kalerkantho

গরমে স্বস্তি পেতেই শুধু নয়, বৈদ্যুতিক পাখা বা ফ্যান ব্যবহার হয় কম্পিউটার থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানার ভারী যন্ত্রপাতির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের মতো নানা কাজে। বৈদ্যুতিক পাখা নিয়ে সাজানো হয়েছে এবারের সওদাপাতি

ফ্যান ফ্যাক্ট

ফ্যানের আবিষ্কার, বিবর্তন, শ্রেণি ও কাজ নিয়ে লিখেছেন মিজানুর রহমান

৩ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



ফ্যান ফ্যাক্ট

‘তালপাখা হাতে নিয়ে,

তোমার শিয়রে বসে

নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দেব

ঘুমাও তুমি, ঘুমাও।’

নগরবাউল জেমসের এই সাড়া জাগানো গানের তালপাখার বাতাস নিয়েই গরমে শান্তির পরশ বুলাত একসময় গ্রামবাংলার মানুষ। বাংলার এই তালপাখার মতো ছিল ফারাও সভ্যতার লোটাস পাতা, রোমান সভ্যতার ময়ূরপঙ্খ, জাপানিদের ভাঁজ করা পাখা—এসব আদি পাখার নিদর্শন।

আর দশটা দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসের মতো এই পাখারও স্বয়ংক্রিয়তা প্রয়োজন হয়ে পড়ে।

এভাবেই ১৮৮২ সালে আবির্ভাব হয় বৈদ্যুতিক পাখা বা ফ্যানের। উদ্ভাবন করেন মার্কিন বিজ্ঞানী স্কিউলার স্কাটস হুইলার।

আমাদের দেশে তালপাখা একেবারে হারিয়ে না গেলেও ব্যবহার কমেছে অনেকটাই। জীবনমান উন্নয়নে বিদ্যুতের ব্যবহার ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে গ্রামবাংলায়। কোনো বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগের পর প্রথম যে দুটির ব্যবহার শুরু হয় তা হচ্ছে, বৈদ্যুতিক বাতি ও ফ্যানের। এভাবেই আমাদের জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে ফ্যান।

শুরুতে শুধু বাতাস তৈরিতে সীমাবদ্ধ থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যবহারের ক্ষেত্র বেড়েছে। বেশির ভাগ দৈনন্দিন ব্যবহার্য প্রযুক্তির মধ্যেই ফ্যানের কাজ রয়েছে। যেমনা—ডেস্কটপ কম্পিউটারের মধ্যে কমপক্ষে দুটি ফ্যান চলে।

একটি আধুনিক বাড়িতে ফ্যানের সঠিক সংখ্যা বের করা বেশ কঠিন কাজই। আপনি জানেনই না আপনার দৃষ্টির অগোচরে কোথায় কোথায় ফ্যান চলছে। যেখানেই ‘কুলিং’ দরকার সেখানেই ফ্যানের প্রয়োজন। ক্ষতিকর বাতাস বের করে দিতেও ব্যবহার হয়। যেমন—রান্নাঘর, টয়লেট, শিল্প-কারখানায় এ কাজে ব্যবহার করা ফ্যানের শ্রেণি হচ্ছে ‘এগজস্ট ফ্যান’।

ফ্যানের উন্নয়নের সঙ্গে দুটি আবিষ্কার সরাসরি সম্পর্কিত—বিদ্যুৎ ও মোটর। এডিসনের ডিরেক্ট কারেন্টের সময়ের ফ্যানগুলো সরাসরি বিদ্যুতে চলত। নিয়ন্ত্রণের (রেগুলেশনের) ব্যবস্থা ছিল না। একটি বাতিকে রোধক হিসেবে ব্যবহার করে ফ্যানের গতিকে সীমাবদ্ধ করা যেত। নিকোলা টেসলার অল্টারনেটিভ কারেন্ট আবিষ্কারের পর বিবর্তিত হতে থাকে বৈদ্যুতিক ফ্যান।

 

বিবর্তনের পথ

প্রথম দিকে ফ্যান ছিল শুধু দুই পাখার। ডিরেক্ট কারেন্টে চলা এসব ফ্যানের গতি নিয়ন্ত্রণে ব্যবহার করা হতো বৈদ্যুতিক বাতি। ব্যয়বহুল হওয়ায় তখন ফ্যানের ব্যবহার ছিল সীমিত। শুধু ধনীরাই ব্যবহার করতে পারত।

১৮৯০ সালের দিকে অল্টারনেটিভ কারেন্ট আসার পর ফ্যানে পরিবর্তন আসে। ফ্যানে যুক্ত হয় খাঁচা। পুরো বিষয়টি আরো নিরাপদ হয়।

১৮৯৬ সালে ফ্যানে যোগ হয় ছয় পাখা।

১৯০০ সালের দিকে পাখার নকশায় পরিবর্তন আসা শুরু হয়।

১৯১০ সালের দিকে পাখার কোনাগুলো গোল হয়ে যায়। তত দিনে মোটরের জন্য দরকার সব গুরুত্বপূর্ণ সূত্রই আবিষ্কার হয়ে যায়। মোটর ছোট ও গোছানো (কম্প্যাকড) হতে থাকে।

১৯১০ সালে বাণিজ্যিকভাবে বাসায় ব্যবহারের উপযোগী ফ্যানের উত্পাদন শুরু হয়। শুরুর দিকে প্রতিষ্ঠানগুলো কালো রঙের ফ্যান তৈরি করত। শুধু টমাস এডিসনের মালিকানাধীন জেনারেল ইলেকট্রিক ব্যবহার করত গাঢ় সবুজ রং।

 

বিবর্তনের কাল

১৮৮২—স্কিউলার স্কাটস হুইলার ফ্যান আবিষ্কার করেন।

১৮৮৯—ফিলিপ ডাইহল সিলিং ফ্যানের পেটেন্ট করেন।

১৮৯৪—জার্মান অধ্যাপক হারমান রিটচেল ভেন্টিলেশন ও হিটিং ফ্যানের নকশা প্রস্তাব করেন।

১৮৯৬—ফ্যানে দুইয়ের অধিক পাখার আবির্ভাব হয়।

১৯০২—অসচিলেটিং ফ্যানের আবির্ভাব হয়।

১৯১০—বাণিজ্যিকভাবে রেসিডেনশিয়াল ফ্যানের উত্পাদন শুরু হয়।

 

হরেক রকমের

টেবিল ফ্যান : মেঝে ও টেবিলে স্থাপন করা যায়। সহজে স্থানান্তরযোগ্য। ছোট একটি জায়গা ঠাণ্ডা রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়।

প্যাডাস্ট্রাল ফ্যান : দেখতে অনেকটা টেবিল ফ্যানের মতো। তবে উচ্চতা বাড়ানো- কমানো যায়। বাতাসের গতিও ভালো।

উইন্ডো ফ্যান : বাইরে থেকে ঠাণ্ডা বাতাস ঘরে আনার কাজে ব্যবহার করা হয়।

ওয়াল মাউন্ট ফ্যান : দেয়ালে সেঁটে দেওয়া হয়। সীমিত জায়গা ঠাণ্ডা রাখার কাজে লাগে।

ফ্লোর ফ্যান : যেসব জায়গায় ওয়াল মাউন্ট ফ্যানের স্থান নেই, সেখানে বাতাস সরবরাহের জন্য ফ্লোর ফ্যানের জুড়ি নেই। গুদাম, অফিস, এমনকি বাসায়ও ব্যবহার করা যেতে পারে।

টাওয়ার ফ্যান : প্যাডাস্ট্রাল ফ্যানের মতোই, তবে শব্দহীন।

সিলিং ফ্যান : সবচেয়ে জনপ্রিয় বসতবাড়ির ফ্যান। পুরো ঘরে বাতাস সরবরাহের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত।

মিস্টিক ফ্যান : এ ধরনের ফ্যান বাতাসের সঙ্গে পানিকণাও ছুড়ে দেয়। ফলে বাতাস জলদি ঠাণ্ডা হয়।

ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফ্যান : দীর্ঘস্থায়ী ধাতব দিয়ে তৈরি হয়। অধিক ক্ষমতাশীল হওয়ায় এসব ফ্যান থেকে অনেক শব্দ হয়।

এগজস্ট ফ্যান : ভেতরের বাতাস বাইরে নিয়ে যায়। বাথরুম ও রান্নাঘরে এ ধরনের ফ্যানের ব্যবহার ব্যাপক। শিল্প-কারখানায়ও এ ধরনের ফ্যানের ব্যবহার রয়েছে।


মন্তব্য