kalerkantho


বিপ্লবী মাঠ

সবাইকে রুখে দেয় পাঁচরুখি

আলম ফরাজী, ময়মনসিংহ   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সবাইকে রুখে দেয় পাঁচরুখি

নিজেদের ভাঙাচোরা স্কুলের এবড়ো খেবড়ো গর্তে ভরা মাঠেই কঠোর অনুশীলনে ব্যস্ত ময়মনসিংহের নান্দাইলের পাঁচরুখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বেগম রোকেয়ার অবরোধবাসিনীর মনোভাব এখনো পুরো কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশের প্রান্তের মানুষ। প্রান্তেরই বা বলি কেন, মেয়েদের নিয়ে নগরের মানুষেরও হাজারো সীমাবদ্ধতা। এইসব সীমাবদ্ধতার মধ্যে কিছু কিছু ঘটনা পুরো দেশের মানুষকে চমকে দেয়। আলোর পথ দেখায়। কুসংস্কারের বেড়াজাল মাড়িয়ে সুন্দরের দিগন্তের হাতছানি দেয়।

প্রত্যন্ত অঞ্চল কলসিন্দুরের সোনার মেয়েদের কথা এখন আর কে না জানে! কলসিন্দুরের মতো বিপুল বিস্ময় জাগিয়ে পুরো দেশকে ফের চমকে দিচ্ছে ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার প্রত্যন্ত শেরপুর ইউনিয়নের পাঁচরুখির কিশোরী মেয়েরা। এই চমকে দেওয়া, এই বিস্ময় জাগানো, একটি এলাকার জীবনধারা, পরিবেশ পাল্টে দেওয়ার নেপথ্যে রয়েছে একটি খেলার মাঠ। প্রায় চার হাজার বর্গহাতের ছোট্ট একটি অসমান মাঠই পাঁচরুখির মেয়েদের স্বপ্নগুলো সফল করে তুলছে।

কিন্তু শুরুটা ওদের জন্য মোটেও সুখের নয়। এলাকার লোকদের চোখ রাঙানি, আজেবাজে কথা, টিপ্পনী ছাড়াও গ্রামছাড়া করার হুমকি-ধমকি ছিল ওদের জন্য নিত্য যাতনার। তবে এসবে এই সোনার মেয়েরা দমেনি। ‘আমরাও পারি’—এই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে আজ ওরা ঢাকা বিভাগের চ্যাম্পিয়ন। একটি ছোট্ট খেলার মাঠ ওদের জীবনকে বদলে দিয়েছে। স্বপ্ন দেখাচ্ছে দেশসেরা হওয়ার।

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার প্রত্যন্ত শেরপুর ইউনিয়নে পাঁচরুখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ওই বিদ্যালয়ের খেলার মাঠটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নারী ফুটবল দল। বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ টুর্নামেন্টে স্থানীয়, জেলা ও আঞ্চলিক পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন হয়ে এখন ওরা ঢাকা বিভাগের প্রতিনিধিত্ব করছে। মার্চে শুরু হবে চূড়ান্ত পর্যায়ের খেলা। আর মাত্র তিনটি ধাপ। কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল। এই তিনটি ধাপ পেরোতে পারলেই বাজিমাত। এ অবস্থায় ঢাকা বিভাগের ১৩টি জেলা ও ১২৩টি উপজেলার দর্শক চেয়ে আছে পাঁচরুখির কিশোরী মেয়েদের সাফল্য দেখতে।

পাঁচরুখি বিদ্যালয়টির অবস্থান নান্দাইল সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে। শতবর্ষের এই বিদ্যালয়টি বর্তমানে জরাজীর্ণ। সাতজন শিক্ষকের বিপরীতে শিক্ষার্থী রয়েছে ৩০৯ জন। বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯১৬ সালে। আশপাশের আটটি গ্রাম থেকে শিক্ষার্থীরা পাঠ নিতে আসে এই বিদ্যালয়ে। তাদের বেশির ভাগ হতদরিদ্র। অপুষ্টিতে ভুগছে বেশির ভাগ শিক্ষার্থী। এ রকম অবস্থায় ১২টি ইউনিয়নে ১৩টি বিদ্যালয়কে হারিয়ে দারুণ চমকে দিয়ে আলোচনায় চলে আসে তারা। এরপর আর পেছনে ফিরে থাকাতে হয়নি। একের পর এক বাজিমাত করে চলেছে।

স্থানীয় সূত্র মতে, নিজ উপজেলায় তিনটি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন, জেলা পর্যায়ে কলসিন্দুরসহ তিনটি ও অঞ্চল পর্যায়ে চারটি দলকে বিশাল ব্যবধানে হারিয়ে বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে পাঁচরুখির মেয়েরা। স্থানীয় প্রশাসন ও কয়েকজন এলাকাবাসীর সহযোগিতায় নিয়মিত অনুশীলনে অংশ নিচ্ছে সানিয়া আক্তার শশী, রত্না আক্তার, সাবিকুন্নাহার, আঁখি, সামা আক্তার, রোকসানা আক্তার, ইমাজিরুন্নাহার প্রীতি, সাদিয়া সুলতানা, রোখসানা আক্তার, জেসমিন আক্তার হালিমা, ইতি আক্তার, আফরিন আক্তার, তানিয়া আক্তার, মিফতাফুল জান্নাত, মিলি, সানিয়াসহ ১৭ সদস্যের এই দলটি। নিজেদের বিদ্যালয়ের মাঠে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকলেও প্রতিদিন কঠোর অনুশীলন করছে এই দুরন্ত কিশোরীরা। এখন আর কেউ তাদের টিপ্পনী কাটে না। বাজে মন্তব্য করে না। উল্টো অনুশীলনের সময় এই মেয়েদের খেলা দেখতে মাঠের কাছে এসে ভিড় জমায়। হাততালি দিয়ে উৎসাহ দেয়। সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। এলাকার মানুষ এখন ওই কিশোরীদের নিয়ে গর্ব করে।

কলসিন্দুরের মেয়েদের মতো ওরাও শহর থেকে অনেক দূরে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাসিন্দা। ৩-০ গোলে হারিয়ে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব গোল্ডকাপে ময়মনসিংহ অঞ্চলে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পথে কলসিন্দুরের মেয়েদের হারের তিক্ত স্বাদ দিয়েছে পাঁচরুখি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়েরা। গত বছর ১ নভেম্বর ঢাকার বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে নরসিংদীকে ৩-০ গোলে হারিয়ে ঢাকা বিভাগীয় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। ওই সব খেলার মধ্যে মোট গোল হয়েছে ৩৫টি। ১০টি ম্যাচে মাত্র একটি গোল হজম করে প্রতিপক্ষের জালে বল পাঠিয়েছে ৩৫ বার। এর মধ্যে দুটি হ্যাটট্রিকসহ ১৩টি গোল একা করে গোলমেশিন খেতাব পেয়েছে জেসমিন আক্তার হালিমা।

এই বিশাল সাফল্যের পেছনে যাঁর অবদান সবচেয়ে বেশি তিনি হলেন মকবুল হোসেন। দলটির কোচের দায়িত্ব পালন করছেন তিনি। এই মকবুল হোসেনই একসময় কলসিন্দুরের মেয়েদের কোচ ছিলেন। পাঁচরুখির মেয়েদের সাফল্যের জয়গাথা শুরু হলে তাঁকে উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় এখানে কোচের দায়িত্বে নিয়ে আসা হয়। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, ‘আমি কলসিন্দুরের সেই কোচ, যাদের কঠিন প্রশিক্ষণ দিয়ে সাফল্য এনে দিয়েছিলাম। এখন পাঁচরুখির দামাল মেয়েদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। আশা করছি এদেরও দেশসেরা করতে পারব।’

সহকারী কোচ দেলোয়ার হোসেন উজ্জল কালের কণ্ঠকে জানান, তিনি পাঁচরুখি বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক। এই মেয়েদের তিনিই প্রথম ফুটবল খেলতে অনুপ্রাণিত করেন। তিনি বলেন, ‘কিন্তু শুরুতে অভিভাবকরা খেলাটিকে মোটেও পছন্দ করতে পারেনি। এর মধ্যেই বিদ্যালয়ের ছোট্ট মাঠটিতে অনুশীলন শুরু করলে অভিভাবকরা বাড়ি থেকে ছুটে এসে মেয়েদের মাঠ থেকে উঠিয়ে নিয়ে যেত। আর হুমকি দিয়ে যেত, মেয়েদের নিয়ে যেন এসব তামাশা না করি। তারা এমন হুমকিও দিত, এর পরও যদি অনুশীলন করাই তবে তারা মেয়েদের বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দেবে। তিলে তিলে আমরা সেই মানসিকতার পরিবর্তন করেছি। এখন আর আগের ওই অবস্থা নেই। অভিভাবকরা এখন তাদের সন্তানদের নিয়ে গর্ব করছে। ভালো খেলতে উৎসাহ জোগাচ্ছে।’

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক রুহুল আমীন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মেয়েরা ফুটবল খেলবে, তাও আবার এই বিদ্যালয়ের মাঠে, এ তো কল্পনাও করতে পারিনি। ফুটবল নিয়ে মেয়েরা মাঠে নামলেই অভিভাবকরা ছুটে আসত। বলত, আমাদের সন্তানদের পাঠিয়েছি পড়ালেখার জন্য, বেপর্দা হয়ে ফুটবল খেলার জন্য নয়। এসব বন্ধ না করলে সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করে দেবে। তারপর অনেক লুকোচুরি করে সদরসহ জেলা ও পরে ঢাকায় গিয়ে বিভিন্ন বিদ্যালয়কে হারিয়ে দিয়ে আসতে শুরু করে একের পর এক সাফল্য। আমাদের সোনার মেয়েদের এই সাফল্যে বদলে যেতে থাকে অভিভাবকদের মনমানসিকতা। এখন আর সমস্যা নেই। অভিভাবকরা বুঝেছে। এখন নিয়মিত বিদ্যালয়ের মাঠে চলে অনুশীলন। একসময় যে অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের মাঠ থেকে উঠিয়ে নিয়ে যেত, এখন তারাই মাঠের পাশে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে মেয়েদের চমক লাগানো খেলা উপভোগ করে। আমাদের এই সোনার টুকরো মেয়েদের কারণে পাঁচরুখি গ্রামটি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।’

নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সকল জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে আমাদের কিশোরীরা এখন স্বপ্ন দেখছে দেশসেরা হওয়ার। মার্চ মাসের মাঝামাঝি ঢাকার বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে শুরু হবে চূড়ান্ত পর্যায়ের খেলা। আর মাত্র তিনটি দলকে হারাতে পারলেই ওরা দেশসেরা। ওদের খেলার যে ধারাবাহিকতা তাতে আমরা নিশ্চিত ওরাই দেশসেরার মুকুট ছিনিয়ে আনবে।’

 



মন্তব্য