kalerkantho


বাসায় বন্দি শিক্ষালয়েও বন্দি

নেই খেলার মাঠ, খেলার সুযোগ

শরীফুল আলম সুমন   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বাসায় বন্দি শিক্ষালয়েও বন্দি

রাজধানীতে বাসাবাড়িতে বন্দি শিশুরা তাদের স্কুলে গিয়েও আরেকবার বন্দি হয়ে পড়ছে। কারণ বেশির ভাগ স্কুল-কলেজে নেই খেলার মাঠ। সরকারি প্রতিষ্ঠানে কাগজে-কলমে খেলার মাঠ থাকলেও নতুন নতুন ভবন নির্মাণ করায় তা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের জন্য নীতিমালাতেই মাঠ রাখার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়নি। ফলে বাড়ি ও স্কুল দুই জায়গাতেই চার দেওয়ালে বন্দি থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের।

জানা যায়, যেসব স্কুল-কলেজে খেলার মাঠ রয়েছে সেখানেও দুই শিফটের কারণে খেলার সুযোগ পায় না শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর স্কুলগুলোতে মর্নিং শিফট শুরু হয় সকাল সাড়ে ৭টার দিকে। ছুটি হয় পৌনে ১২টায়। আবার ডে শিফট শুরু হয় দুপুর ১২টায়, শেষ হয় বিকেল সোয়া ৪টায়। ফলে যারা মর্নিং শিফটের ছাত্র তাদের খুব সকালে স্কুলে আসতে হয়, তাদের ছুটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ডে শিফট শুরু হওয়ায় মাঠে খেলার সুযোগ থাকে না। তেমনিভাবে ডে শিফটের শিক্ষার্থীদের ছুটির সঙ্গে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদেরও আর খেলার সুযোগ থাকে না।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্র জানায়, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্বীকৃতির জন্য মেট্রোপলিটন শহরে কলেজ স্থাপনের জন্য নিজস্ব কোনো জমির প্রয়োজন নেই। ফলে ভাড়া বাড়িতে একটি ভবনেই গড়ে উঠছে বেসরকারি কলেজগুলো। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্য লাগবে দশমিক ২৫ একর, নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের জন্যও দশমিক ২৫ একর, মাদরাসা ও ইবতেদায়ি মাদরাসায় দশমিক ২০ একর, দাখিল মাদরাসায় দশমিক ২৫ একর, আলিম মাদরাসায় দশমিক ৩৫ একর, ফাজিল মাদরাসায় দশমিক ৫০ একর এবং কামিল মাদরাসায় লাগবে দশমিক ৬০ একর।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, এত অল্প জায়গায় ক্লাসরুম করাই কষ্টকর। মাঠ করার তো সুযোগই নেই। এই নীতিমালাতেই গলদ রয়েছে। রাজধানীতে যেসব এমপিওভুক্ত মাধ্যমিক বিদ্যালয় ও কলেজ রয়েছে, সেখানে শিক্ষার্থী বাড়ায় সরকারি বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনেই একে একে গড়ে উঠছে নতুন ভবন। ফলে সেখানেও খেলার জায়গা সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে।

রাজধানীর বেশির ভাগ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাগজে-কলমে খেলার মাঠ থাকলেও তা বাস্তবে দখল হয়ে গেছে। ২০১৪ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির এক প্রতিবেদনে রাজধানীর তিন শতাধিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৫১টির দখলের চিত্র বেরিয়ে এসেছিল। সর্বশেষ ঢাকা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের প্রতিবেদনেও দেখা গেছে, সেসবের ২৩টি এখনো দখলমুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভগ্নদশার কারণে রাজধানীর অভিভাবকদের প্রথম পছন্দ কিন্ডারগার্টেন। ঢাকা মহনগরীতে প্রায় আট হাজার কিন্ডারগার্টেন রয়েছে বলে জানা যায়। এসব বিদ্যালয়ের কোনো অনুমোদন নেই। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর একটি খসড়া নীতিমালা করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে এসব কিন্ডারগার্টেন এখন চলছে বিভিন্ন বাড়ির একতলা বা দোতলা ভাড়া করে। আবার দেখা যায়, একই ভবনে মার্কেট, হোটেল আবার স্কুলও রয়েছে। ফলে এসব কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীদের খেলার জায়গা নিয়ে চিন্তারও কোনো সুযোগ নেই। অথচ জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ শিশুদের আনন্দের ছলে পড়ালেখা করানোর কথা বলা হয়েছে। কিন্তু যে স্কুলে কোনো খেলার জায়গা নেই, সেখানে শিশুদের আনন্দের জায়গাও নেই বললেই চলে। তবে কিছু নামিদামি কিন্ডারগার্টেনে ইনডোর গেমসের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে তা সাধারণত ছোট্ট একটি বদ্ধ রুমে।  শিশুদের দৌড়ঝাঁপ দিয়ে খেলার সুযোগ নেই।

রাজধানীর মিরপুর-৬ নম্বরে অবস্থিত নামি একটি ইংলিশ ভার্সনের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র আবির। ওর বাবা মোরশেদ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার ছেলের স্কুলটি পাঁচতলা বিল্ডিংয়ের পুরোটায় অবস্থিত। কিন্তু রাস্তা থেকেই স্কুল বিল্ডিংয়ের গেট। প্রতি ফ্লোরের পুরো জায়গায়ই ক্লাসরুম। নিচতলায় ইনডোর গেমসের জন্য একটি রুম রয়েছে। সেখানে বড় ক্লাসের বাচ্চারা টেনিস খেলে। ফলে ছোটদের খেলার জায়গা নেই। সপ্তাহে এক দিন অ্যাসেম্বলি হয়, সেটাও রাস্তার একটা অংশ দখল করে। আর আমার বাসা পাঁচতলায়। সেখানেও খেলার জায়গা নেই, স্কুলেও নেই।’

দেশে এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৯৬টি। এর মধ্যে রাজধানীতেই অর্ধশতাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থান। বিভিন্ন বদ্ধ জায়গায় ভাড়া করা ভবনে গড়ে তোলা হয়েছে বেশির ভাগ বিশ্ববিদ্যালয়। ফলে এখানকার শিক্ষার্থীদেরও খেলার মাঠের কথা চিন্তা করার কোনো সুযোগ নেই। খেলাধুলা তো দূরের কথা, সামান্য আড্ডা দেওয়ার জায়গাও তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন ২০১০ অনুযায়ী ২৫ হাজার বর্গফুটের নিজস্ব অথবা ভাড়া করা বাড়িতে এই বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর ন্যূনতম তিনটি অনুষদ ও তাদের অধীনে ছয়টি বিভাগ থাকতে হবে। এর জন্য যত কক্ষ প্রয়োজন সেসব ২৫ হাজার বর্গফুট জায়গায় হওয়াটাই কঠিন। তবে প্রতিষ্ঠার সাত বছরের মধ্যে এসব বিশ্ববিদ্যালয়কে নিজস্ব ক্যাম্পাসে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে আইনে। ঢাকা ও চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটনে এ জন্য তাদের জমি লাগবে মাত্র এক একর। এর অর্থ, এই জমিতে খেলার মাঠ রাখার কোনো সুযোগ নেই। তবে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এরই মধ্যে নিজস্ব ক্যাম্পাসে গেছে। যারা বেশি জমি নিয়েছে তারা খেলার মাঠও করেছে।

 

 

 


মন্তব্য