kalerkantho


মাঠ রক্ষার আইন আছে প্রয়োগ নেই

পার্ক, মাঠ বা উন্মুক্ত স্থান দখল করে গড়ে তোলা হয়েছে বাণিজ্যিক ভবন পার্কিং প্লেস, কমিউনিটি সেন্টার

আপেল মাহমুদ   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



সদরঘাট লেডিস পার্কে ভাষণ দিয়েছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ। সেই পার্কটির খোঁজে সম্প্রতি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ থেকে ঢাকায় এসেছেন গবেষক নিত্যানন্দ রায় চৌধুরী। রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এ বিষয়ে এমফিল করছেন তিনি। সারা দিন সদরঘাট এলাকার চিত্তরঞ্জন দাশ এভিনিউয়ে ঘোরাঘুরি করেও তিনি পার্কটির কোনো হদিস পাননি। পরে একজন লেখকের সহযোগিতায় গবেষক নিত্যানন্দ পার্কের স্থানটি চিহ্নিত করতে পারলেও সেখানে পার্কের কোনো চিহ্নই খুঁজে পাননি। ওই পার্কের জায়গায় গড়ে উঠেছে একটি বিপণিবিতান, যার নাম লেডিস পার্ক বিপণিবিতান। একটি ঐতিহাসিক পার্কের এই অবস্থা দেখে হতবাক হন গবেষক নিত্যানন্দ রায় চৌধুরী।

একইভাবে রাজধানীর বেশির ভাগ পার্ক, মাঠ বা উন্মুক্ত স্থান পুরোপুরি বা অংশবিশেষ দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে দোকানপাট, বাণিজ্যিক ভবন, পার্কিং প্লেস, ওয়াসার পাম্প স্টেশন, সিটি করপোরেশনের কমিউনিটি সেন্টার, ওয়ার্ড কাউন্সিলরদের অফিস, কমিউনিটি ক্লিনিক ইত্যাদি। পার্ক, মাঠ কিংবা উন্মুক্ত স্থান রক্ষার জন্য দেশে বেশ কিছু আইন থাকলেও তার প্রয়োগ না হওয়ায় ঢাকার উন্মুক্ত স্থান দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) চেয়ারম্যান আবু নাসের খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পার্ক, মাঠ কিংবা উন্মুক্ত জায়গা রক্ষার জন্য দেশে বেশ কিছু আইন প্রচলিত রয়েছে। জলাধার সংরক্ষণ আইন-২০০০, বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন-১৯৯৫, রাজউকের মাস্টারপ্ল্যান ও ইমারত নির্মাণ বিধিমালা এবং সিটি করপোরেশন অ্যাক্টসহ আরো অনেক ছোটখাটো আইন আছে। কিন্তু এর কোনোটারই প্রয়োগ নেই, যার কারণে ঢাকায় উন্মুক্ত জমি সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সরকারি কিছু সংস্থাও দখলদারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হচ্ছে। এতে সাধারণ দখলদাররা অনুপ্রাণিত হচ্ছে।’

প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০ অনুযায়ী শহর-নগরসহ জেলার সব উন্মুক্ত জমি, জলাভূমি, খেলার মাঠ, হাট-বাজার, পার্ক ও খাসজমি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব জেলা প্রশাসকের। এমনকি ব্যক্তিমালিকানাধীন কোনো জমির শ্রেণি পরিবর্তন করতে হলেও অবশ্য জেলা প্রশাসকের অনুমোদন নিতে হয়। অর্থাৎ জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া কেউ নিচু জমিকে উঁচু, উচুঁ জমিকে নিচু, জলাশয়কে ভিটিতে পরিণত করা কিংবা উন্মুক্ত জমিতে কলকারখানা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। শুধু খাজনা আদায়ের স্বার্থে নয়, এলাকার পরিবেশ রক্ষা, অবৈধ দখলদার ঠেকানোর জন্য এ আইনটি কার্যকর ভূমিকা রাখলেও বাস্তবে এর কোনো প্রয়োগ নেই। অনেকে এ আইনের মর্মও জানে না।

আইনজীবী মো. আনোয়ারুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসক বা ডিসির ক্ষমতা অসীম। তাঁর অনুমতি ছাড়া কেউ মাঠ-পার্ক কিংবা উন্মুক্ত ভূমি দখল করে এর শ্রেণি পরিবর্তন করলে তিনি দখলদার কিংবা শ্রেণি পরিবর্তনকারীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিতে পারেন। সরকারি জমিজমার ক্ষেত্রে তা কঠোরভাবে পালন করা যায়। এমনকি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা এসি ল্যান্ডকে (সহকারী কমিশনার ভূমি) পুলিশ ফোর্সসহ ঘটনাস্থলে পাঠিয়ে তাত্ক্ষণিকভাবে ওই কাজ বন্ধ করে দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করাতে পারেন। কিন্তু এ ধরনের নজির দেশের কোথাও কদাচিৎ দেখা যায় না।’

সদরঘাট লেডিস পার্কে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ছাড়াও ভাষণ দিয়েছিলেন নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু, ঢাকার প্রথম মেয়র আনন্দ চন্দ্র রায় এবং একাধিক বড় লাটসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি। দেশভাগের আগে ঢাকার বেশির ভাগ রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক অনুষ্ঠান হতো সেখানে। তখন অনেক নারী-শিশু বৈকালিক ভ্রমণে বেরিয়ে বাকল্যান্ড বাঁধ ধরে লেডিস পার্কে গিয়ে হাওয়া খেত। ঢাকায় বসবাসরত ব্রিটিশ, আর্মেনীয়, ডাচ, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান পরিবারের নারী সদস্যরা ওই পার্কে আড্ডা দিতেন। লেডিস পার্কের পূর্ব পাশের শরীরচর্চা কেন্দ্রে ব্যায়াম করাসহ লাঠিখেলার প্রশিক্ষণ নিতেন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীরা। কয়েক বছর আগে হঠাৎ করে শতবর্ষী ওই শরীরচর্চা কেন্দ্রটি বন্ধ করে দিয়ে ব্যায়ামের সরঞ্জামাদি কেজিদরে বিক্রি করে দেওয়া হয়। এরপর সেখানে গড়ে ওঠে বিশাল আকৃতির এক বাণিজ্যিক ভবন।

লক্ষ্মীবাজারে সুভাষ চন্দ্র বোস এভিনিউয়ে সিটি করপোরেশনের তালিকাভুক্ত একটি শিশু পার্ক সম্প্রতি দখল করে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে দোকানপাট। একইভাবে মালিটোলা পার্কের উন্মুক্ত জায়গার একাংশে গড়ে তোলা হয়েছে ট্রাকস্ট্যান্ড এবং অন্য অংশ সৌন্দর্যবর্ধনের নামে ভাড়া দিয়ে বিশাল বাণিজ্যিক সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।

পল্টনে ঢাকার একমাত্র মুক্তাঙ্গনটি কখনোই দখলে ছিল না তদারককারী সংস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। স্থানটি রেন্ট-এ-কারের অবৈধ পার্কিং প্লেস হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মদদে সচিবালয়কেন্দ্রিক একটি প্রভাবশালী মহল মুক্তাঙ্গন দখল করে রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। দখল পাকাপোক্ত করার উদ্দেশ্যে সম্প্রতি সেখানে একটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে।

সম্প্রতি হাজারীবাগ পার্কের জমিতে কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে স্থানীয় লোকজনের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। তারা রাজপথে মানববন্ধন করে বলেছে, মাঠটি বেদখল হয়ে গেলে এলাকাবাসী নিঃশ্বাস নেওয়ার জায়গা পাবে না। ছোট ছেলে-মেয়েরা পার্কে হাঁটাচলা না করে ঘরে বসে পঙ্গুত্ববরণ করবে।

এর আগে একইভাবে হারিয়ে গেছে টিকাটুলী পার্ক, উত্তরা ১ নম্বর সেক্টর পার্ক, মোহাম্মদপুর শহীদ পার্ক, আজিমপুর পার্কসহ আরো অনেক উন্মুক্ত স্থান। উন্মুক্ত মাঠ দখলের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি ঘটেছে উত্তরা মডেল টাউনে। রাজউকের নকশায় ১ নম্বর সেক্টরে একটি বড় পার্কের উপস্থিতি থাকলেও বাস্তবে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে একটি ক্লাব, যেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ। যে পার্কে শিশুদের খেলাধুলা করা এবং বৃদ্ধদের হাঁটাহাঁটি করার কথা, সেখানে এখন মদের বার আর জুয়ার আসর।

উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের মাঠটি রীতিমতো ছিনতাই হয়ে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একটি বিতর্কিত ক্লাবের দখলে চলে গেছে খেলার মাঠটি। ক্লাবের লোকজন ওই মাঠ বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করছে। স্থানীয় বাসিন্দারা অভিযোগ করে বলেছে, রাজউকের অধিগ্রহণকৃত মাঠটি ফ্রেন্ডস ক্লাব নামে একটি ভুঁইফোড় সংগঠন ছিনতাই করে নেওয়ার পরও কোনো প্রশাসনিক পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না। মাঠের একাংশে ছয়তলা মার্কেট-কাম-কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে।

 



মন্তব্য