সৃজনশীল নকশা ও পোশাক-বৈচিত্র্য দিয়ে রাজধানীর আজিজ সুপার মার্কেটের বিকাশ ঘটিয়ে অভাবিত নজির রেখেছেন।

উদ্যোক্তা হিসেবে ক্ষুদ্র থেকে বৃহতের দিকে যাত্রার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত ঢাকা উত্তরের প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর শেষে আশির দশকে পোশাক খাতের ব্যবসায় যুক্ত করেন নিজেকে। পরে নেতৃত্ব দেন ব্যবসায়ীদের নানা শীর্ষ সংগঠনের। সাহসের সঙ্গে দায়িত্ব নিয়েছিলেন ঢাকা উত্তরকে ঢেলে সাজানোরও; কিন্তু তিনি অকালে প্রয়াত হন। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) শিক্ষকতার মতো চাকরি ছেড়ে আশির দশকে বন্ধুদের নিয়ে শেলটেক নামে একটি আবাসন প্রতিষ্ঠান দাঁড় করান ড. তৌফিক এম সেরাজ।

বর্তমানে শহরের বড় বড় অনেক প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তা প্রহরী জোগান দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছে বেসরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান। এখানে স্বল্পশিক্ষিত কিছু লোকের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের পচার-প্রসার ও ব্যবস্থাপনার কাজে কিছু বড় কর্মকর্তাও নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। আবার ঢাকাবাসীর বাসাবাড়ি থেকে ময়লা-আবর্জনা সংগ্রহের ব্যবসাটিও চালাচ্ছে একটি শ্রেণি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৈচিত্র্যময় বৃত্তি বা পেশার কথাও ভুলে যাচ্ছে এখনকার যুবসমাজ। ডাক্তার বা প্রকৌশলী পেশা শুধু নয়, যদি কৃষক, জেলে, তাঁতি, মজুর—সব পেশাকেই চাকরিতে রূপান্তর করার চেষ্টা করা হয় বাণিজ্যিক উপায়ে, তাহলেই শুধু বেকারত্ব কমে আসতে পারে।

পূবালী ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘অনেক সময় প্রশ্ন ওঠে, অর্থ আগে, না দক্ষতা আগে? আমি বলব, দক্ষতা আগে। স্টার্ট-আপ মানি কিছু দরকার হয়, তবে সেটার জন্য ভালো উদ্যোগ আটকে থাকে না।’ ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বলেন, ‘আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থাটাই ঠিক নয়। এখানে চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষা দেওয়া দরকার ছিল। ছোটবেলা থেকেই সন্তানদের কোন বিষয়ের প্রতি ঝোঁক সেটা বুঝে লেখাপড়া শেখানোর চেষ্টা করতে হবে।’

খোলা আছে অনেক পথ

আউটসোর্সিং : বিপিও খাতে ২০২১ সালের মধ্যে দুই লাখ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকার ও বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কলসেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্য) কাজ করছে বলে জানান সংগঠনটির সভাপতি ও ডিজিকন টেকনোলজিস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদ শরীফ। তিনি বলেন, ‘বিদেশেও আমরা নতুন নতুন বাজার পাচ্ছি। সরকারের বিভিন্ন কাজের অটোমেশন, ডিজিটাইজেশনে প্রচুর মানুষের দরকার হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কাস্টমার সার্ভিস, ক্রেডিট কার্ড সার্ভিস, ব্যাক অফিস, পে রোল, কেওয়াইসি ফর্মের ডাটা এন্ট্রি ইত্যাদি কাজও ভবিষ্যতে আউটসোর্সিং হবে, যা বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে ব্যাপকভাবে হচ্ছে।’

জানা যায়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ভ্যাট অনলাইন, ওয়াসার কলসেন্টার, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কলসেন্টার, টেলিটকের কলসেন্টার আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে হয়েছে। এই সেবার হার আগামী দিনে ব্যাপকভাবে বাড়বে, ফলে প্রচুর শিক্ষিত তরুণের কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তবে এ ক্ষেত্রে ইংরেজি ও বাংলায় ভালো যোগাযোগ ও লেখার দক্ষতা, অ্যানালাইটিক্যাল স্কিল থাকতে হবে বলে জানান ওয়াহিদ শরীফ। তিনি বলেন, উন্নত বিশ্বের নানা বহুজাতিক টেলিকম কম্পানি, কনজ্যুমার ইলেকট্রনিকস, ব্যাংক, ইলেকট্রনিকস, এফএমসিজি, কম্পানির নন-ভয়েস কাজ যেমন—ইমেজ প্রসেসিং, গ্রাফিক ডিজাইন, ডাটা এন্ট্রি, পে রোল প্রসেসিং, সিকিউরিটি মনিটরিং, ব্যাংকের ব্যাক অফিস প্রসেসিংয়ে কাজ করে বাংলাদেশ। প্রায় দেড় হাজার তরুণ-তরুণী ডিজিকনে আউটসোর্সিংয়ের কাজ করছে।

সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ জানায়, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে ফ্রিল্যান্সারদের দক্ষতাকে আরো বিকশিত করতে লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং প্রকল্প শুরু করে আইসিটি বিভাগ। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহেমদ পলক কালের কণ্ঠ’কে বলেন, ‘একটু মেধা খাটালেই ঘরে বসে আয়-রোজগার সম্ভব। ই-কমার্স, ই-শপসহ নানা প্রযুক্তি দিয়ে বেকার যুবসমাজকে স্বাবলম্বী করার প্রক্রিয়া চলছে। আমাদের লক্ষ্য ২০২১ সালের মধ্যে আউটসোর্সিং খাত থেকে বার্ষিক আয় ১০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা। পাশাপাশি তথ্য-প্রযুক্তিতে দক্ষ ১০ লাখ মানুষ তৈরি করতে চাই।’ ১৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হয় এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছর পর্যন্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ঢাকা বিভাগের বিভিন্ন জেলায় এক জরিপে দেখা গেছে, এ পর্যন্ত মোট প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে এক হাজার ৫৬০ জন। এর মধ্যে সফলভাবে আউটসোর্সিংয়ে যুক্ত হয়েছে ৪৮৫ জন। বৃহত্তর ঢাকার বিভিন্ন জেলায় তাদের সম্মিলিত আয় ৪১ হাজার ৫৭৯ ডলার, টাকার অঙ্কে ৩৩ লাখ ২৬ হাজার ৩২০ টাকা।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, ইউরোপ-আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অর্থ সাশ্রয়ের জন্য তাদের কাজগুলো উন্নয়নশীল ও অনুন্নত দেশ থেকে করিয়ে থাকে। বাংলাদেশি ফ্রিল্যান্সারদের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় মার্কেট প্লেস হলো ওডেস্ক ডটকম, ফাইভার, ফ্রিল্যান্সার ডটকম, আপওয়ার্ক ডটকম। ওডেস্কে বাংলাদেশের সাড়ে চার লাখ তরুণ-তরুণী নিবন্ধন করেছে কাজ করার জন্য। অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম মিলিয়ে কাজে আগ্রহীর সংখ্যা প্রায় সাত লাখ। কাজের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—লেখালেখি ও অনুবাদ, নিবন্ধ, ওয়েবসাইট কন্টেন্ট, ইন্টারনেটভিত্তিক জনসংযোগ, গ্রাফিক ডিজাইন, ছবি সম্পাদনা, এনিমেশন, ওয়েব ডেভেলপমেন্ট, ওয়েবসাইট তৈরি ও ওয়েবভিত্তিক সফটওয়্যার তৈরি, হোস্টিং, সিইও, ডেস্কটপ ও ওয়েব প্রগ্রামিং, ইন্টারনেটভিত্তিক বাজারজাতকরণ কার্যক্রম, দেশি-বিদেশি বিভিন্ন কম্পানির গ্রাহককে টেলিফোন, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সাহায্যে ব্যাক অফিস সহায়তা দেওয়া, ডাটা এন্ট্রি, ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে কাজ করা ইত্যাদি। এই আয়ের পরিমাণ দিনে দিনে বাড়ছে।

ই-কমার্স : ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ই-ক্যাব) সাবেক সভাপতি রাজিব আহমেদ বলেন, ‘গত বছর ই-কমার্সে এক হাজার ৭০০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে, যা এ বছর তিন হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে বলে আশা করছি। ২০২১ সাল নাগাদ এই খাতে লেনদেন আট হাজার কোটি টাকা ছাড়াবে। ই-কমার্স খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এখন ৫০ হাজার জনের কর্মসংস্থান হয়েছে, যা আগামী ১০ বছরে ১০ লাখ ছাড়াতে পারে।’

নাসিমা আক্তার নিসা ই-ক্যাবের জয়েন্ট সেক্রেটারি ও স্টার্ট-আপ রেভারি করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে ২০১০ সালে রেভারি করপোরেশন দাঁড় করান। গত কয়েক বছরে অ্যানড্রয়েড ও আইওএস প্ল্যাটফর্মে ৭৫টিরও বেশি অ্যাপ্লিকেশন তৈরি করেছে নিশার প্রতিষ্ঠান।

সিফাত সারোয়ার শপআপের সহপ্রতিষ্ঠাতা। করপোরেট ক্যারিয়ার ছেড়ে শপআপ শুরু করেছিলেন এই নারী উদ্যোক্তা। তাঁর মতে, ঘরে বসেই আয় করার ক্ষেত্রে ফেসবুকভিত্তিক এফ কমার্সের তুলনাই হয় না। প্রায় সাত হাজারের বেশি এফ কমার্স উদ্যোক্তাকে শপআপ ইনভেস্টমেন্ট, ডেলিভারি, প্রচার ইত্যাদি পেতে সাহায্য করছে।

মোবাইল ও এজেন্ট ব্যাংকিং : বরিশাল নগরের বাংলাবাজারের মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট শাফিন টেলিকমের স্বত্বাধিকারী সোহেল রানা। এসএসসি পাসের পর তিনি গ্রামীণফোনের সঙ্গে ব্যবসা করে আসছেন। বরিশালের কয়েকজন এজেন্টের মধ্যে তিনি অন্যতম ব্যবসায়ী। সোহেল রানা বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং বুঝতে হলে ন্যূনতম শিক্ষা প্রয়োজন। যাদের সেটুকু নেই, প্রতারকচক্র তাদের সর্বস্বান্ত করবে। তিনি বিকাশ ও ডাচ্-বাংলা এবং মোবাইল কম্পানিগুলো থেকে রিচার্জ আর সিম বিক্রির মাধ্যমে মাসে লক্ষাধিক টাকা আয় করেন। বরিশাল নগরের জেলখানার মোড়ের ব্যবসায়ী রিয়াদ টেলিকমের মালিক মো. রিয়াদও একজন অন্যতম সফল মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট।

গ্রামের সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে ব্যাংকিং সুবিধা পৌঁছে দিতে জনপ্রিয় হচ্ছে এজেন্ট ব্যাংকিং। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের ১৮টি ব্যাংকের মোবাইল ব্যাংকিং সেবার এজেন্ট সংখ্যা ছিল সাত লাখ ৮৭ হাজার ৪৯২। গত জানুয়ারি মাসে প্রতিদিন গড়ে ৫৫ লাখের বেশিবার অর্থ বিনিময় হয়, এতে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয় ৯৮০ কোটি টাকা। বেতন-ভাতা বিতরণ, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, সরকারি বিভিন্ন পাওনা পরিশোধসহ অন্যান্য সেবাও পাওয়া যাচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে।

অ্যাপসে পরিবহন সেবা : রাজধানীতে প্রতিদিন এই সেবায় যুক্ত হচ্ছে ১০০ গাড়ি। বাড়তি আয়ের জন্য অনেকে ব্যক্তিগত গাড়ি এ সার্ভিসে যুক্ত করছেন। অনেকে গাড়ি কিনে এ সার্ভিসে দিচ্ছেন। মাসে প্রত্যেকের গড়ে ২০ হাজার টাকার মতো আয় হয়। গাড়ির পাশাপাশি পাঠাওয়ের সঙ্গে নিজস্ব মোটরসাইকেল নিয়ে অনেকে যুক্ত হয়ে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করছে। এর মাধ্যমে অনেকে মাসে গড়ে ৩০ হাজার টাকা রোজগার করছে। বর্তমানে এক হাজারের বেশি মোটরসাইকেল এই অ্যাপসের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। অ্যাপসভিত্তিক সেবা ‘চলো’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) দেওয়ান শুভ বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের সঙ্গে এক হাজার ৬০০ ড্রাইভার আছেন। আমার ধারণা, সবগুলো অ্যাপসভিত্তিক সেবায় ছয় হাজার প্রাইভেট কার এবং পাঁচ হাজার মোটরসাইকেল যুক্ত আছে। আমরা পরিবহন সেবা যেমন দিচ্ছি তেমনি ড্রাইভারদের মধ্যে কিস্তিতে গাড়ি বিক্রি করছি। এখানে প্রতিবছর ১০ থেকে ২০ শতাংশ কর্মসংস্থান হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদেরও অনেকেই ড্রাইভার হিসেবে পার্টটাইম কাজ করছেন।’

 



মন্তব্য