kalerkantho


বাণিজ্য গিলে খায় চট্টগ্রামের মাঠ

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



বাণিজ্য গিলে খায় চট্টগ্রামের মাঠ

চট্টগ্রামের আগ্রাবাদে জাম্বুরি মাঠে পার্ক নির্মাণের কাজ চলছে। ছবি : রবি শংকর

যে মাঠে খেলে নান্নু, নোবেল, আকরাম, নাফিস, আফতাব আর তামিম ইকবালরা ক্রিকেটে দেশ-বিদেশ মাতিয়েছেন, সেই আউটার স্টেডিয়াম এখন সুইমিংপুল আর ট্রাকস্ট্যান্ডের দখলে। চট্টগ্রামের খেলাধুলার প্রাণকেন্দ্র এম এ আজিজ স্টেডিয়ামের পাশেই একসময় ছিল অন্তত চারটি খেলার মাঠ। এগুলোর একটিতে এখন পাঁচতারা হোটেল, অন্যটিতে শিশুপার্ক ও সার্কিট হাউস এবং জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের মাঠ এখন শহর উন্নয়নের নির্মাণসামগ্রী রাখার গোডাউন। আগ্রাবাদের জাম্বু্বুরি মাঠে স্থাপনা নির্মাণের কাজ আগে থেকেই চলছে, কাজীর দেউড়ির আউটার স্টেডিয়ামে শুরু হয়েছে সুইমিং পুলের নির্মাণকাজ। পলোগ্রাউন্ড, লালদীঘি ময়দান ও হালিশহরের চট্টগ্রাম আবাহনী মাঠে নানা উপলক্ষে চলতে থাকে বিভিন্ন মেলা ও সভা-সমাবেশ। চট্টগ্রাম কলেজসংলগ্ন প্যারেড মাঠ খেলাধুলায় সরগরম থাকলেও পরিচর্যার অভাবে ক্রীড়াচর্চার পরিবেশ সংকুচিত হয়ে আসছে। খেলার মাঠ সংকুচিত হয়ে আসায় চট্টগ্রাম থেকে আগের মতো খেলোয়াড় উঠে আসছে না বলেও ক্রীড়াজগৎ সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

চট্টগ্রামের প্রবীণ ক্রীড়া সংগঠক অধ্যক্ষ শায়েস্তা খান বলেন, ‘যে মাঠ থেকে আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদীন নান্নু, নুরুল আবেদীন নোবেল, আশীষ ভদ্রের মতো খেলোয়াড় উঠে এসেছে, সেই আউটার স্টেডিয়ামে খেলার সুযোগ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। পাড়ার ছেলেরা এখন কোনো মাঠে গিয়ে খেলবে—ওই অবস্থা নেই, খেলোয়াড় তৈরি হবে কী করে?’

১৯৯৫ সালে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের করা মহাপরিকল্পনায় শিশু-কিশোরদের মানসিক ও শারীরিক বিকাশকে মাথায় রেখে পুরো নগরের ১০ শতাংশ জায়গা উন্মুক্ত রাখার বিধান রাখা হয়েছিল। মাঠ বাড়ানো দূরের কথা, তখন যতগুলো মাঠ ছিল, এখন তাও নেই। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ১৯৯১ সালে জাম্বুুরি মাঠের পশ্চিমাংশ গণপূর্ত থেকে লিজ নিয়ে শিশুপার্ক নির্মাণ করলে আগ্রাবাদ এলাকার কিশোরদের খেলাধুলার বড় জায়গাটিও বেহাত হয়ে যায়। এরপর জাম্বু্বুরি মাঠের অবশিষ্টাংশে গত এক যুগ ধরে স্থানীয়রা শাকসবজির চাষ করায় সেখানে কিশোর ও তরুণদের খেলাধুলার তেমন সুযোগ ছিল না। সম্প্রতি গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন জাম্বু্বুরি মাঠের পূর্ব অংশে বিনোদন পার্ক ও পশ্চিম অংশে নভোথিয়েটার নির্মাণের ঘোষণা দেন। সরকারি কার্য ভবন ২-এর বিপরীতে মাঠটির চারপাশে সীমানা প্রাচীর দিয়ে বিনোদন পার্কের নির্মাণকাজ করেছে গণপূর্ত বিভাগ। আরেকটি বৃহত্তম মাঠ পলোগ্রাউন্ডে এখন চলছে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলার প্রস্তুতি। মেলা উদ্বোধনের দিন চূড়ান্ত না হলেও গত এক মাস ধরেই মেলার প্যাভিলিয়ন ও স্টলের নির্মাণকাজ চলছে। মেলা শুরু হওয়ার পর সেটিও চলবে আরো প্রায় দেড় মাস। এর আগে সেখানে হয়েছে চিটাগং উইমেন চেম্বারের দেড় মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলা। এই দুই মেলার জন্য মাঠে ইট বিছানো থেকে শুরু করে আবার সেই ইট তোলা পর্যন্ত বছরের সাত মাসের বেশি মাঠ থাকে খেলার অনুপযোগী।

অথচ চট্টগ্রামের খেলাধুলার বিকাশে রেলওয়ে পলোগ্রাউন্ড মাঠের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। একসময় এই মাঠে প্রথম বিভাগ লীগের আবাহনী, স্টিল মিল, লাখী স্টার, কল্লোল সংঘসহ আটটি দলের একসঙ্গে অনুশীলনের ঘটনাও আছে। একটি দলের অনুশীলন শেষ হওয়ার জন্য আরেক দল বসে থাকত। এখনকার প্রজন্ম মাঠটিকে খেলার চেয়ে মেলার মাঠ হিসেবেই বেশি চেনে। নগরের আউটার স্টেডিয়ামেও নানা মেলার আয়োজন থাকে বছরের নানা সময়। বাকি সময় এটি ট্রাকস্ট্যান্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

আগ্রাবাদে আরেকটি মাঠ ছিল ডেবারপাড় এলাকায়। যেখানে আগ্রাবাদ নওজোয়ান ক্লাব অনুশীলন করত। আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকার মধ্যে সেটিই ছিল একমাত্র খোলা স্থান। মাঠের সেই জায়গায় এখন দাঁড়িয়ে আছে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার। হালিশহর এইচ-ব্লক ওয়াপদাসংলগ্ন এলাকার মাঠটি আগে মিলন স্পোর্টিং মাঠ হিসেবে পরিচিত ছিল। সেই মাঠটি বর্তমানে চট্টগ্রাম আবাহনী মাঠ নামে পরিচিত। চারদিকে দেয়াল দিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি এই দুই মাস চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বার আয়োজিত মেলার জন্য বরাদ্দ থাকে।

অন্যদিকে সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মনজুর আলমের মেয়াদের শেষ দিকে জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদের সামনের বিশাল মাঠটি কংক্রিটের ঢালাই দিয়ে ঢেকে দেওয়ায় সেখানেও আর খেলাধুলা হয় না। নিজাম রোড এলাকায় বাংলাদেশ মহিলা সমিতি উচ্চ বিদ্যালয় (বাওয়া) স্কুলের মাঠে বছরের বেশির ভাগ সময় কুটির ও তাঁতশিল্পের মেলা, রাজশাহী সিল্ক ও রাজশাহী আমের মেলা চলে। কলেজিয়েট স্কুল মাঠেরও সেই সোনালি সময় হারিয়েছে বহু আগে।

এর মধ্যেও আশার আলো হিসেবে আছে চট্টগ্রাম কলেজসংলগ্ন প্যারেড মাঠ ও হালিশহর হাউজিং এস্টেট মাঠ (বিডিআর মাঠ)। এই মাঠ দুটিকে সংরক্ষণের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় চারদিকে সীমানা দেয়াল এবং দেয়ালের পাশে প্রাতঃ অথবা বৈকালিক ভ্রমণের জন্য ‘হাঁটা পথ’ তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় শিশু-কিশোরদের অবাধ বিচরণ এই দুই মাঠজুড়ে। এই মাঠগুলো পুরো এলাকার মানুষের দুদণ্ড নিঃশ্বাস ফেলার জায়গা।

চট্টগ্রাম বিভাগীয় ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ও বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী সদস্য সিরাজুদ্দিন মোহাম্মদ আলমগীর বলেন, ‘মাঠ কমেছে এটা যেমন ঠিক, তেমনি যে মাঠগুলো আছে সেগুলোও খেলার কাজে ব্যবহার হচ্ছে না। মেলা, ট্রাকস্ট্যান্ড, পার্কের নামে একে একে মাঠগুলো থেকে খেলা হারিয়ে যাচ্ছে।’

মুক্তিযোদ্ধা দলের কোচ ও চট্টগ্রাম আবাহনীর সাবেক অধিনায়ক দেবাশীষ বড়ুয়া দেবু বলেন, ‘আমরা সবাই বুঝি যে তরুণ প্রজন্মের মানসিক বিকাশের জন্য খেলাধুলার বিকল্প নেই। কিন্তু বুঝার পরেও বাণিজ্যের কাছে আমরা জিম্মি। না হলে খেলার মাঠে কেন মেলা হবে? মেলার জন্য সুনির্দিষ্ট ভেন্যু থাকবে। এখন চট্টগ্রামে অনেক অনেক বড় কনভেনশন সেন্টার হয়েছে, কর্তৃপক্ষ চাইলে সেই হল ভাড়া নিয়ে মাসব্যাপী মেলা করতে পারে।’

 



মন্তব্য