kalerkantho


খেলতে না পেরে বড় ক্ষতি শিশুদের

জাতিসংঘ সনদ, শিশুনীতি শিক্ষানীতি উপেক্ষিত

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

১ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



জাতিসংঘ সনদ, শিশুনীতি শিক্ষানীতি উপেক্ষিত

ঢাকার গোলাপবাগ মাঠ অনেক দিন ধরেই ইট-বালু-জঞ্জালের দখলে। উপায়ান্তর না পেয়ে এলাকার শিশুরা প্রাণের ঝুঁকি নিয়েই খেলতে নামে পাশের গলিতে। ছবিটি গত সপ্তাহে তোলা। ছবি : মোহাম্মদ আসাদ

শারীরিক ও মানসিকভাবে শিশুদের বেড়ে ওঠার জন্য যে পরিমাণ খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানের কথা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন ও নীতিমালায় বলা আছে, বর্তমানে রাজধানীসহ সারা দেশে এর সংখ্যা খুবই কম। বিভিন্ন সময় সরকারিভাবে প্রয়োজনীয়সংখ্যক মাঠ প্রতিষ্ঠা করা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে দিনে দিনে বেশির ভাগই দখল হয়ে গেছে। চাহিদামাফিক খেলার মাঠ না পেয়ে, খেলাধুলা করতে না পেরে শিশুরা টেলিভিশন ও প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের দিকে ঝুঁকছে। ফলে শারীরিক ও মানসিকভাবে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তারা।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের এক জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে সর্বোচ্চ ৪৮ শতাংশ শিশু টিভি দেখে সময় কাটায়; ৩৩ শতাংশ শিশুর বাড়ির কাছে খেলার মাঠ আছে, ৬৭ শতাংশ শিশুর বাড়ির কাছে খেলার মাঠ নেই। ৩৭ শতাংশ শিশু ঘরের মধ্যে খেলাধুলা করে, ২৯ শতাংশ শিশু খেলাধুলা করে না; বাড়ির কাছে আঙিনায় ১৭ শতাংশ, স্কুলে ১১ শতাংশ এবং বাড়ির সামনের রাস্তায় ৭ শতাংশ শিশু খেলাধুলা করে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি এক হাজারজনের জন্য ৪ দশমিক ২৩ একর জায়গাজুড়ে পার্ক বা উন্মুক্ত স্থানের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। সবচেয়ে জনবহুল হংকং শহরেও প্রতি এক হাজারজনের জন্য শূন্য দশমিক ৭১ একর উন্মুক্ত জায়গা রয়েছে। ব্রিটেনের জাতীয় ক্রীড়া সমিতির মতে, প্রতি হাজার মানুষের জন্য ছয় একর পরিমাণ উন্মুক্ত স্থান বা খেলার মাঠ থাকা প্রয়োজন।

অথচ রাজধানী ঢাকায় খেলার মাঠ ও উন্মুক্ত স্থান বা পার্কের অবস্থা খুবই নাজুক। ঢাকা সিটি করপোরেশনের (উত্তর ও দক্ষিণ) তথ্য অনুযায়ী, একসময় ঢাকা শহরে ৫৮টি পার্ক ও ১১টি খেলার মাঠ ছিল। দখলে দখলে এরই মধ্যে ৩২টি পার্ক নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে; অস্তিত্ব হারানোর পথে আরো ১২টি পার্ক। ঢাকার জনসংখ্যা যখন ১০ লাখ ছিল, তখন খেলার মাঠ ছিল ৫০টি। গত ১৫ থেকে ২০ বছরে ঢাকার জনসংখ্যা দেড় কোটিতে পৌঁছেছে। কিন্তু এখন মাঠ মাত্র ১১টি। এগুলো হলো—গোলাপবাগ মাঠ, ধূপখোলা মাঠ, বাংলাদেশ মাঠ, বাসাবো মাঠ, ধানমণ্ডি মাঠ, কলাবাগান মাঠ, লালবাগ শ্মশানঘাট মাঠ, কিল্লার মোড় মাঠ, বনানী ও গুলশান মাঠ।

বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এগুলোর মধ্যে মাত্র পাঁচটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত। স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত শিশু-কিশোরসহ সব বয়সী মানুষের জন্য গড়ে তোলা অন্তত ৯টি সুবিস্তৃত ও গুরুত্বপূর্ণ মাঠ হারিয়ে গেছে। অধিকাংশ পার্কে যত্রতত্র আবর্জনা, মলমূত্র, ভাসমান মানুষ, মাদকাসক্ত ও সমাজবিরোধী লোকের জটলা, ময়লা-আবর্জনার স্তূপ, প্রকাশ্যে মাদক সেবন চলছে। বহু মাঠ দখল করে গড়ে উঠেছে বাস কাউন্টার, বিভিন্ন ধরনের ক্লাব। সাধারণের প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত হলেও মাঠজুড়ে দেখা যায় নানা সরঞ্জামের স্তূপ ও কর্মীদের থাকার ঘর।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০০৪ সালেও ঢাকায় সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ৯০টি খেলার মাঠ ছিল; এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০টিতে।

জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের অনুচ্ছেদ-৩১ অনুযায়ী, বয়সের সঙ্গে সংগতি রেখে শিশুর বিশ্রাম, অবসরযাপন, বয়স অনুযায়ী খেলাধুলা, বিনোদনমূলক কর্মসূচি এবং সাংস্কৃতিক, সুকুমারশিল্পে অংশগ্রহণের অবাধ অধিকার অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্রগুলো স্বীকার করবে এবং অংশগ্রহণকারী রাষ্ট্র শিল্প ও সাংস্কৃতিক জীবনে শিশুর পরিপূর্ণ অংশগ্রহণকে সম্মান ও উন্নতি সাধন করবে এবং সাংস্কৃতিক, সুকুমারশিল্প ও বিনোদনের জন্য উপযুক্ত ও সমানভাবে অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করবে।

শিশুনীতি অনুযায়ী, মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশে সব শিশুর সুস্থ মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের লক্ষ্যে নিয়মিত কার্যক্রম গ্রহণ, শিশুর সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা প্রদান করা, শিশুকে তার শৈশবে সব ধরনের খেলাধুলা, শরীরচর্চা, সংগীত, অভিনয়, আবৃত্তি, নৃত্য—এসব বিষয়ে উৎসাহিত করা, যেন সে নিজের ভেতরের প্রতিশ্রুতিকে বিকশিত করে দেশের সাংস্কৃতিক মানকে উঁচু করতে পারে সে লক্ষ্যে সব ধরনের ব্যবস্থা করতে হবে।

জাতীয় শিক্ষানীতি অনুযায়ী, শারীরিক ব্যায়ামের মাধ্যমে সুস্থ থাকার দিকে মনোযোগী করা, মাদক থেকে বিরত রাখা, নিয়মানুবর্তিতা, শৃঙ্খলাবোধ সৃষ্টিতে শিক্ষার্থীদের সহায়তা করাই স্বাস্থ্য ও শারীরিক শিক্ষার উদ্দেশ্য। এ ছাড়া প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে শরীরচর্চা ও খেলাধুলাকে আবশ্যিক করার বিষয়েও গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের চেয়ারম্যান আবু নাসের খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের শহরে সবচেয়ে অবহেলিত হচ্ছে শিশুরা। ঘরের বাইরে তাদের জন্য খেলার মাঠ নেই বললেই চলে। একটি শিশু খেলার মাঠের মাধ্যমে সহপাঠীদের সাথে পরিচয় ও আনন্দে সময় কাটাতে পারে। কিন্তু সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে তাদের টেলিভিশনের প্রতি আসক্তি বাড়ছে। যে সময়ে একটি শিশুর সামাজিকভাবে বেড়ে ওঠার কথা, সে সময়ে সে ঘরে আবদ্ধ থেকে নানাভাবে পথভ্রষ্ট হচ্ছে।’

আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন, আমেরিকার সাইকোলজি অ্যাসোসিয়েশনসহ বেশ কিছু সংগঠনের মতে, টেলিভিশনের সন্ত্রাসী দৃশ্য শিশুদের মানসিক স্বাস্থ্যের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে; যার প্রভাব সারা জীবন থাকতে পারে। গত ৩০ বছরে করা বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, টেলিভিশনে প্রদর্শিত সন্ত্রাসী দৃশ্য শিশু-কিশোরদের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলে।

 


মন্তব্য