kalerkantho


বি শে ষ লে খা

গৃহবন্দি শিশুদের দিয়ে ভালো জাতি গঠনের আশা অমূলক

ড. হায়াৎ মামুদ, সাহিত্যিক

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



গৃহবন্দি শিশুদের দিয়ে ভালো জাতি গঠনের আশা অমূলক

আমার বেড়ে ওঠা পুরান ঢাকায় হলেও শৈশব কেটেছে জন্মস্থান পশ্চিমবঙ্গে। ঢাকায় এসে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হই। আমার জন্ম ১৯৩৯ সালের ২ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানে ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর পশ্চিমবঙ্গেই ছিলাম আমরা। কিন্তু ১৯৫০ সালের হিন্দু-মুসলিম সামপ্রদায়িক দাঙ্গার পরিপ্রেক্ষিতে পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় চলে আসি। এর পর ভর্তি হই সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে। সেখান থেকে মেট্রিকুলেশন পাস করার পর উচ্চ মাধ্যমিক করি নটর ডেম কলেজ থেকে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ সম্পন্ন করি।

আমার মনে পড়ে, সেন্ট গ্রেগরি স্কুল সে সময় ঢাকার সেরা স্কুলগুলোর অন্যতম ছিল। আমার কাছে বেশি ভালো লাগত স্কুলের সামনের মাঠ। এই মাঠ বেশ আকর্ষণীয় ছিল আমার কাছে। এখানে ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা করত। এখনো ওই স্কুলের মাঠ সে রকমই আছে। ফলে ওই স্কুলের শিক্ষার্থীদের মেধা-মনন অন্যান্য স্কুলের শিক্ষার্থীদের চেয়ে একটু আলাদা। আমার মনে হয় তারা শারীরিকভাবেও অনেটাই উন্নত। কারণ স্কুলের মাঠে নিয়মিত খেলাধুলা ও শরীরচর্চার সুযোগটা তাদের বেশ ভালো।

আমরা ঢাকায় আসার পর বসবাস শুরু করি পুরান ঢাকার শ্যামপুর এলাকায়। সেখান থেকে ১৯৬৩ সালে গেণ্ডারিয়া এলাকায় দীনেশ দাস লেনে বসবাস শুরু করি। আমার বাবা এখানেই একটি বাড়ি বানান। যে বাড়িতে এখনো আমরা থাকি। আমার এখনো মনে পড়ে, এখন আমরা যে এলাকায় বাস করি এটি ছিল রাজধানীর একসময়ের সবচেয়ে অভিজাত এলাকা। এই এলাকা তথা পুরো ঢাকায় লোকজনের পরিমাণ ছিল খুবই কম। অনেক মাঠ ছিল এসব এলাকায়। লোকজনের তুলনায় মাঠের পরিমাণ ছিল বেশি। আমরা বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারতাম। যেখানে সেখানে খেলার মাঠ আর খোলা জায়গা। আমার এখনো মনে পড়ে—নারিন্দা শিশু পার্ক, মালিটোলা পার্ক, বংশাল ট্রায়াংগল পার্ক, বাহাদুর শাহ পার্ক, নবাব সিরাজউদ্দৌলা পার্ক, নাজির বাজার পার্ক, বকশীবাজার পার্ক, বশিরউদ্দিন পার্ক, জগন্নাথ সাহা পার্ক, নওয়াবগঞ্জ শিশু পার্ক, হাজারীবাগ শিশু পার্ক, হাজারীবাগ কাসাইটুলী পার্ক, নিমতলী সড়কদ্বীপ পার্ক, বলধা গার্ডেন ও বাংলাদেশ মাঠ—এ রকম অনেক মাঠ ছিল পুরান ঢাকায়।

বিশেষ করে মনে পড়ে আমাদের বাড়ির কাছাকাছি ধূপখোলা মাঠের কথা। এই মাঠের আদি নাম ধোপাখোলা। পঞ্চাশের দশকে ধুপিরা বুড়িগঙ্গায় কাপড়-চোপড় ধৌত করার পর এই মাঠে এনে শুকাত। ফলে এই মাঠের নাম স্থানীয়ভাবে পরিচিত হয় ধোপাখোলার মাঠ। কালের আবর্তনে একসময় ধোপাখোলা থেকে মাঠটির নাম হয় ধূপখোলা। একসময় এই মাঠটি ছিল রাজধানীর অন্যতম বড় খেলার মাঠ। এই মাঠে এলাকার ছেলেরা সব সময় খেলাধুলা করত। সব সময় মুখরিত থাকতে দেখেছি এই মাঠটিকে। এই মাঠকে কেন্দ্র করে পার্শ্ববর্তী আবাসিক এলাকার ছেলেদের মধ্যে সৌহার্দ্য সম্প্রীতি ছিল উল্লেখ করার মতো। এখানে সবাই সবাইকে চিনত জানত। এই মাঠের খেলাকে কেন্দ্র করে যে সম্প্রীতি গড়ে উঠেছিল, যার ফলে একে অপরের অনেক কর্মকাণ্ডে অংশীদারি হতেন। এখন যা আকাশকুসুম কল্পনা।

আমি যদি সত্তর বা আশির দশকের কথাও বলি, তখনও এই মাঠে কোনো দখলদারির থাবা পড়েনি। সে সময়ও এলাকার ছেলেরা এই মাঠকে সুন্দরভাবে ব্যবহার করার সুযোগ পেয়েছে। দলে দলে ছেলেরা মন উজাড় করে খেলাধুলা করত। এখন সেই মাঠের জীর্ণ দশা। এখন মনে হয় দু-একটি ক্লাব রয়েছে, যারা এই মাঠে বিভিন্ন খেলা ও শরীরচর্চার আয়োজন করে। সেখানে গেণ্ডারিয়া এলাকার সব ছেলে অংশ নেওয়ার সুযোগ পায় না। মাঠের জায়গাও কম হওয়ায় অনেকে খেলতেও আসে না। বিকেলে বা সন্ধ্যায় আড্ডা জমত এই মাঠে। এখন তা আর চোখে পড়ে না।

রাজধানীতে এখন জনসংখ্যা এক কোটিরও বেশি বলে শুনেছি। জনবসতির ঘনত্বের কারণে খেলার মাঠগুলো হারিয়ে গেছে প্রায়। এখন ছেলেমেয়েদের খেলাধুলার প্রতি অভিভাবকদের কোনো আগ্রহ নেই। একটি ধারণা তাদের মাথায় ভর করেছে, খেলাধুলা করলে শিশুর লেখাপড়ার ক্ষতি হয়, যা একেবারেই অমূলক ধারণা। এতে করে শিশুরা যে কী পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তা কোনো অভিভাবক বুঝতে পারছেন না। দেখা যায় বাচ্চারা এখন ডিজিটাল ডিভাইসের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। বিশেষ করে বাসার মধ্যেই তারা ইন্টারনেটনির্ভর হয়ে পড়ছে। এতে করে বাচ্চাদের মেধা ও মননের বিকাশ একেবারেই গৃহবন্দি। এই গৃহবন্দি শিশুদের দিয়ে ভবিষ্যৎ ভালো জাতি গঠন করার আশাও অমূলক।

শিশু, কিশোর ও যুবকদের খেলার মাঠের বিষয়ে সরকার, সিটি করপোরেশন বা অন্যান্য কর্তৃপক্ষ একেবারে উদাসীন বলে আমার মনে হয়। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোন দিকে যাচ্ছে, তা নিয়ে তাদের ভাবনা আছে বলে আমার মনে হয় না। এভাবে চলতে থাকলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম একটি শঙ্কিত পথের দিকে ধাবিত হবে বলে মনে করি।

 

অনুলিখন-রেজাউল করিম

 


মন্তব্য